লাইলি-মজনু সমাচার ও ইসলামের চোখে ভালোবাসা – আসিফ সিবগাত ভূঞা

লাইলি-মজনু সমাচার ও ইসলামের চোখে ভালোবাসা
—————————————————————–

লাইলি মজনু আমাদের দেশে প্রচলিত একটি লেজেন্ড। এই কিংবদন্তীর যুগল নিয়ে গান, নাটক, ও সিনেমা হয়েছে প্রচুর। এখনকার সময়ও প্রেমে পাগল কোনও যুবককে মজনু বলে টিজ করা হয়।

সঠিক মত খুব সম্ভবত এটাই যে লাইলি মজনু আসলেই ছিলেন। চতুর্দশ শতকের ইসলামি স্কলার শামসুদ্দিন আয-যাহাবী তার বিখ্যাত বায়োগ্রাফিকাল কালেকশন “সিয়ার আ'লাম আন-নুবালা”তে মজনুর খুব সংক্ষিপ্ত জীবন বর্ণনাও করেছেন।

লাইলির অ্যাকচুয়াল আরবি নাম ছিলো লায়লা বিনত মাহদী আল-'আমিরিয়্যাহ। মজনু নামটা এসেছে আরবি মাজনুন থেকে – যার অর্থ উন্মাদ। স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে প্রেমে উন্মাদ হয়ে যাওয়ার কারণেই তার এই নাম। ফারসি-উর্দুতে শেষের 'ন' কে নাকি সুরে চন্দ্রবিন্দুর মতো উচ্চারণ করা হয় (যেমন পাকিস্তান আসলে পাকস্তাঁ, ঈমান হোলো ঈমাঁ, বুস্তান – বুস্তাঁ)। তাই মাজনুন শব্দটি সাবকন্টিনেন্টে এসে হয়ে যায় মাজনুঁ। মাজনুঁ বাংলায় আসতে আসতে হয়ে গেছে মজনু।

মজনুর আসল নাম নিয়ে মতপার্থক্য আছে। কেউ বলছেন তার নাম ছিলো কায়স বিন আল-মুলাওওয়িহ। এটা সবচেয়ে প্রমিনেন্ট নাম। তবে ইবন মু'আয ও বাখতারি বিন আল-যা'দ – এদুটিও আয-যাহাবী উল্লেখ করেছেন সম্ভাব্য নাম হিসেবে।

মজনু ও লায়লা ছোটবেলার বন্ধু ছিলেন এবং একসাথে মেষ চড়াতেন। সেখান থেকেই তারা দুজন দুজনের সাথে খুব অ্যাটাচড হয়ে যান। মজনুর কিছু কবিতার লাইন যা আয-যাহাবি উল্লেখ করেছেন তা থেকে এসময়ের এবং মজনুর ইমোশনের একটা টেইস্ট পাওয়া যায়। এখানে দুটি লাইনের ভাবার্থ দিচ্ছি।

“আমার প্রণয় যখন এলোকেশী লায়লার সাথে
তার বক্ষ তখনও কিশোরী
আমরা দুজন মেষ চড়াতাম – হায় যদি আমরা
আজও থাকতাম ছোট – আমাদের মেষগুলোও থাকতো তেমনি।”

লাইলি ও মজনুর ব্যাপারে আয-যাহাবি যে তথ্যগুলো দিয়েছেন সেটা খুব ছাড়াছাড়া। তাদের ভালোবাসা ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ সম্ভবত গোত্র বিবাদ। দুজন দুই গোত্রের। লায়লার গোত্র সুলতানের কাছে নালিশ করে মজনুকে শাস্তি দেয়ায় এবং লায়লাকে নিয়ে অন্যত্র চলে যায়। এই শোকে মজনু রীতিমতো উন্মাদ হয়ে যান।

মজনুর পরিবার ও বন্ধুরা – তাকে ডিস্ট্র্যাক্ট করতেই হয়তো – তাকে হাজে নিয়ে যান। হাজ ভালোই চলছিলো কিন্তু বিপত্তি বাঁধে যখন কেউ একজন – হাজের একটি জায়গা মিনার খায়েফ অঞ্চলে – “ও লায়লা” বলে ডেকে ওঠে। ঐ নাম শুনেই মজনু বেহুঁশ হয়ে যায়। পরে মজনুর কবিতায় এই ঘটনার উল্লেখ আসে:

“কে সে উঠলো ডেকে মিনার ঐ খায়েফে
আমার হৃদয় সেই হুঁশ হারালো আর ফেরেনি
অন্য কোনও লায়লাকেই ডেকেছে সে – কিন্তু যেন
আমার লায়লাকেই উড়িয়ে এনেছে কোনও বিহঙ্গিনী”

মজনু এতটাই উন্মাদ হয়ে উঠেছিলেন যে নিজের পরনের কাপড় ছিঁড়ে ফেলতেন। তার বাবা তাকে একবার ঘরে আটকে রেখেছিলেন। এতে মজনু নিজেকে আঘাত করতে থাকেন এবং রক্তাক্ত করে ফেলেন। উপায়ান্তর না পেয়ে মজনুর বাবা তাকে ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে মজনুর লাশ পাওয়া যায় নির্মম মরুতে। তার বন্ধুরা তাকে এনে গোসল করান এবং দাফন করান। আয-যাহাবী উল্লেখ করেন বহু নারী ও শিশুরা ডুকরে কেঁদেছে মজনুর মৃত্যুতে।

ইমাম আয-যাহাবী একজন মেইন্সট্রিম ইসলামিক স্কলার ছিলেন, বিখ্যাত স্কলার ছিলেন। তার বই “আল-কাবাইর” এর বাংলা অনুবাদ বাংলাদেশে অনেকের বাড়িতে আছে – যাতে তিনি কবীরা গুনাহগুলোর একটা বর্ণনা দিয়েছেন। যে পয়েন্টটা বলতে চাচ্ছি সেটা হোলো এই যে – ইসলামিক স্কলাররা জ্ঞানকে কম্পার্টমেন্টালাইজ করতে পারতেন। পরিস্থিতির হৃৎকম্পন ধরতে পারতেন এবং ইসলামিক আদর্শের পাশাপাশি বাস্তবতার যে জৈবিকতা তার সমন্বয় করতে পারতেন অনায়াসে। যা এখনকার বহু মুসলিম 'আলেমদের মাঝে পাওয়া যায় না।

মজনুর এই ছোট জীবনীতে আমরা আয-যাহাবীকে কোনও জাজমেন্টাল বা আদর্শিক ভূমিকায় উঠতে দেখি না। মজনু খুব বড় অপরাধ করে ফেলেছেন এরকম কোনও কথা বা টোন আমরা দেখিনা। মজনুর এই কাহিনী তিনি শেষ করেছেন এই বলে যে – “(মজনুর) কবিতাগুলো ছিলো সবচেয়ে হৃদয় গলানো ও সুন্দর।” বিয়ে বহির্ভুত প্রেম নিয়ে কোনও টীকা টিপ্পনি বা গল্পের মরালও নেই। আয-যাহাবী কন্টেক্সট বোঝেন, কোথায় কী বলতে হবে তার সূক্ষ্ণ ধারণা রাখেন। পুরো লেখায় মজনুর জন্য তার মায়াই প্রকাশ করেছেন। বলেছেন যে “লায়লার জন্য ভালোবাসাই তাকে শেষ করে দিয়েছে” (কাতালাহু হুব্ব লায়লা)।

আগেকার 'আলেমদের সঠিকভাবে স্টাডি করলে আপনি বুঝবেন যে তারা ইসলামের আইডিয়ালকে কন্সট্রাক্ট করতেন ঠিকই। পাশাপাশি তারা জীবনের যে অর্গানিক গতি প্রকৃতি এবং মানব মনের যে অদ্ভুত কেওস বা অর্ডারহীনতা সেটা থেকেও বিস্মৃত হতেন না। তীব্র ভালোবাসা যে একটি সাইকোলজিকাল ডিসঅর্ডারে পরিণত হতে পারে এবং যেকোনও দূরারোগ্য ব্যাধির মতো মানুষকে গ্রাস করতে পারে তার একটা ধারণা তাদের ছিলো। একারণে লাভস্ট্রাক মানুষকে তারা জাজ করতেন না। বরং তাকে ট্রিট করতেন একজন উন্মাদের সাথেই। এটাও একধরণের উন্মাদনা। একজন উন্মাদকে যেমন ইসলামিক আদর্শকথা শোনানো যায় না, একই ভাবে ভালোবাসার উন্মাদকেও যেন আদর্শ দায়িত্বের কথা শুনিয়ে আর কাজ হওয়ার নেই।

আল্লাহ্‌র রাসূলকেও (সা.) আমরা এ অবস্থার নাজুকতাকে বুঝতে ও সেভাবে আচরণ করতে দেখেছি। বড় ঘটনা ছোট করে বলছি। বারীরা ও মুগীসের কাহিনী [বুখারি]। একটি বিশেষ অবস্থার কারণে স্ত্রী বারীরার কাছে সুযোগ আসে যে তিনি চাইলে মুগীসের সাথে বিয়ে অব্যাহত রাখতে পারেন অথবা ভেঙে দিতে পারেন। বারীরা বিয়ে ভেঙে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু মুগীস ছিলেন বারীরার জন্য পাগল। তিনি কেঁদে কেটে প্রচুর অনুনয় বিনয় করতে থাকেন বারীরাকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার জন্য। কিন্তু বারীরা অনড়।

এই অবস্থা দেখে আল্লাহ্‌র রাসূলের (সা.) মনে মুগীসের জন্য মায়া আসে। তিনি বারীরার কাছে আসেন মুগীসের জন্য সুপারিশ করতে। বারীরা তাকে জিজ্ঞেস করেন “হে আল্লাহ্‌র রাসূল! আপনি কি আমাকে আদেশ করছেন?” আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) বললেন: “না কেবল সুপারিশ করছি।” বারীরা সাফ বলে দেন: “আমার সুপারিশের কোনও দরকার নেই।”

লক্ষ্যণীয়, আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) কীভাবে মানুষকে স্পেইস দিতেন ও তাদের অধিকারের জায়গাটা স্পষ্ট রাখতেন। বারীরা নিজেও সে স্পেইসটা ভালো বুঝেছেন।

মুগীস প্রায়ই বারীরার পিছে পিছে ঘুরে কেঁদে কেটে হয়রান হতেন। এটা দেখে আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) যেটা বলেন সেটা কিংবদন্তীর এবং একজন মানুষ হিসেবে তার সৌন্দর্যকে তুলে ধরবে আপনার সামনে। তিনি পাশে থাকা 'আব্বাসকে বলেছিলেন: 'আব্বাস! তোমার অবাক লাগে না যে মুগীস বারীরাকে কতটা ভালোবাসে আর বারীরা মুগীসকে কতটা অপছন্দ করে!” যেন আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) ঐ মুহুর্তটিতে নবী হিসেবে জ্ঞান দিচ্ছেন না, মুফতি হিসেবে ফাতওয়া দিচ্ছেন না। একটা স্বভাবজাত মনস্তাত্ত্বীক আকুলতা পেয়ে বসেছে তাকে।

ইসলাম যে বিয়ে বহির্ভুত ভালোবাসার ব্যাপারে একটা আদর্শিক নিষেধাজ্ঞা দেয় এর কারণ কেবল এটা না যে পুরুষ নারীমাত্রই খালি দৈহিক মেলামেশার জন্য হন্যে হয়ে থাকে, যেমনটা আমাদের সময়কার ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের কথায় অনুভূত হয়। নারী পুরুষের ভালোবাসা একটা স্বাভাবিক ফেনোমেনন এবং তা কেবল দেহজ বা কেবল মনজ নয়। এই মিথস্ক্রিয়ার হদিস আমরা পাইনা। মানুষের মনের অনেক গহীনে থাকা রহস্যের অনেকগুলোর একটি এটি। মানুষ ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক ভাবে এর কুলকিনারা পায়নি যে কেন ও কোথায় দেহ ও মন একই সাথে অনুরণন ঘটায়।

ইসলাম চায় মানুষের কল্যাণ – মাসলাহা। মানুষের অন্যসব কিছুর মতই ভালোবাসাকেও একটি ডিরেকশন দিতে চায় কেবল। ইসলামের এসেন্সে চলে গেলে – আপনারা কী দেখবেন জানি না – আমি দেখতে পাই মানুষের প্রতি আল্লাহ্‌র জ্ঞান ও করুণা নিঃসৃত পথ নির্দেশনা। ফাতওয়াকে বুঝতে হবে এবং দিতে হবে সেই শাশ্বত কল্যাণের স্পিরিট থেকে – বুঝে এবং বুঝিয়ে। ইসলাম তার মূল সত্তায় কোনও বিক্ষিপ্ত ফাতওয়ার সমাহার নয় – ঠিক যেমন চিকিৎসা বিদ্যা নয় কোনও প্রেস্ক্রিপশনের বান্ডিল।

একারণেই এক বিখ্যাত মিশরী 'আলেম তার ছাত্রকে বলেছিলেন: “তুমি যে বইগুলো শিখেছো তার রং হোলো কালো, কিন্তু যে বইগুলো ভবিষ্যতে তুমি পড়বে তার রং হবে লাল”।

Asif Shibgat Bhuiyan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-02-15 20:25:47