বাংলাদেশে অনলাইন এক্টিভিজম কেন সফলতা পাচ্ছে না? – ফাহাম আব্দুস সালাম

বাংলাদেশে অনলাইন এক্টিভিজম কেন সফলতা পাচ্ছে না?

আপনি তরুণ, রাজনীতি-সচেতন ও অনলাইন একটিভিস্ট। নেটে বিচরণ করেন রাগ ও নির্ভয়ে; রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা-ছাগু-ভাদা এসব প্রত্যায়ন করেন, ফেসবুকে গদাম দেন (শিশুরা তার পুতুলকে যেভাবে বিয়ে দেয়, স্কুলে পাঠায় – মিথ্যামিথ্যি, ভার্চুয়ালি)। আজ আপনি খাসা একটা স্টেটাস/নোট লিখেছেন – ৫০০ লাইক, ৩০০ শেয়ার, ১০০ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। নীচে কমেন্টের বন্যা, যারা কোনো প্রশ্ন করেছে তাদের আপনি ইচ্ছা-মতোন গালাগাল করেছেন। মোটের ওপর দিনটা আজকে আপনার satisfying ছিলো। অনলাইন এক্টিভিজমের দিক থেকে সার্থক বলা চলে।

কিন্তু খুব সহজ একটা প্রশ্ন করতে ভুলে গিয়েছেন নিজেকে। এই যে আজকে আপনার প্রো-শাহবাগ স্ট্যান্সে যারা বিহবল, তাদের মধ্যে এমন কি কেউ আছে যে ৫ বছর আগে চাইতো যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা যাবে না। যদি না থাকে, তাহলে আমি দুঃখিত, সারা দিনটা আপনার মাটি গেছে । আমাদের বন্ধু রফিকুল্লাহ সানাকে এন্টি-জামাত সবক দেয়ার মানে, আমার কাছে শুধু সময় নষ্ট। তার তো ঈমান পাক্কা। নিজের ও সানা ভাইয়ের এন্টি-জামাত ফীলিং ১০০ ডিগ্রিতে উঠলেও ভোট কিন্তু দুইটাই থাকে, তিনটা হয় না।

হ্যা, আপনার যদি political aspiration থাকে, কিংবা লক্ষ্য যদি হয় অমি রহমান পিয়াল হওয়া তাহলে দিনটা ভালো ছিলো বলতে হবে, কিন্তু আপনার যে মঞ্জিলে মকসুদ অর্থাৎ আলটিমেটলি, ইসলামিস্টদের পলিটিকালি পরাস্ত করা, সেই cause এ আপনি কোনো উপকার তো করেনই নি, বরং ক্ষতি করেছেন। আসলে আপনি fraternity করছেন, cult তৈরী করছেন, কিন্তু activism করছেন না। সব এক মতের মানুষকে এক জায়গায় জড়ো করে আর ছাগু-ছাগু-ছাগু নয়তো ভাদা-ভাদা-ভাদা বলে কাবাডি খেলছেন। একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন।

মাইকেল মুরের ডকুমেন্টারি আপনার ভালো লাগে, দেখেন, মাইকেল মুরেরও পয়সা বাড়ে। কিন্তু তার যে cause, সে লক্ষ্যে এক পাও আগাতে পারেন না। কারণ তিনি ভীষণ ডিভাইসিভ এবং পোলারাইজিং। যে তাকে ভালোবাসে, ডকুমেন্টারি দেখে তার প্রতি ভালবাসা আরো ঘন হয়, আর যে তাকে অপছন্দ করে সে চায় তাকে খুন করতে। বিরোধীদের নিজের দলে আনার লক্ষ্যে তিনি বারবার ব্যর্থ হন। ৭০ এর দশকে ওয়েস্ট এ ফেমিনিস্টদের বিরুদ্ধে এমন একটা অভিযোগ ছিলো – আন্দোলনে যাদেরকে তাদের সবচেয়ে বেশি দরকার সেই মেয়েদেরকেই তারা ক্ষেপিয়ে তুলছিলো (এখন আর এই ভুল তারা করে না)।

ইসলামিস্টদের যেহেতু আপনি “নাই” করে ফেলতে পারবেন না, সেহেতু আপনার একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত তাদের win back করা। এটা যে সম্ভব, খুব ভালো ভাবেই সম্ভব – সেই ভাবনা আপনার মাথায় আসে না কারণ আপনি রেগে আছেন, ভয়ংকর রেগে আছেন। আর যেহেতু আপনি রেগে আছেন, সেহেতু আপনার সামনে কোনো বিগ-পিকচার নেই। রেগে আছেন এজন্য যে সব ব্যাপারে আপনি নিশ্চিত যে আপনি ঠিক (জীবনেও আপনি ভাবেন নি, I might be wrong)। আর নিশ্চিত হয়েছেন এজন্য যে ব্যাপারটা আপনি সরলীকরণ করেছেন। আপনার জ্ঞানের স্বল্পতাকে কমপেনসেট করছেন কনভিকশন দিয়ে। মাঝখান দিয়ে আপনার আর ইসলামিস্টের দূরত্ব দিনে দিনে বাড়ছে। ইসলামিস্টদের “নির্মূল” করা বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন সেটা আপনি নিজেও পরিষ্কার জানেন না।

বাংলাদেশের অনলাইন এক্টিভিজমের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানেই – ভয়ংকর রকমের ডিভাইসিভ, যেজন্য সবাই মিডল গ্রাউন্ড লুজ করে। বাঁশের কেল্লা এক ঘন্টায় দশ হাজার লাইক পাওয়াটাকে নিজেদের পরম পাওয়া মনে করে কিন্তু যেদিন পর্যন্ত এদেশের সেকুলার ও হিন্দুরা তাদের লাইক না করছে ততোদিন পর্যন্ত তারা যে শুন্যের মধ্যেই লাফালাফি করছে, সেটা তারা বোঝে না (লেবাননে হামাসকে কিন্তু শিয়া-সুন্নী-ক্রিশ্চিয়ান সবাই কম-বেশী সাপোর্ট করে)।

কোনো ব্যাপারেই কি অনলাইন এক্টিভিজম কার্যকর না ? নাহ, তা মোটেও না। অল্প মেয়াদে – যেমন নির্বাচনের আগে পোলারাইজিং এক্টিভিজমের বিশেষ গুরুত্ব আছে কিন্ত দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা পেতে হলে অন্য পক্ষকে কাছে টানতে হবে। সেটা কীভাবে হবে এ সম্বন্ধে আমার পরিষ্কার ধারণা নেই কিন্তু গালাগালি করে ডিজএনগেজ করলে যে হবে না সেটা নিশ্চিত।

আর হ্যা, সেকুলার এতিমখানা বানানোর উদ্যোগ নিতে ভুলবেন না যেন। যতোদিন রাষ্ট্রের দায়িত্ব মাদ্রাসা আর এতিমখানা পালন করবে, মাওলানাকে বেহেস্তে পাঠানোর বাসনায় নিশ্চিন্ত হয়ে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকবেন ততোদিন ইসলামিস্টদের সাপ্লাই চেইনটা অক্ষুন্ন থাকবে। আপনার ফ্রেন্ড-লিস্টের চেয়ে দশগুণ বেশী মানুষ আছে এক এতিমখানাতেই, ভুলবেন না যেন।

Faham Abdus Salam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2017-03-10 03:22:21