আযাদী আন্দোলনের দলিলপত্র #০৪ – কায়কাউস

আযাদী আন্দোলনের দলিলপত্র #০৪
==================

১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর সম্মেলনে এ. কে. ফজলুল হক
—————————————————————
“… লাহােরের ঐতিহাসিক মুসলিম লীগ অধিবেশন ১৯৪০ সালের ২২শে মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। ভারতের ভবিষ্যৎ শাসনতান্ত্রিক পরিকল্পনা এবং ভারত সরকারের যুদ্ধ প্রচেষ্টার প্রতি মুসলিম লীগের নীতি নির্ধারণের জন্য এই অধিবেশন আহুত হয়।

এই অধিবেশনের সময় শহীদগঞ্জ মসজিদের ঘটনা উপলক্ষ্য করিয়া আল্লামা মাশরেকীর খাকসার দল সিকান্দার হায়াত খানের মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে লাহােরে ভীষণ বিক্ষোভের সৃষ্টি করিয়াছিল। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগের অন্যতম নেতা স্যার সেকান্দার হায়াত খান ছিলেন পাঞ্জাবের প্রধানমন্ত্রী। সে সময়ে শিখেরা শহীদগঞ্জের মসজিদকে তাদের গুরুদ্বার বলে দাবী করে এবং মার্চ মাসে হাইকোর্ট ও প্রিভিকাউন্সিল যথাক্রমে শিখদের পক্ষে রায় প্ৰদান করে।

আল্লামা মাশরেকীর খাকছার দলের প্রতিবাদে যুক্ত প্রদেশ, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশ প্রভৃতি স্থানের মুসলমানদের প্রাণ দিয়ে শিখদের হাত থেকে মসজিদ রক্ষা করার জন্য মসজিদ ঘিরে রাখতে জমায়েত করতে থাকে। সেকেন্দার সরকার মসজিদ এলাকায় ১৪৪ ধারা জারী করলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে মসজিদের চতুর্দিকে অবস্থান করতে থাকে। প্রথমে পুলিশ দ্বারা গ্রেফতার ও লাঠি চার্জ করেও মসজিদ এলাকা থেকে মুসলমানদের ছত্রভঙ্গ করতে না পেরে লীগ নেতা সৈন্য বাহিনী তলব করেন। সৈন্য বাহিনী দ্বারা দু'তিন শত মুসলমানকে গুলি করে হত্যা করে অবস্থা আয়ত্তে আনতে না পেরে সারা শহরে সান্ধ্য আইন ঘোষণা করে। এ ঘটনা ঘটে ২৩শে মার্চের তিন চার দিন পূর্বে।

ফজলুল হক যখন বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের প্রায় চারশত প্রতিনিধির একটি দল লইয়া লাহাের রেলস্টেশন পীেছেন তখন খাকসার বাহিনী “ফজলুল হক ফিরে যাও” প্রভৃতি ধ্বনি দ্বারা তাঁহাকে বিরূপ অভ্যর্থনা জানায়। কিন্তু ফজলুল হক স্বীয় বুদ্ধি বলে ও সহানুভূতি দ্বারা খাকসারদের হৃদয় জয় করেন। তখন তাহারা তাঁহাকে মিয়া আবদুল আজিজের বাড়ীতে লইয়া যায়।

অধিবেশনে যোগ দিতে যাইবার সময় পথিমধ্যে জনতা ফজলুল হককে “শের-এ-বাঙলা জিন্দাবাদ” ধ্বনি করিয়া স্বাগত জানায়। যখন তিনি মঞ্চস্থলে পৌছেন তখন সভার সমস্ত লোক দাঁড়াইয়া “শের-এ-বাঙলা জিন্দাবাদ” ধ্বনি করিয়া তাঁহাকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করেন। এই সময় জিন্নাহ সভাপতির অভিভাষণ দিতেছিলেন। শেরেবাংলা জিন্দাবাদ ধ্বনির দরুন জিন্নাহকে অভিভাষণ বন্ধ করিতে হয় এবং তিনি এই বলিয়া বসিয়া পড়েন যে, “যখন সিংহ উপস্থিত হয় তখন মেষ-শাবককে পথ হইতে সরিয়া পড়িতে হয়।” জনতা শেরেবাংলার বক্তৃতা শুনিতে চায়। নিয়মানুবর্তিতা বজায় রাখিবার অনুরোধ করিয়া ফজলুল হক তাহাদেরকে শান্ত করেন। ইহার পর জিন্নাহ অসমাপ্ত অভিভাষণ সমাপ্ত করেন।

… ২৩শে মার্চ (১৯৪০) মুসলিম লীগের প্রকাশ্য অধিবেশনে ফজলুল হক ঐতিহাসিক লাহাের প্রস্তাব আনয়ন করেন। প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় তিনি মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশের মুসলমানদেরকে আশ্বাস দিতে গিয়া যাহা বলিয়াছিলেন তাহা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি বলেন, “যাহারা বিষয় কমিটিতে প্রস্তাবের সংশোধন করিয়া একটি কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যবস্থা করিতে চাহিয়াছিলেন তাহাদের নিকট আমার বক্তব্য এই যে, আমরা ১৯৩৭ সালে মুসলমান ও জনসাধারণের পক্ষ হইতে বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছি। আমরা প্রায় দুই শতাব্দী পরে আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের লোকদের জন্য কাজ করিবার সুযোগ পাইয়াছি। আমরা কোনমতেই আমাদের এই ক্ষমতা ও সুযোগ কোন কাল্পনিক ও অজানা কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ছাড়িয়া দিতে পারি না। আমরা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের যুক্তরাষ্ট্ৰীয় অংশটুকু প্রবর্তিত হইতে বাধা দিয়াছি এবং এইভাবে আমরা সাফল্যের সহিত আমাদের উপর হিন্দু প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবার সম্ভাবনা দূর করিয়াছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, ভবিষ্যতেও যদি আমাদের উপর হিন্দু প্রাধান্য স্থাপনের প্রচেষ্টা হয় তাহাও আমরা ব্যর্থ করিয়া দিতে পারিব।”

ইহার পরে বিপুল হর্ষধ্বনির মধ্যে ফজলুল হক বলেন, “আমি কয়েক মাস পূর্বে পাটনায় যাহা বলিয়াছিলাম মুসলিম সংখ্যালঘু প্রদেশে আমার বন্ধুদেরকে আমি পুনর্বাের বলিতেছি। আপনাদেরকে নিশ্চয়তা দিতে এবং কংগ্রেস সরকারগুলিকে জানাইবার জন্য আমি আমার আশ্বাসের পুনরাবৃত্তি করিতেছি। যদিও বাংলাদেশে আমি যুক্ত মন্ত্রিসভার নেতৃত্ব করিতেছি তবু আমি প্রথমে মুসলমান এবং পরে বাঙ্গালী। ১৯০৬ সালে বাংলাদেশেই প্রথম মুসলিম লীগের নিশান উত্তোলিত হইয়াছিল; এখন বাংলাদেশের নেতা হিসাবে সেই মুসলিম লীগের মঞ্চ হইতে আমি মুসলমানদের জন্য আবাসভূমি স্থাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করিবার অধিকার পাইয়াছি।”

ফজলুল হক প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। চৌধুরী খালিকুজ্জামান এবং আরও কয়েকজন প্রতিনিধি ইহা সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি প্রকাশ্য অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। ইহা “লাহাের প্রস্তাব” নামে খ্যাত এবং পরে ইহা “পাকিস্তান প্রস্তাব” বলিয়া পরিচিত হয়। এই প্রস্তাবের দ্বারা মুসলিম লীগ ভারতের শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানের জন্য যুক্তরাষ্ট্ৰীয় পরিকল্পনা অগ্রাহ্য করে এবং দ্বি-জাতির ভিত্তিতে মুসলিম অধূষিত প্রদেশগুলিতে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র স্থাপনের জন্য দাবী জানায়। লাহাের প্রস্তাবে বলা হয় :-

“… ২৭ আগস্ট, ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ও ২২ অক্টোবর, ১৯৩৯ এবং ৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪০ তারিখে সাংবিধানিক ইস্যুতে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটি এবং কাউন্সিল যেসব প্রস্তাব গ্ৰহণ করে সেগুলোর আলোকে গৃহীত সকল পদক্ষেপ অনুমােদন করে আজকের এই অধিবেশন জোর দিয়েই একথা পুনরায় ব্যক্ত করছে যে, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে যে ফেভারেশনের পরিকল্পনা দেয়া হয়েছে সেটা এদেশের বিশেষ অবস্থার বিচারে সম্পূর্ণ অনুপোযোগী ও অকার্যকর এবং মুসলিম-ভারতের কাছে পুরোপুরি অগ্রহণযোগ্য।

এই অধিবেশন দৃঢ়তার সাথে একথাও ব্যক্ত করছে যে, ১৮ অক্টোবর মহামান্য ব্রিটিশ সরকারের পক্ষে ভাইসরয় মহােদয় যে বিবৃতি দিয়েছেন সেটা আমাদের আস্বস্ত করছে এ কারণে যে এতে বলা হয়েছে, যে-নীতি ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন প্রণীত হয়েছে সেগুলো ভারতের বিভিন্ন দল, সম্প্রদায় ও স্বার্থভোগীদের সাথে আলোচনা করে পুনর্বিবেচনা করা হবে। তবে যদি পুরো সাংবিধানিক পরিকল্পনাটি নূতন করে বিবেচনা না করা হয় তাহলে মুসলিম-ভারত সন্তুষ্ট হবে না এবং মুসলমানদের সম্মতি ও অনুমোদন ছাড়া কোন সংশোধিত পরিকল্পনাই তাদের কাছে গ্ৰহণযোগ্য হবে না।

প্রস্তাব করা হল যে, এটা সৰ্বভারতীয় মুসলিম লীগের সুবিবেচিত অভিমত যে, এই দেশে কোন পরিকল্পনা কার্যকর হবে না কিংবা মুসলিমদের কাছে গ্ৰহণযোগ্য হবে না। যদি সেটা নিম্নোক্ত মূলনীতির ভিত্তিতে রচিত না হয়। সেগুলো হল – ভৌগোলিক দিক দিয়ে পাশাপাশি ইউনিটগুলোকে চিহ্নিত করে অঞ্চলে পরিণত করতে হবে এবং সীমানা সংক্রান্ত পুনর্বিন্যাস যতটুকু প্রয়োজন হয় ততটুকু করে এগুলো এমন ভাবে গঠন করতে হবে যাতে যেসব অঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, যেমন ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চল – সেগুলো একই দলভুক্ত হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ গঠন করতে পারে যেখানে গঠনকারি প্রতিটি ইউনিট হবে স্বায়ত্ত্বশাসিত ও সার্বভৌম।

এইসব ইউনিটের সংখ্যালঘুদের জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত, কার্যকর ও বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচের ব্যস্থা রাখতে হবে যাতে ঐসব অঞ্চলে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং অন্যান্য অধিকার ও স্বার্থসমূহ রক্ষিত হয় এবং সেটা করতে হবে তাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে। ভারতের অন্যান্য যেসব অঞ্চলে মুসলমানরা সংখ্যালঘু তাদের জন্য ও অন্যান্য সংখ্যালঘুর জন্য সংবিধানে পর্যাপ্ত, কার্যকর ও বাধ্যতামূলক রক্ষাকবচের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অন্যান্য অধিকার ও স্বাৰ্থসমূহ রক্ষা করা যায়। সেটা করতে হবে তাদের সাথে পরামর্শক্রমে।

এই সব মূলনীতি অনুসারে একটি সংবিধান পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কর্তৃত্বও এই অধিবেশন ওয়ার্কিং কমিটিকে অৰ্পণ করছে। এই সংবিধান পরিকল্পনায় এ রকম বিধান থাকবে যাতে প্রতিটি অঞ্চল নিজ নিজ প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক বিষয়, যোগাযোগ, শুল্ক এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিষয়ে সকল ক্ষমতার অধিকারী হতে পারে।

প্রস্তাবক :
মাননীয় মৌলভী এ. কে. ফজলুল হক, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।

প্রথম সমর্থক :
চৌধুরী খালেকুজ্জামান সাহেব, এম. এল. এ. (ইউপি)।

পরবর্তী সমর্থক বৃন্দ :
মৌলানা জাফর আলী খান সাহেব, এম.এল.এ.(মধ্যপ্রদেশ)।
সরদার আওরঙ্গজেব খান সাহেব, এম.এল.এ. (উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ)।
হাজী স্যার আবদুল্লা হারুণ এম.এল.এ. (মধ্যপ্রদেশ)।
কে. বি. নওয়াব ইসমাইল খান সাহেব, এম.এল.সি. (বিহার)।
কাজী মোহাম্মদ ইসা খান সাহেব, (বেলুচিস্তান প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি)।
আবদুল হামমেদ খান সাহেব, এম. এল. এ. (মাদ্রাজ)।
আই. আই. চুন্দ্রিগড় সাহেব, এম.এল.এ. (বোম্বাই)।
সৈয়দ আবদুর রউফ শাহ সাহেব, এম.এল.এ. (সি.পি.)।
ড. মোহাম্মদ আলম, এম-এল-এ (পাঞ্জাব)।
সৈয়দ জাকির আলী সাহেব, (ইউ.পি)।
বেগম সাহেবা মওলানা মােহাম্মদ আলী।
মওলানা আবদুল হামিদ সাহেব কাদেরী (ইউ.পি.)।

… কেহ কেহ মনে করেন যে, সিকান্দর হায়াত খান লাহাের প্রস্তাবের খসড়া প্রস্তুত করিয়াছেন। লাহাের প্রস্তাবের কয়েক বৎসর পর সিকান্দর হায়াত এক বিবৃতিতে বলিয়াছেন যে, তাঁহার প্রস্তাবের খসড়া আমূল সংশোধন করা হইয়াছিল এবং তিনি যে কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা করিয়াছিলেন তাহা বাদ দেওয়া হইয়াছিল। আবদুল্লাহ হারুন দাবী করিয়াছেন যে, তিনি ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারীতে জিন্নাহকে একটিপ্রস্তাবের খসড়া দিয়াছিলেন এবং ইহার উপর ভিত্তি করিয়া লাহোর প্রস্তাব রচিত হইয়াছিল। আলীগড়ের জনৈক ছাত্রের নিকট ১৯৪৫ সালের ১৪ই অক্টোবর লিখিত এক পত্রে ফজলুল হক দাবী করিয়াছিলেন যে, তিনি লাহাের প্রস্তাব প্রস্তুত করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন, “পাকিস্তান সম্বন্ধে আমার বক্তব্য এই যে, আমি যে প্রস্তাবের খসড়া প্রস্তুত করিয়াছিলাম এবং যে প্রস্তাব মুসলিম লীগের লাহাের অধিবেশনে উত্থাপন করিয়াছিলাম এবং যে প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করিয়া পাকিস্তান দাবী গড়িয়া উঠিয়াছে সে প্রস্তাবের প্রতি আমার আস্থা আছে।”

লাহাের প্রস্তাবে মুসলিম লীগ উত্তর-পশ্চিম ভারতের ও পূর্ব ভারতের মুসলিম সংখ্যাগুরু এলাকায় একাধিক স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপনের দাবী করিয়াছিল। এই প্রস্তাবের মধ্যে বাংলাদেশের মুসলমানদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হইয়াছিল। সোহরাওয়ার্দী ও ফজলুল হক লাহাের অধিবেশনে তাঁহাদের বক্তৃতায় বাঙ্গালী মুসলমানদের রাজনৈতিক দাবীর প্রতিধ্বনি করিয়াছিলেন। প্রস্তাবের ফলে বাংলাদেশের শিক্ষিত মুসলমান ও ছাত্র সমাজে অভূতপূর্ব জাগরণের সাড়া পড়ে। স্বাধীন আবাসভূমি স্থাপনের প্রত্যাশায় তাহাদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনা দেখা দেয়। মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা অত্যধিক বাড়িয়া যায় এবং ছাত্রেরা ইহার আদর্শের জন্য সংগ্ৰাম করিতে জীবনপণ করে।

কংগ্রেস ও হিন্দু নেতাদের মধ্যে লাহাের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এই প্রস্তাবের সমালোচনা করিয়া মহাত্মা গান্ধী “হরিজন” পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে লিখিয়াছেন, “যদি আমরা শ্ৰী জিন্নাহর অভিমত গ্ৰহণ করি, তাহা হইলে বাংলাদেশ ও পাঞ্জাবের মুসলমানেরা দুইটি স্বতন্ত্র ও পৃথক জাতি হইয়া পড়ে।” ভারত বিভাগ করাকে পাপ বলিয়া তিনি মন্তব্য করেন। জওহরলাল নেহেরু বলেন যে, লাহাের প্রস্তাব করিয়া মুসলিম লীগ ভারতে ইয়ুরোপের বলকান অঞ্চলের মত বহু রাষ্ট্র স্থাপনের দাবী করিয়াছে। কলিকাতার হিন্দু পত্রিকাগুলি লাহাের প্রস্তাবের তীব্র সমালোচনা করে এবং ইহাকে পাকিস্তান প্রস্তাব নামে আখ্যায়িত করে। হিন্দুগণ মনে করে যে বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্টিত হইলে তাহা তাহাদের স্বার্থের পরিপন্থী হইবে। বাঙ্গালী হিন্দু নেতৃবৃন্দ পূর্বে বাঙ্গালী জাতীয়তার প্রবক্তা ছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনের জন্য তাঁহারা বাঙ্গালী মুসলমান নেতাদের সহিত বাংলাদেশে চুক্তি স্বাক্ষর করিয়াছিলেন। ১৯৩৭ সালে যখন ফজলুল হকের মন্ত্রিসভা গঠিত হয তখন বর্ণ হিন্দুগণ বাংলাদেশে তাহাদের প্রাধান্য হারাইয়া ফেলে। তাহারা ভয় করে যে, যদি লাহাের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশে স্বাধীন রাষ্ট্র স্থাপিত হয় তাহা হইলে এই রাষ্ট্রে মুসলমানদের শাসন স্থায়ী হইবে এবং তাঁহাদের জমিদারী, মহাজনী ইত্যাদি রহিত হইবে। এই জন্য বাংলাদেশের হিন্দু নেতাগণ সর্বভারতীয় শাসনতন্ত্রে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকার স্থাপনের পক্ষপাতি হইয়া পড়েন॥”

তথ্যসূত্র :-

(১) ডক্টর মুহাম্মদ আবদুর রহিম / বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস (১৭৫৭-১৯৪৭) ॥ [ আহমদ পাবলিশিং হাউস – জানুয়ারি, ১৯৭৬ । পৃ: ২১৭-২২০ ]

(২) বাঙলার জীবন্ত ইতিহাস : শেরে বাঙলা / সম্পা: আনু মাহমুদ ॥ [ এশিয়া পাবলিকেশন্স – ফেব্রুয়ারি, ২০১০ । পৃ: ২৩৩-২৩৪ ]

(৩) জি অ্যালানা / পাকিস্তান আন্দোলন : ঐতিহাসিক দলিলপত্র (অনু: কে. এম. ফিরোজ খান) ॥ খান ব্রাদার্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০৮ । পৃ: ১৪৭-১৪৮ ]

Kaus Kai | উৎস | তারিখ ও সময়: 2017-07-21 00:26:07