জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বই থেকে কিছু অংশ~ – পিনাকী ভট্টাচার্য

~জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বই থেকে কিছু অংশ~

জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়ার মাস দেড়েক পর শহীদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের বোন নাফিসা কবির, শহীদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, জহিরের স্ত্রী সুচন্দাসহ ১৯৭১ সালে নিহত বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের অনেকে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি তাদের সবাইকে বাড়ির গেটে অপেক্ষমান রাখেন। এক সময় শেখ মুজিবুর রহমান গেটের সামনে এসে বিক্ষোভ ও দেখা করার কারণ জানতে চাইলে তার সঙ্গে নাফিসা কবিরের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়।

শেখ মুজিব বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশ করে বলেন: অনেকে তো দালালি করে মরেছে।

নাফিসা কবির উত্তর দেন, বুদ্ধিজীবীরা কেউ দালালি করে মরেনি। দালালি যারা করেছে তারা এখনো বেঁচে আছে। সে দালালদের বিচারের দাবি জানাতে এসেছি। পরে একদিন জহির রায়হানের বড় বোন নাফিসা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন: জহিরের নিখোঁজ নিয়ে এ রকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে!

শাহরিয়ার কবির সেদিন জহির রায়হানের সঙ্গে মিরপুর গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে সত্যজিৎ রায়ের একবার আলাপ হয়েছিল। প্রসঙ্গতই জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার বিষয়টি আসে। তাদের সংলাপের অংশবিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো:

সত্যজিৎ: জহিরের ব্যাপারটা কিছু জেনেছো?

শাহরিয়ার কবির: তাকে সরিয়ে দেয়ার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। আমরা ব্যক্তিগতভাবে তদন্ত করে যা বুঝতে পেরেছি তাতে বলা যায়, ৩০ জানুয়ারি দুর্ঘটনায় তিনি হয়তো মারা যাননি। তারপরও দীর্ঘদিন তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

সত্যজিৎ: স্ট্রেঞ্জ! এর পেছনে কারণ কী?

শাহরিয়ার কবির: সেটাই ষড়যন্ত্রের মূল সূত্র বলে ধরছি। মিরপুরে দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হলে গভীর ষড়যন্ত্র মনে করার কোনো কারণ ছিল না। আমি যতদূর জানি, বুদ্ধিজীবীদের হত্যার তদন্ত করতে গিয়ে তিনি এমন কিছু তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন যা অনেক রথী-মহারথীর জন্যই বিপজ্জনক ছিল। সে জন্য তাকে সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন ছিল।

প্রখ্যাত বামপন্থি সাংবাদিক নির্মল সেন লিখেছিলেন-

‘সাম্প্রতিককালে জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে যে, পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল- বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থি বুদ্ধিজীবীসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থি শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানতো তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মূহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে। তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে।

তাহলে কোনটি সত্য? জহির রায়হানকে কারা গুম করেছে? পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, আল-বদর, আল-শামস্ না রাজাকার? নাকি মুক্তিবাহিনীর একটি অংশ? স্পষ্ট করে বললে বলা যায়, মুক্তিবাহিনীর এ অংশটি ‘মুজিব বাহিনী’।

১৯৭১ সালে প্রবাসী স্বাধীন বাংলা সরকারের অজান্তে গড়ে ওঠা ‘মুজিব বাহিনী’ সম্পর্কে অনেক পরস্পরবিরোধী তথ্য আছে। বিভিন্ন মহল থেকে বারবার বলা হয়েছে, এ বাহিনী গড়ে উঠেছিল ভারতের সামরিক বাহিনীর জেনারেল উবান-এর নেতৃত্বে। এ বাহিনী মিজোরামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে মিজোদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। এদের দায়িত্ব ছিল রাজাকার, শান্তি কমিটি ও বাংলাদেশের বামপন্থিদের শেষ করে ফেলা। মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এ কথাগুলো বারবার লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। কোনো মহল থেকেই এ বক্তব্যের প্রতিবাদ আসেনি। অথচ দেশে মুজিব বাহিনীর অনেক নেতা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ছিলেন এবং আছেন। তারা এ ব্যাপারে উচ্চবাচ্চ্য করেননি, করছেন না। তাদের নীরবতা তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত বক্তব্যকেই প্রতিষ্ঠিত করছে এবং জহির রায়হানের নিখোঁজ হবার ব্যাপারেও ‘মুজিব বাহিনী’কেই দায়ী বলে ধরে নেয়া হচ্ছে।’

Pinaki Bhattacharya | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-01-30 16:18:14