পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগোর অন্ধত্ব পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল একটা নতুন ম – মাহবুব মোর্শেদ

পর্তুগিজ লেখক হোসে সারামাগোর অন্ধত্ব পড়তে গিয়ে মনে হয়েছিল একটা নতুন মানবিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলাম। একটা শহরের মানুষগুলো হঠাৎ করে একএক করে অন্ধ হতে শুরু করলো। শহরে সহসা একটা বিপর্যয় নেমে এলো। অন্ধত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হলো। অন্ধদের জন্য আলাদা থাকার ব্যবস্থা হলো। সেখানে নতুন অন্ধদের ওপর কর্তৃত্ব শুরু করলো জন্মান্ধরা। বিস্ময়কর এক গল্প। কোথাও সারামাগো বলেছিলেন, সবাই অন্ধ হয়ে গেলে কী পরিস্থিতি হয় সেটাই তিনি দেখতে চেয়েছিলেন।
সারামাগোর সে নিরীক্ষা মানুষের কল্পনার জগতে এক অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকলো। মশিউল আলমের যেভাবে নাই হয়ে গেলাম পড়তে পড়তে বারবার ব্লাইন্ডনেসের কথা মনে পড়ছিল। ঠিক মিল নয়, কিন্তু আরেকটা অসম্ভব মানবিক অভিজ্ঞতা কল্পনা করেছেন। সহসা আয়না থেকে একটা লোকের প্রতিবিম্ব মুছে যেতে থাকলো। তার নাম মুছে যেতে থাকলো। তার ছবি মুছে যেতে থাকলো। ধীরে ধীরে নিজের কাছে নিজে নাই হয়ে যেতে থাকলো। তখনও অন্যেরা তাকে দেখছে। কিন্তু একদিন সে অন্যদের কাছেও হারিয়ে যেতে শুরু করলো। আইডিয়া হিসেবে চমকপ্রদ এ উপন্যাসের কাহিনী।
ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক মশিউল আলমের নায়ক জামিল আহমেদও একজন ঔপন্যাসিক ও সাংবাদিক। মশিউল আলম এই বইয়ে চারভাবে উপস্থিত। কীভাবে সেটা জানতে হলে বইটা পড়তেই হবে। বোর্হেসের বোর্হেস ও আমির কথা মনে পড়বে।
এমন এক সময়ে এই গল্পটা লেখা এমন এক সময়ের কথা লেখা যখন একের পর এক লেখক প্রকাশক খুন হচ্ছেন। সেই ট্রমার মধ্যে বসে। সেই তীব্র ভয়ের মধ্যে। কিন্তু লেখক সেখান থেকে বেরিয়ে যেন অন্য এক আটপৌরে জীবনের গল্প বলছেন। কিন্তু সে ট্রমার কথা মাথা থেকে সরছে না। জীবনের অর্থহীনতা ও অস্তিত্বের সংকট, সাথে সমাজ রাষ্ট্র, পরিবার সব একাকার হয়ে আছে গল্পে। আর লেখক ও সাংবাদিক লোকটা হারিয়ে যাবার তীব্র সংকট নিয়েও স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে, করতে বাধ্য হচ্ছে।
নিঃসন্দেহে মশিউল আলমের ভাল কাজগুলোর একটা যেভাবে নাই হয়ে গেলাম। নিজেকে ব্যাঙ্গ করতে করতে খুন করে ফেলার গল্প।
সাম্প্রতিক সময়ের উপন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একটানে এক নিঃশ্বাসে পড়ার মতো বই। ২০১৬ সালে বের হওয়া এ বই নিয়ে কোনো আলোচনা হলো না এটা বিস্ময়কর ঘটনা। এ বিস্ময়কর ব্যাপারটাও এমনকি এ উপন্যাসের সাথে বেশ যায়।
আমাদের চলমান সময়ের সবকিছু ১১২ পৃষ্ঠার এ বইয়ে কীভাবে এঁটে গেল সেটাই ভাবছি পড়া শেষ করে।



মাহবুব মোর্শেদ | উৎস | তারিখ ও সময়: 2018-06-21 23:08:13