ডায়াবেটিস: কেন, কিভাবে হয়? থামাবেন কিভাবে? – ডায়েট সিরিজ: সবচে' ই – রেজাউল করিম ভূইয়া

ডায়াবেটিস: কেন, কিভাবে হয়? থামাবেন কিভাবে? – ডায়েট সিরিজ: সবচে' ইম্পর্টেন্ট।
========
আজ বলবো একবিংশ শতাব্দীর সবচে' ভয়ংকর রোগ, সবচে' নজিরবিহীন প্রবলেম: ডায়াবেটিস নিয়ে, কোটি কোটি লোক মারা যাচ্ছে এর হতে। আপনার নাই, তাই আপনি টেনশনমুক্ত না, আপনি সম্ভবত: অন্যদের মতই প্রি-ডায়াবেটিক;হয়তো জানেন না, যে আর কয়দিন পরেই হবে, কাজেই এখন থেকেই জানুন।
=========
কিভাবে আমাদের শরীরে ডায়াবেটিস ডেভেলপ করে?

এভাবে: মনে করেন আপনি ভাত/রুটি/চিনি বা যে কোন শর্করা খেলেন, খাবার সাথে সাথে খুব দ্রূত এই খাদ্য হজম হয়ে রক্তে গ্লূকোজ চলে যায়। ভেরী গুড। কিন্তু এত গ্লূকোজ তো এক সাথে দরকার না। আস্তে আস্তে দরকার। যত পরিশ্রমই করেন, আপনার দরকার সবসময় ৫-৬ মিলিগ্রাম/ডেলি পরিমান গ্লূকোজ। এখন আমরা যেহেতু একসাথৈ অনেক শর্করা খাই, রক্তে গ্লূকোজ সব জমে গিয়ে তা দশগুন বেড়ে ৩০ মিলি/ডেসিলিটার হয়ে বসে থাকবে। তখন সব অতিরিক্ত গ্লূকোজ শরীরের আনাচে কানাচে জমে ব্রেন-লিভার-হার্ট-কিডনী-জয়েন্ট-কান-চোখ সবকিছু নষ্ট হবে।

কাজেই উপায়? উপায় একটাই, এই গ্লূকোজকে শরীরে সঞ্চয় করতে হবে, রক্তে এত গ্লূকোজ এলাউ করা যাবেনা। কাজেই আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন প্যানক্রিয়াস। প্যানক্রিয়াসে আছে বিটা সেল। যখনই গ্লূকোজ বাড়তে যায় ( ৬ মিলী/ডেলির বেশী ), তখনই প্যানক্রিয়াসের বিটা সেলকে ব্রেন সিগনাল দেয়, সে ইনসুলীন নামক এক খতরনাক হরমোন ছেড়ে দেয়।

এই খতরনাক হরমোন রক্তের মধ্যে এসে সব গ্লূকোজকে পিটাইয়া ট্রাইগ্লিসারিড বানাইয়ে কোষের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে দেয়। ব্যস, গ্লূকোজ জমে ফ্যাট হয়ে যায়। রক্তের গ্লূকোজ ৬ এর উপরে উঠতে পারেনা। সব টাইট, প্রবলেম খতম। কোনদিন শুকরিয়া করছেন আল্লাহর , যে বডিতে এমন মেকানিজম অটো দিয়ে দিছে? বলেন আলহামদুলিল্লাহ। আবার এইটা কইয়েন না, যে সব অনুতে পরমানুতে বাড়ি খেয়ে অটো প্যানক্রিয়াস হয়ে ইভোলিউশন হয়ে এই বিটা সেল হয়ে ইনসুলিন প্রডিউস করতেছে, মাইর খাবেন। যত্তোসব ডারশতানী।

======

এখন সমস্যা হল, সব ঠিকই ছিল, কিন্তু সবকিছুরই তো একটা লিমিট আছে, তাইনা। আপনি যদি বছরের পর বছর সাদা চিনি-সাদা ভাত-সাদা রুটি -সাদা মিষ্টি – এইসব শর্করা জাতীয় খাদ্য যা সহজে পাচ্য, একদমে বেশী বেশী খেতেই থাকেন তাহলে কি হবে?

তাহলে প্যানক্রিয়াসকে মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিন ছাড়তে হবে। সেটা সে অবশ্য ছাড়বে। কিন্তু এই খতরনাক ইনসুলিনকে আপনার কোষগুলো একটু ঘৃণা করে, কারণ সে যেই পিটানি দেয়। কাজেই আপনার কোষগুলো ইনসুলিন রেজিসটেন্স ডেভেলপ করবে।

ইনসুলিন রেজিসটেন্স মানে আগের মতন একটু ইনসুলিন বডিতে আসলেই তা গ্লূকোজকে সহজে ট্রাইগ্লিসারিড বানিয়ে কোষের ভিতরে ভরতে পারবেনা। কোষ বাধা দিবে। বেশী ইনসুলিন লাগবে এখন। মানে কোষের ভাব বাড়তেছে আরকি মনে করেন। অল্প ইনসুলিনে কাজ হয়না এখন। বেশী লাগে।

তো , প্যানক্রিয়াস তখন বেশী বেশী ইনসুলিন প্রোডিউস করবে, আপনার গ্লূকোজ বিদ্রোহকে দমন করার মতন। কোষ হলো গ্লূকোজের জন্য জেল আরকি, জেল আর লোক নিতে চায়না, এমনিতেই লোকে ভরে আছে। পুলিশ ইনসুলিন জোর করে গ্লূকোজকে কোষের মধ্যে প্রবেশ করাচ্ছে। কোষ রেজিসটেন্ট হয়ে উঠতেছে।

এ প্রকৃয়ায়, প্যানক্রিয়াস যত বেশী ইনসুলিন প্রোডিউস করবে, কোষগুলো তত বেশী ইনসুলিন রেজিসটেন্স হতে থাকবে, আস্তে আস্তে।

====

এই প্রকৃয়া বছরের পর ধরে চলবে, ৫-১০-২০-৩০-৪০-৫০ বছর ধরে চলতে পারে। এক পর্যায়ে ইনসুলিন রেজিসটেন্স এত বেড়ে যাবে, যে প্যানক্রিয়াসের পক্ষে আর ইনসুলিন সাপ্লাই দেয়া সম্ভব হবেনা। বিটা সেল টায়ারড হয়ে যাবে।

এক পর্যায়ে প্যানক্রিয়াসের বিটা সেল টায়ারড হয়ে আর পারবেনা,
অতিমাত্রায় ইনসুলিন দিতে।

তখনই কোষের ইনসুলিন রেজিসটেন্স জয়ী হবে। দেখা যাবে, বডিতে ইনসুলিন আছে, কিন্তু কোষের ইনসুলিন রেজিসটেন্স এত বেশী যে ওই ইনসুলিনে কাজ হচ্ছেনা। কাজেই আপনার সুগার / গ্লূকোজ লেভেল এবার বাড়া শুরু করবে। আর সে ৬ মিলি / ডেসিলিটার থাকবেনা। সে বাড়তে বাড়তে ৭ -৮ – ১২-১৪ – ৩০-৪০ মিলি/ডেসিলিটারেও উঠতে পারে।

ইনসুলিন কিন্তু আসলে আছে বডিতে, কিন্তু কোষের ইনসুলিন রেজিসটেন্স অনেক বেশী হওয়ায় কাজ হচ্ছেনা। কাজেই কোষে সুগার/ গ্লূকোজ জমা হচ্ছেনা, রক্তের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু রক্তে এত গ্লূকোজ থাকতে পারেনা, কাজেই এই গ্লূকোজ মস্তিষ্কের মধ্যে – কান- চোখ-শরীরের সব জায়গায় গিয়ে এখন আলগা হিসেবে ডিপোজিট ( জমা) হচ্ছে। এবং তাতে শরীরের সব অর্গান নষ্ট হচ্ছে, প্রায় এক সাথে।

তখনই আপনি ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্লাড টেস্ট করে ডায়াবেটিস পাচ্ছেন। কিন্তু ডায়াবেটিস হবার আগে কিন্তু ৫-১০-১৫-৩০-৫০ বছর আপনার শরীরে কোষের সাথে প্যানক্রিয়াসের একটা যুদ্ধ হয়েছে, যখন আস্তে আস্তে আপনার ইনসুলিন রেজিসটেন্স গড়তে ছিল, কিন্তু আপনি শর্করা খাবার বেশী খাচ্ছিলেন, সুন্নাহকে মানছিলেন না। ওই সময়টা আপনি ছিলেন প্রি-ডায়াবেটিক পেশেন্ট,যদিও বুঝেন নি। ওকে? কাজেই একদিনে/মাসে/বছরে হঠাৎ করে কিন্তু ডায়াবেটিস হয়নি। এটা একটা প্রোগেসিভ ডিসিজ। আস্তে আস্তে হয়, যুগ যুগ ধরে। আমরা প্রায় অনেকেই প্রি-ডায়াবেটিস কন্ডিশনে আছি, কিন্তু জানিনা।

=======

তার মানে ইনসুলিন রেজিসটেন্স থেকে ডায়াবেটিস হচ্ছে (ডায়াবেটিস-টাইপ:২, যেটা সবার হয়)। খুব ধীর প্রকৃয়ায়। এখন এর সমাধান কি এই, যে আরো বেশী করে আপনি ইনসুলিন দিবেন?

আরো বেশী ইনসুলিন দিলে কিন্তু আরো বেশী ইনসুলিন রেজিসটেন্স হবে, কত দিবেন? দিতে দিতে পরে ইনজেকশনে করে দিতে হবে। তারপর? এভাবে কত দিন? এটা কোন সমাধান নয়।

অথচ ট্র্যাডিশনালী অনেকে বেশী বেশী ইনসুলিন ওষুধ বা এমন ওষুধ যা ইনসুলিনের ইকুইভ্যালেন্ট, তা খেয়ে সুগার কমাচ্ছেন। এভাবে আজীবনেও ডায়াবেটিস সারবেনা। বরং বাড়তে বাড়তে আপনি একদিন মরবেন।

======

কাজেই ইনসুলিন বা ওষুধ খেয়ে জোর করে গ্লূকোজ কমানো একটা টেমপোরারী সমাধান, যা ঠেক দিয়ে চলা বলতে পারেন, এটা গ্লূকোজকে ইমিডিয়েট নামিয়ে দেয়, যা বডিকে গ্লূকোজ ডিপোজিট থেকে বাচায়। কিন্তু এটা আলটিমেট সমাধান না।

=====

আলটিমেট সমাধান হল, ডায়েট কন্ট্রোল আর এক্সারসাইজ করে ইনসুলিন রেজিসটেন্সকে কমিয়ে আনা, ধীরে ধীরে। ইনসুলিন রেজিসটেন্স যদি কমাতে পারেন, আপনার প্যানক্রিয়াস থেকে যে ইনসুলিন আসতেছে, সেটাই বডির জন্য যথেষ্ঠ? বুঝছেন? বাহির থেকে ওষুধ দেবার দরকার নাই তো। বাহির থেকে ইনসুলিনও দেবারও দরকার নাই। জাস্ট বডির ইনসুলিন রেজিসটেন্স কমাতে হবে।

=====

তাহলে ইনসুলিন রেজিসটেন্স কমাবেন কিভাবে?

শর্করা জাতীয় খাদ্য বেশী খাওয়া হল ইনসুলিন রেজিসটেন্স এর জন্য দায়ী, রাইট? শর্করা জাতীয় খাবার বাদ দেন, বা কমিয়ে দেন। এসব শর্করা জাতীয় খাদ্য, যেগুলো সহজে হজম হয়, তিড়িং করে বডিতে সুগার / গ্লূকোজ বাড়িয়ে দেয় , এগুলারে বলে 'হাই গ্লাইসিমেক্স ইনডেক্স ফুড'।

হাই গ্লাইসিমেক্স ইনডেক্স ফুড হল: সাদা ভাত-সাদা চিনি-সাদা রুটি-সাদা মিষ্টি-মিষ্টি ফল-গুড়-ইক্ষুর রস ….এগুলো র মধ্যে সাদা চিনি হল সবচে বেশী হাই গ্লাইসিমেক্স ইনডেক্স, বুঝছেন? খালী খাবেন, আর ইমিডিয়েট বডিতে গ্লূকোজ চলে যাবে, হজমের কিছু নাই তো। সাথে সাথৈ ইনসুলিন– সেখান থেকে ইনসুলিন রেজিসটেন্স।

সাদা ভাত-রুটি; চিনির থেকে ভাল, কিন্তু স্টীল এগুলাতেও সুগার বাড়ে তাড়াতাড়ি।

কাজেই সাদা চিনি চিরতরে বাদ দেন।

এখন সাদা ভাত-রুটি এসব না খেয়ে তো খাবেন টা কি?

বলে দিচ্ছি। একমাত্র শর্করাই তো এনার্জি বা সুগার/গ্লূকোজের একমাত্র উৎস নয়। তাইনা? ফ্যাট আছে না? আমিষ আছে না? শাকসবজি আছেনা? ওগুলো খাইতে হবে। ওগুলা খাইলে সুগার তিড়িং করে বাড়ে না।

শর্করা একদম না খেয়ে থাকা কোন সমাধান না। কিন্তু শর্করা কমিয়ে ফেলবেন, আর আমিষ-ফ্যাট-শাকসবজি এসব বাড়াবেন। কিন্তু আগে যেমন ২০০০ ক্যালরী দিনে খেতেন, এখনও ২০০০ ক্যালরীই খাবেন, কিন্তু শর্করার একটা বড় অংশ কে রিপ্লেস করবেন ফ্যাট আর আমিষ আর শাকসবজি দ্বারা, মোটাও হবেন না। কেমনে কিভাবে করবেন, সেটা বলতেছি।

আমিষ ( মাছ-মাংস-ডাল-ছোলা) খেলে বডিতে ইনসুলিন আসে প্রায় ৬০% ভাগ কম। খুব কমে যায়। কিন্তু এ থেকেও কিছুটা এনার্জি বডি পায়।

আর ফ্যাট? ফ্যাট হজমের জন্য কোন ইনসুলিনেরই দরকার হয়না, ইনসুলিন লেভেল, প্রায় ৯৯% কমে যায়। আর ফ্যাট কিটোসিস প্রকৃয়ায় এনার্জি দেয় বডিকে, সুগার লেভেল সেইম থাকবে, কিন্তু ইনসুলিনকে সে পুরো বাইপাস করে দেয়। ইনসুলিন ছাড়াই সুগার।

শাকসবজি মাঝা মাঝি। ডিপেন্ড করে। আলু হলো ভাতের মতনই শর্করা, এটাকে সবজি ধরবেন না, এটা কম বা বাদ দিবেন।

কাজেই ফ্যাট থেকে বডিকে এনার্জি দেয়া হল নাম্বার ওয়ান কাজ, আমিষ-শাকসবজি থেকে দেয়া হল দ্বিতীয় কাজ, শর্করা কমিয়ে ফেলা হল আসল কাজ। তাহলে এসব থেকে বডিতে ডাইরেক্ট গ্লূকোজ পাবেনা, ইনসুলিনও দরকার হবেনা; কিন্তু আপনি ঠিকই রক্তে ৬ মিলি/ডেলির গ্লূকোজ পাবেন।
মাঝখান থেকে লাভ হলো, যে আপনার কোষগুলো যে ইনসুলিনের সাথে এতদিন যুদ্ধ করতো, সেটা আর হচ্ছেনা। কাজেই সে আস্তে আস্তে ইনসুলিন রেজিসটেন্স কমিয়ে আনবে, ধীরে ধীরে। ইনসুলিন রেজিসটেন্স কমে গেলে আপনি আবার কামব্যাক করবেন। ওষুধ ছাড়াই বা অল্প ওষুধে সুগার নিয়ন্ত্রণ থাকবে। বুঝা গেল? এইভাবে যেমন কুকুর-তেমন মুগুর।

====
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ফ্যাট বেশী খেলে তো আমি মোটা হয়ে যাবো?

— হবেন না, কারণ আপনি ২০০০ ক্যালরী মেইন্টেইন করছেন। মানে ফ্যাট খাবেন, কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত না। একটু ফ্যাট বেশী খাবেন, আর অনেক বেশী পরিমান ভাত-রুটি কমিয়ে ফেলবেন। এভাবে ব্যালেন্স করবেন।

–ফ্যাট বেশী খেলে তো বুকে ব্লক হবে?

— হ্যা, এটা একটা রিয়েল কনসার্ন। এজন্য আপনি এতটুকু পর্যন্ত ফ্যাট খাবেন, বা এমন ধরনের ফ্যাট খাবেন, যেগুলোতে এলডিএল /স্যাচুরেটেড ফ্যাট/ ট্রান্স ফ্যাট নেই/কম ।

প্রথমে যখন ফ্যাট বেশী খাবেন, এলডিএল একটু বাড়বে, তবে ১-২-৩ মাস পরে আবার কমে যেতে পারে, কমে নরমাল হবে। যদি না যায়, তাহলে ফ্যাট খাওয়া কমাবেন।(ম্যানটু ম্যান ভ্যারী করতে পারে) এভাবে ব্যালেন্স করবেন।

যে পরিমান ফ্যাট খেলে এলডিএল কোলেস্টেরল ১৫৫ এমজি/ডিএল এর কম থাকে, সে পরিমান খেতে পারবেন। এখন ম্যান টু ম্যান ভ্যারী করে বলে, আপনি টেস্ট করে দেখতে হবে।

[ফ্যাট বেশী খেলে প্রথমে ডায়াবেটিস রোগীদের এলডিএল বাড়বে, কিন্তু পরে সুগার লেভেল কন্ট্রোল হলে কিন্তু এলডিএল কমে, কাজেই একটু সময় দিবেন, বডিকে, ২-৩ মাস। কারণ হল: বডি ইনসুলিন রেজিসটেন্স হওয়ায়, বডিতে ইনসুলিন বেশী প্রবাহিত হয়। কিন্তু ইনসুলিন আবার অন্য সব গ্রোথ হরমোনকে সাপ্রেস ( কমিয়ে দেয়) করে, তখন বডি বেশী করে এলডিএল প্রডাকশন করে, কারণ এলডিএল কোলেস্টেরল থেকে গ্রোথ হরমোন প্রডাকশন হয়।

কাজেই ডায়াবেটিস রোগীদের এলডিএল বেশী থাকে ইনসুলিন রেজিসটেন্স এর জন্য। কাজেই যখন বডিকে ফ্যাট দিবেন, সে কিন্তু প্রথমে এলডিএল বেশী বানাবে, কিন্তু ইনসুলিন রেজিসটেন্স কমে আসলে , সে এলডিএল প্রডাকশন কমিয়ে দিবে। (এটা ড. ক্রেগ এর থিউরী), তবে যদি আপনার বডিতে কোন কারণে এলডিএল কোলেস্টেরল না কমে, তাহলে আপনাকে ফ্যাট খাবার কমাতে হবে। নাহলে অনেক দিন (কয়েক বছর) এলডিএল বেশী থাকলে বুকে ব্লক হবে। ১-২-৩ মাস ব্যাপার না। ]

আর ফ্যাট এবং আমিষ এমন জিনিস, যেগুলো সেশিয়েটিং, মানে খেলেই পেট ভরে যায়। কাজেই বেশী খাওয়া লাগেনা, অল্প খেয়েই থাকা যায়।

— দুধের ফ্যাট, বা চীজ (পনির) হল বেস্ট টাইপ অব ফ্যাট। এতে একটু স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকলেও, ক্যালরী কম, আর ট্রান্সফ্যাট নেই। দিনে ২-৩ ফালী চীজ বা ১-২ গ্লাস দুধ : প্রবলেম নেই। খান, আর ভাত-রুটি – মিষ্টি এসব খাবার কমান।

–দুধে ফরমালীন থাকার আশংকা, বা ভাল দুধ পাচ্ছেন না? চীজ খান, সুপারস্টোরে বা এমনি বাজারেও পাওয়া যায়।

–সয়াবীন তেল বা যেকোন বাজারের তেল খুব খ্রাপ, ওগুলাতে ট্রান্স ফ্যাট থাকে। ওগুলো কম খাবেন, যদিও ওটা খেলে ডায়াবেটিস হবেনা, কিন্তু বুকে ডাইরেক্ট ব্লক হবে কিন্তু, ওই তেল হাইড্রোজেনেটেড।

— আমিষ খাবার বাড়ান, শাকসবজি বাড়ান, আমিষ/মাছ-মাংস দিনে ৩০০ গ্রাম খেলেও কিছু হবেনা, দুই বেলা মিলে ; যদি কিডনীতে কোন প্রবলেম না থাকে; শাকসবজিও ৩০০-৪০০ গ্রাম পর্যন্ত নো প্রবলেম। মানে আপনি ভাত কম নিবেন, কিন্তু বিনিময়ে আমিষ-মাছ-মাংস-শাকসবজি বাড়াবেন। ভাত অর্ধেক করে নিন, কিন্তু মাছ/মাংস+সবজি একটু বাড়ান। পেটও ভরবে, সুগারও বাড়বেনা।

—যদি ফ্যাট খেয়ে আপনি একটু মোটাও হন, কিন্তু এলডিএল কোলেস্টেরল না বাড়ে, তাহলে প্রবলেম নাই। নাই। ডায়াবেটিস কিন্তু নরমাল হয়ে যাবে। রোগমুক্ত হবেন আপনি। পরে এক্সারসাইজ করে ঝরান। চিনি খেয়ে মোটা হলে কিন্তু প্রবলেম, সাথে ডায়াবেটিস হয়ে যাবে। এক্সারসাইজ করার সুযোগ নাও পেতে পারেন।

–গরুর/খাসীর গোশত, ডায়াবেটিসকে বাড়ায় না । গরুর চর্বিও না। গরুর সাথে ডায়াবেটিস এর কোন সম্পর্ক নাই। বরং গরু/খাসী সপ্তাহে ৩৫০ গ্রাম পর্যন্ত সেইফ, একজন মানুষের জন্য। গরুর প্রবলেম হল, এটা এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়ায়, সেখান থেকে বুকে ব্লক হতে পারে। সেজন্যই ওই লিমিট। কাজেই সপ্তাহে একদিন গরু খান, ভাত কম খান। অবলা গরু রে সবাই বকে, অথচ সমস্যা সাদা ভাত-সাদা চিনির মধ্যে।

–মুরগী/মাছ/ডিম/ছোলা/বাদাম/দুধ/চীজ এইসব বেশী হবে, আর সাদাভাত-রুটি ৫০% কমিয়ে আনতে হবে। তাহলেই সমাধান।

–দুধ/চীজ এটা আমার খুব পছন্দ , কারণ এটা খুব সেইফ ফ্যাট।
[চীজ + মুরগী/মাছ + এক চিলতে রুটি/ব্রেড] –> এই মিক্সটা ওভেন করে দুপুরে খান বা রাতে, ভাতের বদলে। দেখবেন, কিভাবে ডায়াবেটিস কমে। আপনি এনার্জি পাচ্ছেন কিন্তু শর্করা খাচ্ছেনই না প্রায়। প্রতিদিন এক বেলা এটা খান, ভাতকে রিপ্লেস করেন; আরেকবেলা কম ভাত খান। শর্করাই খাবেন না/কম খান, ইনসুলিনের দরকারই নাই, যেহেতু তারে নিয়ে এতই প্রবলেম। তারে বাদই দেন।

–রোযা রাখলে আস্তে আস্তে ইনসুলিন রেজিসটেন্স কমে। ডায়াবেটিস লাইনে আসে। কাজেই মাঝে মাঝে রোযা রাখুন। ইফতারী কিন্তু সাবধানে, কম করবেন।

====

— আরেকটা সুদীর্ঘকালীন সমাধান আছে, সেটা হল সাদা ভাতের বদলায়, ব্রাউন রাইস বা বাদামী ভাত ( বা লাল ভাত) খাওয়া। সাদা ভাত হল, হাই গ্লাইসেমিক্স ফুড। আর ব্রাউন ভাত হল, লো গ্লাইসেমিক্স ফুড, যেটা আমাদের বাপ-দাদারা খেতো। আর ব্রাউন ভাতে কিন্তু ভাতের চারিদিকে একটা ভাল ফ্যাটের আস্তর থাকে, সেই সাথে ফাইবার থাকে, কাজেই, আপনি ফ্যাট পাচ্ছেন, + ফাইবারের জন্য শর্করা হজম করতে দেরী হচ্ছে, সেজন্য তিড়িং করে সুগার বাড়েনা, একটু আস্তে বাড়ে। কাজেই দীর্ঘকাল করে খেলেও বডি ইনসুলিন রেজিসটেন্স হয়না, বা কম হয়।

— কাজেই আপনি যদি দীর্ঘকাল, মনে করেন ৩০-৪০ বছর ধরে সাদা ভাত/রুটি খান, তাহলে কিন্তু ইনসুলিন রেজিসটেন্স হতে হতে, ডায়াবেটিস হয়ে যেতে পারে। আর মনে রাখবেন, সাদা ভাত স্বাদ হওয়ায় , মানুষ একটু বেশী খায়, আর সাদাচিনি- মিষ্টি খাদ্য চলতেছে এভাবেই ডায়াবেটিস হয়। ২-৩-৪ বছরে কিন্তু হয়না। ব্রাউন রাইস এত খাওয়া সম্ভব না।
====

আর আমরা শারিরিক পরিশ্রম করিনা, কিন্তু শর্করা ঠিকই খাচ্ছি। যদি পরিশ্রম করতাম তাহলে শর্করা খরচ হতো, ইনসুলিন রেজিসটেন্স কিন্তু কম হতো। কাজেই দীর্ঘকালীন এক্সারসাইজ , ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা কমিয়ে দিবে। কাজেই এক্সারসাইজ ( কিছু না পারলে হাঁটা, বা জোরে হাটা) আপনার ইন্সুলিন রেজিসটেন্স কমায়। এটা একটা অপশন মনে রাখবেন।

সমানে সাদা ভাত-সাদা চিনি খাচ্ছেন, আবার সেরকম জীম করেন না, ঘর থেকে বের হন না, এরকম ১৫-২০ বছর চললে, ডায়াবেটিস না হয়ে উপায় নেই ভাই।
=====

কাজেই যদি আপনার ডায়াবেটিস হয়ে থাকে, তাহলে ইন শর্ট:

ক. দুধ/ডিম/চীজ/বাদাম/ছোলা/মাছের তেল+আমিষ+শাকসবজি জাতীয় বাড়াবেন , বিনিময়ে সাদা ভাত/রুটি কম খাবেন, প্রায় ৫০ ভাগ কমিয়ে আনুন, ভাতকে/রুটিকে। [আম-তরমুজ-আখের রস, খেজুরের রস : এসব খেতে পারবেন না। খেজুর-বা কম মিষ্টি ফুল – একটু একটু। টক ফল: একটু একটু বেশী হলে প্রবলেম নেই। ]

খ. সাদা ভাত/রুটির বদলায়, সম্ভব হলে ব্রাউন ভাত/রুটি খান। না পারলে সপ্তাহে ৩ দিন ।

গ. এক্সারসাইজ করুন, না পারলে এটলিস্ট জোরে হাটুন। ট্রেড মিলে দৌড়ানো, সুইমিং, অন্যান্য এক্সারসাইজ, খেলা ধুলা, ফিজিকাল এক্টিভিটি বাড়ান।

ঘ. ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং, বা একদিন অন্তর অন্তর রোযা রাখলে ডায়াবেটিসে কন্ট্রোল হয়। কারণ দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে ইনসুলিনের দরকার হয়না। ইভেন পানি খেয়ে রোযা রাখতে পারেন। ( শরয়ী রোযা হবেনা, কিন্তু ডায়াবেটিস কমবে। ) ইফতারীর সময় দুধ-ডিম-মাছ-মুরগী বাদাম খাবেন, ভাত খাবেন না। ব্যস। ইফতারী কম করবেন কিন্তু। তবে হাইপো না হলে এটা করতে পারবেন। হাইপো হবার সম্ভাবনা থাকলে, কম করে একটু খেয়ে রোযা রাখবেন।

তাহলে ধীরে ধীরে আপনার ইনসুলিন রেসিসটেন্স কমে আসবে। দেখবেন, সুগার কন্ট্রোল চলে আসছে।

====

এসব করতে থাকলে কিন্তু আপনার রক্তে সুগার কমবে, তাই ডাক্তারের পরামর্শে ওষুধ কমাতে হবে, বা আস্তে আস্তে বাদ দিতে হবে, না হলে কিন্তু হাইপো হবে। নরমালী ডায়াবেটিস এর ওষুধ হঠাৎ করে বাদ দেয়া যায়না। আস্তে আস্তে।

=====
আপনার ডায়াবেটিস হয়নি? না হলেও হয়তো প্রি-ডায়াবেটিক, কাজেই আপনিও সাদা চিনি বাদ দেন, বা দিনে ৬ চামচের বেশী নয়। সাদা ভাত কম খান, পারলে ব্রাউন রাইসে শিফট করেন। দুধ-চীজ একটু খেয়ে ভাতকে রিপ্লেস করতে পারেন।

শাকসবজি খান। আমিষ বেশী কম খেতে পারেন, কিন্তু সাবধান সাদা ভাত মাত্রাতিরিক্ত খাবেন না। সাদা চিনি মাত্রাতিরিক্ত খাবেন না। কোল্ড ড্রিংকস, যথাসম্ভব এভয়েড।

=====

ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। আপনার স্বাস্থ্য আসলে আপনার খাওয়ার উপর। আর কেউ দায়ী নয়।

জাযাকাল্লাহ।

M. Rezaul Karim Bhuyan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-07-10 11:18:44