এই পোস্টটি লেখার দরকার ছিল না। কিন্তু কামাল হোসেনকে রীতিমতো 'দার্শনিক রাজা& – ফরহাদ মজহার

এই পোস্টটি লেখার দরকার ছিল না। কিন্তু কামাল হোসেনকে রীতিমতো 'দার্শনিক রাজা' বলে পূজা চালুর চেষ্টা দেখে লিখতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত বিএনপি ও ইসলামপন্থি দলগুলোর জন্য এই ধরনের প্রপাগাণ্ডা সতর্ক লাল সংকেতের মতো। জাতির উদ্ধার কর্তা এসে গিয়েছেন, যিনি একই সঙ্গে রাজা এবং দার্শনিক। এখন খালেদা জিয়া জেলে পঁচুক এবং কামাল হোসেনের নেতৃত্বে শেখ হাসিনাকে ভোটে পরাস্ত করতে পারলেই আমরা দার্শনিক রাজার রাজত্ব কায়েম করতে পারব। এগুলো প্রপাগান্ডা।

কোন ব্যক্তিকে অন্যায় ভাবে নিন্দা ও সমালোচনা যেমন অন্যায়, তেমনি তাকে মাথায় তুলে নাচা একটি জনগোষ্ঠির জন্য সমান ক্ষতিকর। আমাদের রাজনৈতিক হুঁশ বজায় রাখা উচিত।

বিশেষত সরকার, রাষ্ট্র ও জাতীয় জীবনে যারা ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় ভূমিকা রাখেন তাদের নির্মোহ পর্যালোচনা কাম্য। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন একজন সজ্জন এবং ভালোমানুষ, কিন্তু আমি ঘোরতর ভাবে তাঁর বিরোধিতা করেছি এবং এখনও করি। এই বিরোধিতা আদর্শিক ও রাজনৈতিক। কারন তার চাকুরি রক্ষার জন্য একটি দেশের সংবিধান বদলাতে হয়েছিল। বিচারপতি হয়েও নিজের চাকুরি রক্ষার স্বার্থে একটি সংবিধান বদলানোর নজির রেখে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিন্দিত হয়ে থাকবেন। ত্রিদলীয় রূপ রেখার ভিত্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করা ছিল সম্ভাব্য গণ অভ্যূত্থানের বিপরীতে বাংলাদেশের শাসক ও লুটেরা শ্রেণির নিজেদের মধ্যে হানাহানি বন্ধ করে ক্ষমতা হস্তান্তরের ফর্মুলা। যার পরিণতি আমরা জানি: সেটা হোল, এক এগারোর সামরিক সমর্থিত সরকার এবং বর্তমানের ফ্যাসিস্ট সরকার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা।

জাতীয় ঐকফ্রন্ট একই ভাবে সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের শোষক ও লুটেরা শ্রেণির নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ মীমাংসার আরেকটি যারপরনাই চেষ্টা। আমার অনুমান, সম্ভবত শেষ চেষ্টা। বাংলাদেশে গণবিক্ষোভ, গণ বিস্ফোরণ ও গণ অভ্যূত্থান সামাল দেওয়াই এর প্রধান রাজনৈতিক কাজ, যেন 'শান্তিপূর্ণ' (?) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিদ্যমান ফ্যাসিস্ট ব্যবস্থাই বহাল রাখা সম্ভব হয়; তাছাড়া নয়া উদারনৈতিক বিশ্ব অর্থ ব্যবস্থার মধ্যে বাংলাদেশকে নিজ দেশের ভেতরে ও বাইরে সস্তা শ্রম সরবারাহকারী দেশ হিশাবে কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে পরাধীন করে রাখা — এইসবই তো তথাকথিত 'শান্তিপূর্ণ' নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্য। দুই ব্যাটলিং বেগম গুড গভার্নেসে ব্যর্থ। এখন আরেকজন শাহাবুদ্দিন দরকার। ডাঃ কামাল হোসেনকে পাওয়া গিয়েছে। মারহাবা!

ব্যক্তিগত ভাবে শাহাবুদ্দিন বা কামাল হোসেনের সম্বন্ধে আমি কোন বিরূপ ধারণ পোষণ করি না, কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জায়গা থেকে তাদের রাজনৈতিক ভূমিকা পর্যালোচনা করা খুবই জরুরি। তাদের ভূমিকা জনগণকে মনে করিয়ে দেওয়াও জরুরি। জনগণ যেন আর প্রতারিত না হয়।

কামাল হোসেন মুক্তি যুদ্ধের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায় বিচার কায়েমের দাবি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বাঙালি, জাতিবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি দিয়ে বাহাত্তরে একটি ফ্যসিস্ট 'সংবিধান' প্রণয়ণ করেছিলেন। এই সংবিধান বাংলাদেশে ইসলাম নির্মূলের রাজনীতি পরিপুষ্ট করেছে।

একটি দেশের কন্সটিটিউশান জনগণ প্রণয়ন করে; একজন উকিল বা একজন ব্যক্তি প্রণয়ণ করে, এটা একমাত্র আমরা বাংলাদেশেই শুনি। সাংবিধানিক ভাবে শেখ মুজিবর রহমানকে একনায়কতান্ত্রিক শাসক হিশাবে প্রতিষ্ঠিত করার রূপকারও তিনি। তিনি বাকশালী আমলের মন্ত্রী; তিনি উদার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হলে বাকশাল সমর্থন ও বাকশালী সরকারের মন্ত্রী হতেন না। তাঁর চরিত্র জনগণ জানে বলেই তাঁর পেছনে জনগণ কখনই দাঁড়ায় নি।

কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ণ করেছেন এই দাবি জাহির থাকলে আমার অবশ্য সুবিধা ছাড়া অসুবিধা নাই। এই সত্য জারি রয়েছে বলে আমি খুবই আনন্দিত, কারন সবাই কমবেশী এখন জানে কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধান লিখেছেন। এই সংবিধান জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের দলিল না। অতএব আজ হোক বা কাল হোক বাংলাদেশের জনগণকে তাদের ইচ্ছা ও অভিপ্রায় সম্বলিত 'গঠণতন্ত্র' (Constitution) প্রণয়ণ করতে হবে। করতেই হবে। এর কোন বিকল্প নাই। আর সেটা করতে হবে বিজয়ী গণ অভ্যূত্থানের মধ্য দিয়ে একটি গঠণতন্ত্র প্রণয়ণের সভা (Constituent Assembly) ডেকে এবং সমাজের সকর স্তরে ও সকল ক্ষেত্রে তর্ক বিতর্কের মধ্য দিয়ে খসড়া গঠনতন্ত্র প্রণয়ণ করে। সেই খসড়া গঠনতন্ত্র এরপর জাতীয় রেফারেণ্ডামের মধ্য দিয়ে জনগণ গ্রহণ করলে, অর্থাৎ জনগণের সম্মতি নিশ্চিত করলেই আমরা তাকে জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়ের দলিল বলতে পারি।

বাংলাদেশে শাসক ও শোষক শ্রেণির দ্বন্দ্ব, হিংসা ও হানাহানির এই পর্বে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের মতোই কামাল হোসেনের আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁর আবির্ভাব বিএনপির চরম রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং এক এগারোর মাইনাস টু ফর্মূলার ধারাবাহিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যথারীতি নির্বাচন-সর্বস্ব রাজনীতি বাংলাদেশের জনগণকে তাদের সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য থেকে আবারও বিচ্যূত করবে। এ ছাড়া এই নির্বাচন অধিক কিছু অর্জন করতে পারবে বলে আমি মনে করি না।

কিন্তু মানুষ চরম হতাশার মধ্যেও আশা নিয়েই কাজ করে যায়। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাধারন মানুষের মধ্যে কিছু প্রত্যাশার জন্ম হয়েছে। তার কৃতিত্ব যদি কারো থেকে থাকে তবে সেটা মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। বিএনপিকে কামাল হোসেনের নেতৃত্বের অধীনে নেওয়া চরম ঝুঁকির ব্যাপার। বর্তমান শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বিএনপি হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায়। এতে দোষের কিছু নাই। বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্বাচনকে আন্দোলনের কৌশলে পরিণত করবার ক্ষীণ আশা মাথায় রেখে আমি জাতীয় ঐক্যফ্রণ্ট বা কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনকে সমর্থন করি। কারন বর্তমান নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি আমরা সকলেই পেতে চাই। সেই ক্ষেত্রে কামাল হোসেন যদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখেন, তাহলে আমি অবশ্যই তাঁকে স্বাগত জানাবো।

আমাদের রাজনৈতিক পরিমিতি বোধ থাকা উচিত। হুঁশ হারিয়ে ফেলা একদমই অনুচিত।

ফরহাদ মজহার | উৎস | তারিখ ও সময়: 2018-12-01 10:20:47