ফাতওয়া মেন্টালিটি ও সেক্সুয়ালিটি – আসিফ সিবগাত ভূঞা

ফাতওয়া মেন্টালিটি ও সেক্সুয়ালিটি
———————————————-

আগেকার দিনের মুসলিম স্কলারদের মাঝে যে কোনও ইস্যুকে একটা সিস্টেমে ফেলে বোঝার প্রয়াস ছিলো। ইসলামকে তারা কোডিফায়েড কোনও সংবিধান হিসেবে দেখেননি। ল-কে কোডিফাই করার ব্যাবহারিক প্রয়োজন তারা বুঝলেও সেই প্রচেষ্টা দিয়ে গোটা ইসলামের মাকাসিদ বা উদ্দেশ্যকে মাপলে যে চলবে না সেটা তারা বুঝতেন।

এখন সেই দিন নেই। এখন আগে তারা ফাতওয়া ঠিক করেন এবং তারপর সেই ফাতওয়াকে জাস্টিফাই করেন বিভিন্ন কালচারাল পারসেপশন দিয়ে। এটাকে আবার হানাফি ফুকাহাদের উসূলের সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। হানাফি ফুকাহা বা জ্যুরিস্টদের এই খাসলত ছিলো যে তারা মাযহাবের ফাতওয়াগুলো থেকে উসূল ডিরাইভ করতেন। বাকি মাযহাবের উসূলিরা – যাদের মুতাকাল্লিমূন বলা হোত – ইন্ডিপেডেন্টলি প্রিন্সিপ্‌লস সেট করতেন যা অলরেডি দেয়া ফাতওয়ার প্রভাবমুক্ত রাখা হোত।

কিন্তু এখনকার মুফতি বা ফাকীহ নামধারীরা যা করেন তা মোটেই হানাফি ফুকাহাদের পদ্ধতির অনুসরণ বলা যাবে না। এখনকার মুফতিদের ফাতওয়া তৈরি হয় কোনও বিষয়বস্তুগত গবেষণা থেকে না, বরং ইতোমধ্যে গবেষণাহীনভাবে তৈরি ফাতওয়াকে বিভিন্ন কালচারাল প্রেজুডিস ও অপরীক্ষিত ধারণা থেকে সমর্থন দেয়ার মাধ্যমে।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে নিয়ে যেসব আলোচনা এনারা চালান তাতে যে সিদ্ধান্ত আসে সেটা সঠিক/বেঠিক কিনা সেই আলোচনায় যাওয়াটাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় তারা যেসব যুক্তি দেন তার খপ্পরে পড়ে। আপনি ফাতওয়ার প্রতিটা পরতে পরতে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য নির্মোহ আলোচনার চেষ্টা পাবেন না, যেন সত্যিকার জ্ঞানচিন্তা করতে গেলে ফাতওয়া আলাদা হয়ে যাবে, অ-ইসলামিয় হয়ে যাবে।

ভ্যালেন্টাইন্স ডে বা ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা জিনিসটাকে একটা চিন্তাপ্রক্রিয়ার শুরুতে এনে এবং প্রতিটি তথ্যকে যাচাই করে সত্যে আসার ব্যাপারে কোনও চেষ্টা নেই। মুফতি এবং ফাতওয়াগ্রহণকারী দুইয়ের জ্ঞান মোটামুটি একই পর্যায়ের, তাদের সিদ্ধান্তও একই পর্যায়ের।

ছেলেমেয়েদের মেলামেশাকে তারা কেবল একটা যৌন বিপর্যয় হিসেবেই মানুষের কাছে প্রকাশ করেন। সেক্সুয়ালিটি বা সেক্সুয়ালিটির টেনশন ছেলেমেয়েদের মাঝে কীভাবে কোন ডিগ্রিতে কাজ করে সেটা নিয়ে আমাদের মুফতিরা মাথা ঘামান না, ঐ প্রশ্নও তাদের নাই। সেক্সুয়ালিটির ব্যাপারটা কিন্তু এত অবভিয়াস না। প্রতিটা মানুষই বিভিন্নরকম সেক্সুয়ালিটির ওরিয়েন্টেশন নিয়ে জন্মেছে এবং এটার ওপর ডিপেন্ড করে সে কীভাবে এটাকে দেখে এবং ফ্যান্টাসাইজ করে। এমন অনেক ছেলেকে আপনি পাবেন যে তার সেক্সুয়াল নিড ফুলফিল করার জন্য পর্ন দেখবে কিন্তু তার ভালোবাসার মানুষের ব্যাপারে সে সেক্সুয়ালি চিন্তা করতে পারে না। বিয়েশাদি হলে সে হয়তো তার ওয়াইফের সাথে হেলথি সেক্সুয়াল লাইফ কাটাতে পারে, কিন্তু বিয়ের আগে এই একই মেয়ের ব্যাপারে সেক্সুয়ালি কোনও থ্যটস সে আনতে পারে না। সবার ব্যাপারে তাই হয় এমনটা বলা যাবে না। এটা পুরোপুরিই ডিপেন্ড করে সম্পর্কের ডিন্যামিক্সের মধ্যে।

মোদ্দা কথা হোলো ছেলেমেয়েদের মেলামেশার ব্যাপারে ইসলামের যে স্ট্যান্স সেটা এত বালখিল্যতাসুলভ না। বরং এ ব্যাপারে ইসলাম যা কিছু বলেছে তার একটা ধারাবাহিক আলোচনা – উদ্দেশ্য ও আমাদের পরিস্থিতি – এদুয়ের আলোকেই হওয়া দরকার। এজন্য দরকার সেসব মুফতিদের যারা কুরআন হাদীসের নুসূস বা টেক্সটগুলোকে আদ্যোপান্ত গবেষণা করার দক্ষতা রাখেন এবং একইসাথে পরিপার্শ্বের একটা চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে পারেন। তারপরই একটা প্রপার ফাতওয়া ম্যানুফ্যাকচারড হয়ে আসবে। যাকে 'আবদুল্লাহ বিন বায়্যাহ বলেছেন – সিনা'আতুল ফাতওয়া – ফাতওয়া ম্যানুফ্যাকচারিং।

সেক্সুয়ালিটির ব্যাপারটাকে জ্ঞানের নিরিখে – প্রশ্নের নিরিখে খুঁটাতে হবে। এতে করে ফাতওয়া যে চেইঞ্জ হবেই তা নয়, হতে পারে ফাতওয়া একই থাকবে, হতে পারে কিছুটা পরিবর্তিত হবে। যেটাই হোক না কেন, ফাতওয়া তখন একটা সামাজিক অ্যাকশনের স্প্রিংবোর্ড হয়ে উঠবে।

আমাদের গাজোয়ারি ফাতওয়া ভেতর থেকে সমাধান আনে না। এটা শুধু বাইরে থেকে একধরণের সামাজিক লজ্জাবোধ ও সেলফ রাইটিয়াসনেস ধরে রাখতে সাহায্য করে কেবল। আমি সবসময় একটা কথা বলে এসেছি। কঠিন প্রশ্নের সহজ উত্তর দেয়ার চেষ্টা করে কখনও সমাধান আসে না, তবে তাতে নিজেকে আরও প্রান্তিকতার দিকে ঠেলে দিয়ে একটা প্রান্তিক দলের সর্দার বনে যাওয়ার কালচার বজায় থাকে।

Asif Shibgat Bhuiyan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-02-12 15:13:10