বিউটি ইজ ইন দা ব্রেইন অফ দা বিহোল্ডার – আসিফ সিবগাত ভূঞা

বিউটি ইজ ইন দা ব্রেইন অফ দা বিহোল্ডার
—————————————————–

সক্রেটিস ছিলেন খুবই কুৎসিত। বেটে, মোটা, থ্যাবড়া চেহারার। ভিলেইন টাইপের আকর্ষণীয় কুৎসিত না। রাস্তায় যেসব কুৎসিত লোকের দিকে চোখ পড়লে আমরা দ্বিতীয়বার ফিরে তাকাই না সেই টাইপের কুৎসিত। কিন্তু সক্রেটিস হ্যাড আ সেক্সি ব্রেইন। তিনি বাজারে বাজারে তর্কের টেবিলে মানুষকে পারসেপশন আর রিয়েলিটির পার্থক্য বুঝিয়ে বেড়াতেন যাতে মানুষ বাস্তবতা নিয়ে চিন্তা করে। তিনি সবাইকে বলতেন যে তিনি আসলে মোটেই কুৎসিত না বরং বেশ সুদর্শন।

তার মূল প্রস্তাব হোলো এই যে তাকে কুৎসিত বলার জন্য মানুষ একটা পারসেপশনাল স্ট্যান্ডার্ড ব্যবহার করছে যেটা আসলে কোনও অবজেক্টিভ বাস্তবতা নয়। কে বলেছে যে সুন্দর হতে হলে নাক টিকোলো বা খাড়া হতে হবে, এটা কোথা থেকে বেঞ্চমার্ক হোলো? কে বলেছে চোখ টানা টানা হতে হবে, চিবুক চোখা হতে হবে, ইত্যাদি। সক্রেটিস দাবী করলেন যে স্ট্যান্ডার্ডকে বদলে দিলেই তার থ্যাবড়া নাক, কুৎকুতে চোখ, ও মোটা ধামড়া বেটে শরীরটাই হ্যান্ডসাম বলে আখ্যায়িত হতে পারে।

না, সক্রেটিস নারী মহলে তার দর বাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন না। নিজের সৌন্দর্য আর কদর্য নিয়েও তার কোনও মাথাব্যাথা ছিলো না। তিনি শুধু চাইতেন মানুষকে তার পারসেপশনাল জগত থেকে বের করে নিয়ে এসে রিয়েলিটি অফ থিংস নিয়ে চিন্তা করাতে।

আমি কদিন আগে লাইলি মজনু নিয়ে একটা স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির লেখায় লাইলি ও মজনুর একটি ইন্টারেস্টিং অ্যানেকডোট আছে। লাইলির গোত্র যখন মজনুর বিরুদ্ধে সুলতানের কাছে নালিশ করেছে তখন সুলতান সালিশের আয়োজন করলেন। সুলতান লাইলিকে (অ্যাকচুয়াল নাম লায়লা) প্রশ্ন করলেন: “মজনু তো দেখতে এমন কিছু না, ওকে তোমার এত ভালো লাগলো কেন?” লাইলি সুলতানকে মুখ ঝামটা দিয়ে বলেছেন: “আমার চোখ যদি তোমার থাকতো তাহলে তুমি বুঝতে কেন ওকে এত ভালো লাগে।”

লাইলির কথাটা খুব ইন্টারেস্টিং, কিন্তু হয়তো আরও সঠিকতর হোত যদি লাইলি বলতো যে “আমার মস্তিষ্ক যদি তোমার থাকতো …”। সমস্যা হচ্ছে মস্তিষ্ক শব্দটির কাব্যগুণ চোখের চেয়ে কম। অবশ্যই ভালো লাগালাগির ব্যাপারটা শুধু ফিজিকাল অ্যাপিয়ারেন্সে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেখানে অন্যান্য আরও অনেক ফ্যাক্টর কাজ করে। কিন্তু আমার আলোচনা এখানে ফিজিকাল অ্যাপিয়ারেন্সের ওপর।

বর্তমান নিউরোসায়েন্সকে আমলে নিলে কাব্যজগতে কিছুটা ধ্বস নামাটা অসম্ভব না। নিউরোসায়েন্স আমাদের মস্তিষ্কের কাজকে যেভাবে বর্ণনা করেছে তাতে মনে হয় যে সক্রেটিস ও লাইলি ঠিকই বলেছেন, কিন্তু জ্ঞানতাত্ত্বীক বা অ্যাস্থেটিক ভাবে নয়, চাঁছাছোলা বৈজ্ঞানিক অর্থে।

আমরা যখন কারও চেহারার দিকে তাকাই তখন মনে হতে পারে আমরা সরাসরি নিখুঁত একটি রিফ্লেকশন দেখছি। আসলে প্রথম যখন দৃশ্যটি আমাদের চোখে আসছে তখন আমরা আসলে বিভিন্ন রঙের ব্লব দেখতে পাচ্ছি। এই রঙের ছড়াছড়ি আমাদের মস্তিষ্কের একেবারে পেছনে অক্সিপিটাল লোবে গিয়ে জমা হচ্ছে। এই লোব হচ্ছে দৃশ্যের অনুবাদক। কিন্তু এই অনুবাদ শেষ নয়। এরপর সে ছবিকে একজন ফটো ইডিটরের কাছে পাঠায়। মস্তিষ্কের এই ফটো ইডিটর প্রত্যেকটি ছবির এজ ঠিক করে দেয়। এই পুরো ব্যাপারটি ঘটে রিয়েল টাইমে। আপনি যখন তাকান তখন প্রত্যেকটি জিনিসের শার্প ডিস্টিংশন পুরোপুরি নির্ভর করে এই এজ তৈরির ওপর।

একজনের চেহারায় চোখ কেমন, নাক কেমন, চেহারা থেকে তার কাপড়কে আলাদা করা – এসকলের জন্য এই ব্যক্তির রিয়েলিটির চেয়ে আপনি নির্ভর করছেন আপনার ব্রেইনের এজ ড্রয়িং ক্যাপাসিটির ওপর। আসলে আপনি একটি ব্যক্তির চেহারা তার অ্যাকচুয়াল রিয়েলিটিতে দেখছেন নাকি আপনার মস্তিষ্কের কন্সট্রাক্ট থেকে দেখছেন সেটার ব্যাপারে একটা ফিলোসফিকাল ধাঁধা রয়েই যাবে।

নিউরোসায়েন্স ও সাইকোলজির যৌথ গবেষণা থেকে এরকমটা ধারণা করা হয় যে একটি চেহারার পারসেপশনাল সৌন্দর্য মূলত নির্ভর করে চেহারার সিমেট্রি বা সুষমতার ওপর। আপনি একটি চেহারাকে যদি নাক বরাবর লম্বালম্বি দুই ভাগে ভাগ করেন তাহলে যে চেহারার দুই ভাগে যত বেশি সিমেট্রি হবে অর্থাৎ অনুরূপ হবে সেই চেহারা ততবেশি আকর্ষণীয় – অন্যের কাছে। যেমন হলিউড অভিনেতা ব্র্যাড পিটকে অনেকে ধরেন কুইন্টেসেনশিয়াল অ্যাট্রাকটিভ মেইল ফেইস হিসেবে। ব্র্যাড পিটের চেহারাকে এভাবে দুভাগে গ্রাফিকালি অবজার্ভ করে দেখা গেছে যে তার চেহারার সিমেট্রি আশ্চর্যরকমের।

একটি চেহারা হয়তো তার নিজ কন্সট্রাক্টে সিমেট্রিকাল হতে পারে। আর হতে পারে যে অন অ্যাভারেজ একটি চেহারা অন্য আরেকটি চেহারার চেয়ে মানুষের কাছে বেশি সমাদৃত হচ্ছে। তার পরেও আমাদের ব্রেইনের যে ছবি আঁকা সেটা ইউনিক থেকে যেতে পারে। একটি এইজ ওল্ড ফিলোসফিকাল ডিবেইট হোলো যে আপনার লাল আমার লাল কিনা। অর্থাৎ একটা লাল রঙের বস্তর দিকে তাকালে আমরা দুজনেই সেটাকে লাল বলে রেকগনাইজ করি ঠিকই কিন্তু আমরা দুজনেই লাল বলতে আসলে একই জিনিস দেখি কিনা সেটা আমরা কখনই বলতে পারি না। কারণ সেটা যাচাই করার জন্য – লাইলির কথা অনুযায়ী – আমার আপনার চোখ লাগবে আর আপনার আমার। নাকি আমাদের বলা উচিৎ আমার আপনার ব্রেইন লাগবে আর আপনার আমার!

একইভাবে দুজন তরুণীর কাছে ব্র্যাড পিটকে খুব অ্যাট্রাকটিভ লাগতে পারে। কিন্তু তরুণী ওয়ানের ব্র্যাড পিট আর তরুণী টুয়ের ব্র্যাড পিট একই ব্র্যাড পিট কিনা সেটা আমরা, এই দুই তরুণী আর ব্র্যাড পিট কখনই বলতে পারবে না। বিউটি ইজ ইন দা ব্রেইন অফ দা বিহোল্ডার।

অবশ্যই এই পারসেপশনের ব্যাপারটিতে পরবর্তীতে সোশাল কন্সট্রাক্টও যোগ দিতে পারে। শরীরের সাথে মস্তিষ্কও পরিণত হয়, এবং সে তার সামাজিক চৌহদ্দি দিয়ে প্রভাবিত না হয়েই পারে না। কেন সাবকন্টিনেন্টের কালো মানুষেরা সাদা ফরসা চামড়া আর য়োরোপিয়ান সাদা মানুষেরা কালো বা বাদামী ট্যানড চামড়ার দিকে বেশি আকৃষ্ট হয় তা নিয়ে অনেক আলোচনা হতে পারে। আমাদের সমাজে এ নিয়ে প্রচুর ইথিকাল প্রশ্নও তৈরি হয়। কবি বলেন: কালো যদি মন্দ তাহলে চুল পাকিলে কান্দো কেনে? এসব কবিতা সাহিত্যিক বিচারে খুব ভালো শোনালেও যৌক্তিক না। কেন যৌক্তিক না সেটার ব্যাখ্যা দিয়ে আপনাদের বিদ্যাবুদ্ধিকে ছোট করবো না।

অ্যাট দা এন্ড অফ দা ডে, দেশের সবচেয়ে কালো মানুষটাও পছন্দের কাউকে পেয়ে যায়। য়োরোপের সবচেয়ে মরা টাইপের সাদা মানুষও তাকে পছন্দ করা কাউকে পেয়ে যায়। কারণ আপনার সাদা বা কালো কি আমার সাদা বা কালো কিনা – সেই প্রশ্নকে ভুলে গেলে চলবে না। বিউটি ইজ ইন দা ব্রেইন অফ দা বিহোল্ডার।

Asif Shibgat Bhuiyan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-02-21 23:09:09