বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যার উৎসব – আমান আবদুহু

বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যার উৎসব

আমি দুর্বল প্রকৃতির মানুষ। হঠাৎ গভীর রাতে ফোন বেজে উঠলে আমি খারাপ খবরের আশংকায় আতকে উঠি। মাঝে মাঝে আমি খবরের কাগজের ভয়াবহ খবরগুলো পড়ার সাহস পাইনা। কীবোর্ড ফাইটার কাশেমদের ভয়াবহ যুদ্ধবিবাদ যেন না দেখতে হয় তাই আমি ফেসবুক ইউটিউব এসব ব্যবহার করিনা। কিন্তু তারপরেও কেন জানি কঠিন বিষাদের সব খবর ঘুরেফিরে আমার কাছে চলে আসে। গত সোমবারের কথাই বলি। সারারাত ফেসবুক ব্রাউজ করে সকালের দিকে মাত্র চোখ দুটো লেগে এসেছে এমন সময় প্রচন্ড শব্দে মোবাইল বাজতে শুরু করলো। ফোন ধরার আগেই আমার মন বলে ঊঠলো এটা কোন ভালো খবর হতে পারে না। কিভাবে জানি এ বিষয়গুলো আমি আগে থেকেই বুঝতে পারি। একাত্তর সালের সংগ্রামমুখর দিনগুলোতে এমন অনেক হয়েছে। ট্রেঞ্চে বসে ফোন ধরার আগেই আমি বুঝতে পারতাম ওপার থেকে খারাপ কোন খবর শুনতে হবে। আমার মনটা বিষাদে ছেয়ে গেলো।

ঢাকা থেকে আমার এক ছাত্রী যে খবর জানালো, তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আমার প্রিয় ছাএ সংগঠন ছাএলীগের ছেলেরা বুয়েটের হলে শিবির সন্দেহে একজনকে মেরে ফেলেছে। চট করে আমার একাত্তরের কথা মনে পড়ে গেলো। ভয়াবহ সেই দিনগুলোতে স্বাধীনতাবিরোধীরা পাখি শিকারের মতো অবলীলায় মানুষ মেরে ফেলতো। কিন্তু স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির কাছ থেকে আমি এ আচরণ কখনোই প্রত্যাশা করি না।

আমি যখন আমেরিকায় ছিলাম, দেশের মাটিতে বৃষ্টির সাথে ব্যাঙের ঘ্যাঙরঘ্যাঙ ডাক শোনার জন্য চাকরিটি ছেড়ে ফিরে আসার আগে সেখানে একটা কথা শুনেছিলাম। উইথ গ্রেট পাওয়ার কামস গ্রেট রেসপনসিবিলিটি। তরুণ বয়সী যে ছেলেগুলো আমাদের এই প্রিয় দেশটিতে চেতনা করার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে তাদের এই দায়িত্বহীন আচরণ আমাকে ব্যথিত করে তুলে। ছেলেটিকে কেন মরতে হবে? সে মারা না গেলেই কি হতো না?

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা উচ্ছল পড়ালেখা করবে, গল্প করবে। তারা সেখানে দেশের ইতিহাস জানবে। বিজ্ঞান করে ড্রোন উড়াবে। কিন্তু সেই শিক্ষায়তনে যখন একটি ছেলে লাশ হয়ে যায় তখন আমাদের পেছনে ফেলে আসা ভয়াবহ দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। বিএনপি-জামায়াতের যৌথ শাসনামলের সময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত লাশের উৎসব হতো। আমরা সেই অন্ধকার সময়ে ফিরে যেতে পারিনা। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি কোথাও আড়াল থেকে বসে কেউ গুটি চালছে।

আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, তখন স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রছাত্রীরা এই হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। তাদের দাবীটি অত্যন্ত মানবিক। স্বাধীনতাবিরোধী চক্রকে চিহ্নিত করতে হবে, তাদের প্রতিহত করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যা হওয়া কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের দেশটি ঠিক পথেই এগিয়ে যাচ্ছে, কেবল একটু খানি যত্নের সাথে চর্চা করা হলেই এই ভয়াবহ সমস্যাগুলোর উদ্ভব হতো না। এটা আমি জানি তাই ছেলেগুলোকে নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়তো করি কিন্তু হতাশ কখনো হইনা। তারা বুয়েটে হত্যা না করে বাইরে করলেও হয়তো সমস্যাটা হতো না। কিন্তু এখন ভয়াবহ ক্ষতি হয়ে গেলো। আমাদেরকে আরো পরিণত হতে হবে। আরো সচেতন হতে হবে।

শুধু অপেক্ষা করে থাকি দেখার জন্য দেশটার স্বাধীনতাবিরোধী দুষ্টচক্রকে প্রতিহত করার বিষয়টা কখন আরেকটু পরিণত হয়ে উঠবে।

– ড. হড়হড় যেডবাল
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

(এবারের ঘটনায় প্রফেসর যেডবাল ষাড় অনেক খেটেখুটে এই লেখাটি ড্রাফট করেছিলেন। কিন্তু মানবতার আম্মোর বিশেষ নির্দেশে অন্য একটি লেখা তার নামে পত্রিকাগুলোতে ছাপা হয়েছে। লেখাটি দেশবিদেশের হাজার হাজার ভক্তকে প্রচন্ড হতাশ করেছে। ষাড়ের সেই চিরপরিচিত আলাভোলা সাদাসিধে ফ্লেভার নাই।

গোপনসূত্রে এই বিশেষ খবর পাওয়ার পর মেজর জেনারেল রাহাত খানের নির্দেশে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের স্পেশাল এজেন্ট মক্সুদ রানা এক বিপদসংকূল দুর্ধর্ষ অভিযান চালিয়ে ষাড়ের ল্যাপটপ থেকে অপ্রকাশিত গান্ডলিপিটি উদ্ধার করেছে। জনস্বার্থে সেই আনএডিটেড ভার্সনটি এখানে প্রকাশ করা হলো।)

Aman Abduhu | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-10-12 00:07:42