হুমকি ও প্রতিবাদের সেকাল-একাল – কায়কাউস

হুমকি ও প্রতিবাদের সেকাল-একাল
==================

# হুমকি ( সেকাল ) :

“… জানেন আপনারা (শ্রমিকরা) বাংলাদেশে আরও ত্রিশ লাখ লোক মারা হবে, মানে হত্যা করা হবে, বুঝলেন ! আমি এ খবর আনফিসিয়ালি বলছি না, অফিসিয়ালি বলছি। আর ভাসানী ন্যাপ ও বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নে যারা আছে তারা সব নকশাল। তাদেরকে হত্যা করার নির্দেশ স্বাধীনতার পরই হযেছিল, কিন্তু বড্ড দেরী হয়ে গেছে। এই সমস্ত নকশালদের অবিলম্বেই খতম করা হবে। সুতরাং সাবধান ! আই অ্যাম এমসিএ স্পিকিং॥”

– হাবিবুর রহমান ( শ্রমিক লীগ নেতা, সাবেক গণপরিষদ সদস্য । একমাত্র সদস্য যিনি খুলনা বেতার কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন) / সেপ্টেম্বর, ১৯৭২

তথ্যসূত্র : সাপ্তাহিক হক-কথা সমগ্র / সম্পাদনা : আবু সালেক [ ঘাস ফুল নদী – ফেব্রুয়ারি, ২০০২ । পৃ: ৫৬৪ ]

# হুমকি ( একাল ) :

“… যেখানেই ছাত্রশিবির পাওয়া যাবে সেখানেই ধোলাই দেওয়া হবে। শিবিরের প্রশ্নে প্রয়োজনে আইন হাতে তুলে নিতে হবে। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ছাত্রলীগ পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যেমন আইন হাতে তুলে নিয়েছিল, শিবিরের প্রশ্নে তাই করতে হবে॥”

– সাইফুর রহমান সোহাগ ( সভাপতি, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটি ) / ০৮ আগস্ট, ২০১৭ ( জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জন্মদিন উপলক্ষে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মরণে আলোচনা সভায় )

# প্রতিবাদ ( সেকাল ) :

“… মুজিবুর তুমি কথা সামলিয়ে বল। তুমি এখন মুজিব ভাই নও, তুমি এখন বাঙালি জাতির পিতা, এখন আর তুমি ছাত্রলীগ কর্মী নও। প্রধানমন্ত্রীর কথার দাম আছে। পাগলামি করলে চলবে না। নকশাল দেখলেই গুলি এটা ভাসানী বলতে পারে – সে প্লাটফর্মের বক্তা। তোমার মুখে যা-তা কথা সাজে না। সাড়ে সাত কোটি মানুষের নেতা তুমি। নকশাল কারও গায়ে কি লেখা আছে? কি করে বুঝবে কে নকশাল? গ্রেপ্তার কর, শাস্তি দাও, প্রাণদন্ড দাও কিন্তু দেখামাত্র গুলি করার কথা বললে চলবে না। এটা হলে বড় বিপদ হবে। আজ দালালির কথা বলে, নকশাল বলে যাকে তাকে ধরা হচ্ছে – দালালরা আজ তোমার দলেই ভিড়েছে।

অন্যদিকে সেনাবাহিনীকেও রক্ষীবাহিনীর কায়দায় বিরোধীদলগুলির বিরুদ্ধে লেলাইয়া দেওয়ার চক্রান্ত শুরু হইয়াছে। ইতিমধ্যেই যাহার লক্ষণ স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে। অযথা হয়রানি এবং গ্রেফতারের কবলে পড়িতেছে বিরোধীদলের নেতা ও কর্মীরা। কিন্তু তফাৎ এই যে, তাহাদের বেলায় আছে বিনা বিচারে কারাগার ও শাস্তির ব্যবস্থা, নাই শুধু তোমার সরকারের কোন পরিচয়পত্র।

ইহাই যদি করিবে তবে কেন তুনি গালভরা বুলি আওড়াইয়া সেনাবাহিনীকে অভিযানে নামাইয়াছিলে? তাহাদের স্বাধীন ও নিরপেক্ষতাকেই যদি পিষ্ট করিবে তবে কেন তাহাদের নিরপেক্ষ অভিযানের ক্ষমতা প্রদানের ধারা দিয়াছিলে?

প্রকৃত অপরাধীদের বাদ দিয়া বিরুদ্ধ নেতা ও কর্মীদের বিরুদ্ধেই যদি লেলাইয়া দিবে তাহা হইলে তোমার সরকারের রক্ষীবাহিনীকেই কেন পূর্ণাঙ্গ হিংস্র পশুতে পরিণত করিলে না? নাকি উদ্দেশ্য তোমার অন্যত্র নিহিত ছিল?

নিরপেক্ষ অভিযানের নামে প্রহসন সৃষ্টি করিয়া দেশের গৌরব, দেশবাসীর প্রধান ভরসা বীর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে জনমত অংশ বেরুবাড়ি 'ভোগ' দিয়া ফারাক্কার পানি বন্টন সমস্যার সমাধান এবং স্বাধীনতার পর হিন্দুস্থানে লইয়া যাওয়া সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার অস্ত্র ফেরত দানের কোন ব্যবস্থা না করিয়াই বাংলাদেশের ভিতর দিয়া হিন্দুস্থানের মালবাহী রেল চলাচলের সম্মতি দিয়া যে চুক্তি তুমি সম্পাদন করিয়া ফিরিয়াছ তাহার বিরুদ্ধে যাহাতে জনমত প্রকাশ এবং বিক্ষোভ প্রদর্শিত হইতে না পারে সেজন্যই কি সেনাবাহিনী নিয়োজিত করিয়া দেশবাসীর দৃষ্টি ঘুরাইয়া দিয়েছিলে? এইজন্যই কি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক অধিকার কাড়িয়া লইয়াছ?

দীর্ঘদিন এই বাংলাদেশে রাজনীতি করিয়াও তুমি জনমত এবং তাহাদের বিদ্রোহী চরিত্র উপলব্দ্ধি করিতে পার নাই তা দেখিয়া দু:খ হয়, করুণা জাগে ভাবিয়া। তুমি স্বাধীনতাকে হিন্দুস্থান ও রাশিয়ার কাছে বিকাইয়া দিয়াছ, জনগণকে গোলাম বানাইয়াছ, তাহাদের অনাহারে কষ্টকর মৃত্যুর দিকে ঠেলিয়া দিয়াছ। বিবস্ত্র করিয়া মা-বোনদের ইজ্জতহানি ঘটাইয়াছ, আইন-আদালতের প্রভুদের সেবাদাসে পরিণত করিলে, তাহাদের বিরুদ্ধে জনমত গড়িয়া উঠিবার সুযোগ করিয়া দিলে। ইহাতে তোমার প্রভুদের মনোরঞ্জন হইতে পারে কিন্তু যে দেশ ও জনগণকে তুমি ভালবাস বলিয়া জাহির কর তাহাদের পরিণতি ভাবিয়া দেখিয়াছ কি?

জনগণ এবং বীর সেনাবাহিনীকে ক্ষেপাইয়া তুলিয়া বিদ্রোহী বানাইলে তাহার পরিণতি শুভ হইবে না। হিন্দুস্থানের পারমাণবিক বিস্ফোরণে যে তাহারা ভীত হইয়া পিছাইয়া যাইবার মতো কাপুরুষ নয় এবং তোমার সরকারের ন্যায় যে তাহারা আত্মমর্যাদা বলিদানকারী গোলামে পরিণত হতেও রাজি নয় এই সত্য উপলব্ধি করিয়া পদক্ষেপ পরিবর্তন না করিলে উহার ভয়াবহ পরিণামের জন্য তোমাকেই দায়ী থাকিতে হইবে। হিন্দুস্থান আর রাশিয়া তাহাদের সকল শক্তি নিয়োজিত করিয়াও মীরজাফরের পরিণতি হইতে তোমাকে রক্ষা করিতে পারিবে না, গোলামীর আনন্দে ইহাও কি তুমি ভুলিয়া গিয়াছ? এখনো সময় চলিয়া যায় নাই, এখনো ফিরিবার পথ রুদ্ধ হয় নাই। তোমার শুভবুদ্ধির উদয় ঘটিলেই দেশ ও জনগণ এক ভয়ংকর পরিস্থিতির কবল হইতে রক্ষা পাইবে বলিয়া তোমার প্রতি আমার আহবান : তুমি আবার সংগ্রামী শেখ মুজিবুর রহমান হও, মনে রাখিও গোলাম মুজিবকে দেশবাসী সহ্য করিবে না॥”

– মাওলানা ভাসানী / জনগণ ও সেনাবাহিনীকে ক্ষেপাইয়া তুলিবার পরিণতি শুভ হইবে না (হক কথা – ০১/০৬/১৯৭৪)

তথ্যসূত্র :- ভাসানী-মুজিব-জিয়া : ১৯৭২ – ১৯৮১ / জিবলু রহমান ॥ [ শুভ প্রকাশন – মে, ২০০৪ । পৃ: ১৫০-১৫২ ]

# প্রতিবাদ ( একাল ) :

ঈদের পরে, ইনশাআল্লাহ …

Kaus Kai | উৎস | তারিখ ও সময়: 2017-08-11 23:20:55