আযাদী আন্দোলনের দলিলপত্র #০৫ – কায়কাউস

আযাদী আন্দোলনের দলিলপত্র #০৫
==================

নিখিল ভারত জমিয়ত-এ-উলামা-এ-ইসলামের ঐতিহাসিক অধিবেশনে মাওলানা আকরম খাঁ
————————————————————————————————
“… ১৯৪৫ সালের ২৬-২৯ অক্টোবর কোলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে নিখিল ভারত জমিয়ত-এ-উলামা-এ-ইসলামের এক ঐতিহাসিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে একটি প্যান্ডেল নির্মিত হয়। সম্মেলনের অধিবেশনকালে বাইরের পার্কে ও রাস্তায় বহু লোক দাঁড়িয়ে রেডিওযোগে তাদের ওলামায়ে দ্বীনের বক্তৃতা শ্রবণ করেন। বাংলা, আসাম, বিহার, পাঞ্জাব, যুক্ত প্রদেশ এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশ হতে বহু বিশিষ্ট আলিম, ফাজিল এই সম্মেলনে যোগদান করেন। এইরূপ সাফল্যমন্ডিত সম্মেলন এবং বিপুল জনসমাবেশ কোলকাতাবাসিগণ বহুদিন দেখে নি। এ ছাড়া সমগ্র ভারতের শীর্ষস্থানীয় আলিম মনীষীদের একত্রে সমাবেশ ছিল অভূতপূর্ব।

… ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম সংরক্ষিত আসনগুলির নির্বাচনী প্রচারণায় ভারতের আলেম সমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উপর্যুক্ত নির্বাচনের প্রাক্কালে ভারত বিভক্তি তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সর্বভারতীয় স্তরে আলেমগণ বিভক্ত হয়ে পড়েন। উল্লেখ্য যে, তৎকালীন সর্বভারতীয় আলেমদের সংগঠন ছিল জমিয়ত-ই-উলামা-ই-হিন্দ। জমিয়ত-ই-উলামা-ই-হিন্দ এ সংগঠনটি ব্রিটিশ বিরোধী খিলাফত আন্দোলনকে সংগঠিত করার জন্য এবং ভারতীয় আলেমদেরকে সংঘবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে ১৯১৯ সালে অমৃতসরে প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সংগঠনের উলেমাগণ পাকিস্তান দাবির বিপক্ষে এবং অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল ইসলাম ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী নয় — ইসলামের উম্মা বা সমাজ আন্তর্জাতিক। তাছাড়া তারা আরো মনে করতেন যে, ভারত বিভক্তি হলে মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হবে এবং বিভিন্ন প্রদেশে সংখ্যালঘু হিসেবে মুসলমানদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ক্ষুন্ন হবে।

অন্যদিকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ও বিভক্ত ভারতের সমর্থক আলেমদের মতে, মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষার জন্য ও মুসলিম জাতি হিসেবে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ভারত বিভক্তি ও মুসলমানদের আলাদা আবাসভূমি পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আবশ্যক। এ মতের আলেমরা ১৯৪৫ সালের অক্টোবর মাসে মওলানা জাফর আহমদ থানবীর সভাপতিত্ত্বে একটি সম্মেলন আহ্বান করে জমিয়ত-ই-উলামা-ই-হিন্দ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জমিয়ত-ই-উলেমা-ই-ইসলাম নামে সর্বভারতীয় স্তরে উলেমাদের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন : যথাক্রমে মওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানী ও মওলানা মােহাম্মদ কােরাইশী শামসী। এ ছাড়া বাংলা থেকে যারা এর সদস্য মনােনীত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন : মওলানা আকরম খাঁ, শৰ্ষিণার পীরজাদা মওলানা আবু মােজাফফর মােহাম্মদ সালেহ, মওলানা রাগিব আহসান, মওলানা কাজী সৈয়দ মােহাম্মদ গোফরান বরকতি, মওলানা এম. এ. হামিদ এবং আল-আমিন পত্রিকার সম্পাদক মওলানা আবদুজ জাহের। এ সংগঠনের আলেমগণ মুসলিম লীগকে ভারতের মুসলমানদের একমাত্র সর্বভারতীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা এবং গণসংগঠন হিসেবে স্বীকার করে। উপর্যুক্ত সংগঠনের উলেমারা আসন্ন নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রার্থীদেরকে জয়যুক্ত করার জন্য বাংলার মুসলিম সমাজকে আহ্বান জানান।

জমিয়ত-ই-উলেমা-ই-ইসলাম -এর সভাপতি ও দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রাক্তন অধ্যক্ষ মওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানি (১৮৮৭-১৯৪৯) ১৯৪৫ সালের অক্টোবর মাসে আহুত কলকাতার উলেমা সম্মেলনে এক লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, “এ সময়ে পাকিস্তান প্রাপ্তির জন্য মুসলিম লীগকে সম্ভাব্য সকল উপায়ে সাহায্য করা দরকার। কারণ লীগ এ নির্বাচনে পরাজিত হলে সুদীর্ঘ কালের জন্য ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের উন্নতির পথ বন্ধ হয়ে যাবে এবং জাতি হিসেবে তাদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। এ অবস্থায় মুসলিম লীগকে আসন্ন নির্বাচনে জয়যুক্ত করা সকল মুসলমানদের কর্তব্য।”

যদিও মাওলানা শাব্বির আহমদ ওসমানি নির্বাচনে মুসলিম লীগকে সমর্থন করে তার মত প্রকাশ করেন, কিন্তু দেওবন্দ মাদ্রাসার অধিকাংশ আলেম নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরোধিতা করে। মওলানা হোসেন আহমদ মাদানীর নেতৃত্বে অখন্ড ভারত তথা কংগ্রেসের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করে।

সর্বভারতীয় জমিয়ত-ই-উলেমা-ই-ইসলাম গঠিত হওয়ার পর বঙ্গীয় প্রাদেশিক শাখার আলেমগণ ১৯৪৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার কাজে লীগ নেতৃবৃন্দেৱ সাথে বাংলার সর্বত্র সফর করেন এবং এ সফরগুলোতে আলেমরা লীগের পাকিস্তান দাবি ও নির্বাচনে লীগকে ভােট দেওয়ার পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বক্তৃতা করেন। তাছাড়া বঙ্গীয় লীগ নেতৃবৃন্দ মুসলমান ভোটারদেরকে প্রভাবিত করার জন্য আলেমদের মাধ্যমে ফতোয়া প্রদান করেন। দারুল উলুম দেওবন্দ মাদ্রাসার সাবেক মুফতি মাওলানা মােহাম্মদ শাহুল ওসমানী ভাগপুর (বিহার) থেকে একটি ফতােয়া জারি করে বলেন যে, “পাকিস্তান সংগ্রামে যোগ দেওয়া জরুরি এবং শরিয়ত মােতাবেক ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) এবং কেবল মাত্র লীগ প্রার্থীকে ভােট দেওয়া একান্ত কর্তব্য।” শর্শিনার পীর মওলানা নেছার উদ্দিন আহমদ (১৮৭১-১৯৫২) স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে নির্বাচনে লীগকে সমর্থন করে বলেন : “বিগত ২৮শে অক্টোবর (১৯৪৫) কলিকাতা ওলামায়ে এছলাম কনফারেন্সে আমার খোৎবায়ে ছাদারাতে মোছলেম লীগের প্রতি আমার সমর্থন উহার এছলামের কথা ব্যক্ত করিয়াছি। বর্তমানেও আমি মোছলেম লীগকে মুছলমানদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ইহার লক্ষ্য মুছলমানদের পাকিস্তান লাভের পন্থা হিসাবে স্বীকার করিতেছি। আমি সমগ্র মুছলমান ভ্রাতাকে এই জেহাদে একযোগে কাজ করার জন্য অনুরোধ করিতেছি।” তাছাড়া, জৌনপুরের পীর মওলানা কারামত আলীর পৌত্র মওলানা আবদুছ ছালাম, ফুরফুরা শরীফের পীর মওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিক প্রমুখ আলেম নির্বাচনে মুসলিম লীগের পক্ষে কাজ করার জন্য আহবান জানান।

পাকিস্তান পহী আলেমদের সংগঠন জমিয়ত-ই-উলেমা-ই-ইসলামের বঙ্গীয় শাখা আসন্ন নির্বাচনে বঙ্গীয় লীগকে সাহায্য করার জন্য একটি পরামর্শ বোর্ড গঠন করে। এ বোর্ডের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক নির্বাচনে সঠিক প্রার্থী বাছাই-এর ক্ষেত্রে লীগকে পরামর্শ দান করা। উক্ত পরামর্শ বোর্ড লীগ পার্লমেন্টারি বোর্ডের সদস্যদেরকে অনুরোধ জানান যে, তারা যেন যোগ্য প্রার্থীকে নির্বাচনের ক্ষেত্রে মনোনয়ন দান করেন, যা তাদের নির্বাচনে জয়লাভের পথকে সুগম করবে। জমিয়ত-ই-উলেমা-ই-ইসলামের নেতৃবৃন্দ ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বঙ্গীয় প্রাদেশিক লীগকে সমর্থন করলেও তাদের নিজেদের সংগঠনের কোন প্রার্থীকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতায় অবতীর্ণ করাননি।

… উক্ত ঐতিহাসিক অধিবেশনে মাওলানা আকরম খাঁ বলেন :

“… বেরাদরানে মিল্লাত ! আজ আপনারা একটি বিপথগামী জমিয়তে ওলামা নিস্তনাবুদ করিয়া তাহার ধ্বংসস্তুপের উপর আর একটি নূতন জমিয়ত গড়িযা তুলিয়াছেন এবং আপনারা সাফল্যমন্ডিত হইয়াছেন – ইহা আশার কথা, সন্দেহ নাই। নূতন জামানার নূতন এমারত গড়িয়া তোলার দায়িত্ব যখন আপনারা গ্র্হণ করিয়াছেন, তখন আপনাদিগকে বাধ্য হইয়া ঘুণে ধরা পুরাতন জমিয়তকে ধ্বংস করিতে হইবে, কেননা ধ্বংস ব্যতীত নূতন এমারত ত​য়ার কঠিন ব্যাপার।

আমাদের মিল্লাতের বৈশিষ্ট্য হইতেছে এই যে, আমরা অন্য জাতির সহিত সদ্ব্যবহার করিতে জানি। বিশেষ করিযা প্রতিবেশীর সহিত সদ্ব্যবহার করার জন্য আমাদের ধর্মে বহু নির্দেশ রহিয়াছে, কিন্তু তাই বলিয়া আমরা অন্যান্য জাতির সহির মিশ্রিত হইয়া একেবারে লোপ পাইতে পারি না। আমাদের জাতীয় শিক্ষা অনুযায়ী আমাদের প্রত্যেক পদক্ষেপ আমাদিগকে অন্যান্য জাতি হইতে আলাদা করিয়া রাখে। যদি কোন জাতি আমাদিগকে আত্মবিস্মৃত হইয়া তাহাদের দাসত্ববরন করিতে বলে, তবে তাহা আমরা কিছুতেই বরদাশত করিব না, করিতে পারি না। আমাদের ধর্মের শিক্ষা অনুযায়ী আমাদিগকে সর্বপ্রথমে প্রতিবেশীর সহিত সদ্ব্যবহার করিয়া চলিতে হইবে। কিন্তু তাহারা যদি আমাদের উপর জুলুম আরম্ভ করিয়া দেয়, অন্যায়ভাবে আমাদিগকে যদি ন্যায্য অধিকার হইতে বঞ্চিত করিতে চেষ্টা করে, তখনও কি আমাদিগকে কাপুরুষের মত বসিয়া থাকিতে হইবে? কোরআন মজীদের শিক্ষানুযায়ী তখন আমাদিগকে আত্মরক্ষার জন্য সংঘবদ্ধ হইয়া দাড়াইতে হইবে। জুলুম ও অন্যায় অবিচারের হাত হইতে রক্ষা পাওয়ার জন্য তখন আমাদিগকে জেহাদ করিতে হইবে।

ইংরেজ একদিন এই দেশ হইতে চলিয়া যাইতে পারে, কিন্তু ইংরেজ চলিয়া যাওয়ার পর কংগ্রেস এই দেশে হিন্দু রাজত্ব কায়েম করিয়া আমাদিগকে দাস জাতে পরিণত করার চেষ্টা নিশ্চয়ই করিবে। তখন এই দেশে এই দুই জাতির মধ্যে অবাঞ্ছিত রক্তারক্তির অনুষ্ঠান হইতে পারে। দেশকে সেই দুর্দিনের হাত হইতে রেহাই দেওয়ার জন্যই মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবী করিয়াছেন। এই দাবী ভারতবর্ষের ভবিষ্যতকে সুন্দর ও সুখময় করার জন্যই করা হইয়াছে। দেশের হিতসাধনই রহিয়াছে এই দাবীর মূলে। আমরা পাকিস্তান দাবী করিয়া অন্যায় কি করিলাম? আমরা আমাদের একান্ত কাম্য প্রাপ্যটুকু চাহিয়াছি। আমরা পাকিস্তান চাহিয়া যদি গোটা ভারতবর্ষের দাবী করিতাম, তবেই অন্যায় হইত। কাহারও প্রতি অবিচার করার দুরভিসন্ধি এবং সম্ভাবনা যদি থাকিত, তবেই উহাকে জরবদস্তি বলা চলিত। আমরা একান্ত স্বাভাবিক এবং ন্যায়সঙ্গত কথাই বলিয়াছি। পাকিস্তান দাবীর বিরুদ্ধে যাহারা ক্ষেপিয়া উঠিতেছেন, তাহাদের মতের স্বপক্ষে কোন যুক্তি আছে কি? আমার মনে হয়, এই বিরুদ্ধাচরণ দূরভিসন্ধিমূলক এবং উহার স্বপক্ষে কোন যুক্তিই নাই। আপনারা বিশ্বাস করিবেন, দশ কোটি মুসলমান কখনও মরিতে পারে না, মরিবে না। তাহাদের ন্যায্য দাবী কেহই ঠেকাইয়া রাখিতে পারিবে না। আজ মুসলিম জাহানে বিরাট বিপ্লবের সূচনা হইয়াছে। এই বিপ্লবের প্রতিফলস্বরূপ মুসলিম জগত নিশ্চয়ই নূতন রূপ ধারণ করিবে। আর সেই ইনকেলাবের ভিতর আমরা ইনশাআল্লাহ পাকিস্তান লাভ করিব॥”

তথ্যসূত্র :-

(১) বিশ শতকের বাংলা / সম্পা: মো: মাহবুবুর রহমান ॥ [ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (রা:বি:) – মার্চ, ২০১০ । পৃ: ৩৭-৩৯ ]

(২) ড: আবুল কালাম মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ / বাঙালি মুসলিম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনে মাওলানা আকরম খাঁর অবদান ॥ [ বাংলা একাডেমী – জুন, ২০০৯ । পৃ: ৩৪৯-৩৫০ ]

Kaus Kai | উৎস | তারিখ ও সময়: 2017-07-22 00:11:52