অতীতকে রোমান্টিসাইজ করার আমাদের একটা প্রবণতা আছে। আমি সতর্কভাবে এই প্র – এএসএম ফখরুল ইসলাম

অতীতকে রোমান্টিসাইজ করার আমাদের একটা প্রবণতা আছে। আমি সতর্কভাবে এই প্রবণতাটা এড়িয়ে চলি। অথবা আমার দর্শন/পর্যালোচনার সাথে এই ভাবনা মেলে না।

আমার শৈশবই রাইট, এখনকারটা রঙ – এই ধরণের এলিটিস্ট ভাবনা আমাদের অনেকের মাঝে কাজ করে। মাটির মানুষ হিসেবে আমার মাঝেও একসময় করতো। ম্যাচিউরড হবার পর এই ভাবনা থেকে বের হয়ে এসেছি।

হতে পারে সময় এখন ভালোর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে খারাপের দিকে গিয়েছে। কিন্তু সবক্ষেত্রেই সেটা হয়েছে মনে করার কারণ নাই। অনেক ক্ষেত্রেই সময় খারাপ থেকে ভালোর দিকেও গিয়েছে। রেইসিজম, সেক্সিজম, হোমোফোবিয়া, জিনোফোবিয়া, মুরুব্বীদের গুন্ডামী, হুজুরদের ভন্ডামী সময়ের সাথে এগুলোও তো কমেছে।

আমাদের ছোটবেলায় ছোটোখাটো বিষয়গুলোতে প্রচন্ড আনন্দ, আবেগ ও স্মৃতি জড়িয়ে থাকার কারণ যতটা বাস্তবিক তার চেয়ে বেশি হচ্ছে, সে সময় বিণোদনের খুব বেশি অপশান/অলটারনেটিভ ছিলো না। ফলশ্রুতিতে, আমাদের আনন্দগুলো লিমিটেড কিছু জায়গায় কনসেনট্রেটেড থাকতো। অল্প জায়গায় অ্যাটেনশান কনসেন্ট্রেটেড থাকলে তার ঘনত্ব বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক।

বিকল্পের অভাবে হোক আর পছন্দের কারণে হোক, “ইত্যাদি”, “কোথাও কেউ নেই”, “আলিফ লায়লা” দেখার জন্য সারাদেশ একসাথে অপেক্ষা করার যে আনন্দ-উত্তেজনা ছিলো, পরদিন স্কুলে গিয়ে সবাই কমন টপিকে গল্প করা, এ বাস্তবতা এখন পাওয়া অসম্ভব। অতীতের সে আনন্দ ও উত্তেজনা বর্তমানকালে হাজারো চ্যানেল আর বিণোদন উৎসের ভীড়ে সুইচ করার মাঝে খুঁজে পাওয়া যাবে না সেটা খুবই স্বাভাবিক।

কিন্তু সেই আনন্দ এখন আর নাই বলে এখনের আনন্দগুলোর দাম নাই বা গুরুত্ব কম বলার আমি কে? আপনি যেটাতে আনন্দ পেতেন এখনকার ছেলেপেলে হয়তো সেটাতে আনন্দ পায় না বা সেই আনন্দ চায় না।

আবার এখন ইচ্ছা না করলেও জোর করে বিটিভি কিংবা জনসংখ্যা বৃদ্ধি করার মাঝে ঘুরপাক খেতে হয় না। বিণোদণের জন্য এখন হাজারো অপশান, হাজার চ্যানেল, অসীম ইন্টারেন্ট, ফেইসবুক, ইউটিউব রয়েছে। সেটিকে ভালো বলবেন নাকি খারাপ বলবেন?

এক অর্থে অপশান থাকা খারাপ। অপশান জীবনকে জটিল করে তোলে। তবে সেটাও কি অপশান থাকার বিলাসিতা নয়?

নাইনটিজের নাটক, সিনেমা, জীবনাচরণকে গ্ল্যামারাইজ করার এক ধরণের প্রবণতা, বিশেষ করে নাইনটিজের জেনারেশানের মাঝে, দেখবেন। সারাদিন খাটের মাঝখানে বসে থাকাকেও পারলে উনারা গ্ল্যামারাইজ করেন “আহারে, আগে পরিবারের সবাই মিলে কি সুন্দর বোরড হতাম!” এসব দাবির পেছনের কারণ যতটা বাস্তবিক তার চেয়ে বেশি রূপক।

এখন বলতে পারেন, “নাইনটিজের নতুন কুঁড়ি বা বিটিভির নাটক দিয়ে যারা উঠে এসেছে তাঁদের মত শিল্পী তো এখন আর তৈরী হয় না!”

ইয়েস অ্যান্ড নো। ইয়েস এ কারণে যে আসলেই এখনকার শিল্পীরা সে সময়ের শিল্পীদের মত অত শক্তিশালী না। কিন্তু এর কারণ এটা না যে প্রতিভার সাপ্লাই সব নাইনটিজেই শেষ হয়ে গেছে। এখন যা আসে সব ভেদা মাছ। আগে একটাই প্ল্যাটফর্ম ছিলো- বিটিভি। সুতরাং এই এক প্ল্যাটফর্ম দিয়ে উঠে আসতে হলে অনেক কম্পিটিশান শেষে শুধু সেরারাই উঠে আসতো। বাকিরা ঝরে যেতো।

তখন যারা মিডিয়ায় স্টাবলিশড হয়েছে তাঁদের উঠে আসার গল্পগুলো শুনবেন। এখন প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য তার ১০০০ ভাগের ১ ভাগ কষ্টও করতে হয় না। অসংখ্য প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় মেধা ঝরে যাওয়ার কোনো ঘটনা এখন ঘটে না। উল্টা হিরো আলমের মত ক্লাউন “চেষ্টা থাকায়” ভাইরাল হয়ে যায়। এটাকেও আপনি ভালো খারাপ দুইভাবে দেখতে পারেন।

স্যাম্পল সাইজ বড় হওয়ায় এখন ভালো কেউ উঠে আসলে বা ভালো কোনো নাটক হলে অসংখ্য অপশানের মাঝে সেগুলো হারিয়ে যায় (তাছাড়া সময়/কালচারও বদলেছে)। এটাকে আপনি চাইলে নেতিবাচকভাবে দেখতে পারেন, আবার ইতিবাচকভাবেও দেখতে পারেন।

অন্যদিকে, আগের মত প্রতিযোগিতা/সীমিত প্ল্যাটফর্ম না থাকায় আগের মত বাছাই করা লোক এখন আর পাওয়া যায় না। এ+ প্লাস সিস্টেম চালু হওয়ায় স্ট্যান্ড করা ২০ জনও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। এটাকেও আপনি ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু'ভাবেই দেখতে পারেন।

সাম্প্রতিককালে যেহেতু নাইনটিজের বিতর্ক অনুষ্ঠানের কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সেহেতু সেই প্রসঙ্গ টেনে আলাপটা শেষ করি।

দেখতে পাচ্ছি, আপনারা সবাই সেই “বিতর্ক” অনুষ্ঠানটি দেখে মুগ্ধ হয়ে গেছেন। যদিও সেখানে আবৃত্তির মত করে বাংলা বলার (যে বিষয়টা আমার কাছে কৌতুকের মত লাগে) বাইরে আর কি সাবস্টেন্স আছে আমি বলতে পারবো না। এই বিতর্কগুলো ছেড়ে দিয়ে পাশাপাশি ইউটিউব থেকে একটা আবৃত্তি ছেড়ে দিবেন। পার্থক্য খুঁজে পেলে জানাবেন।

বলছি না এরকম নাটুকে/কৌতুকপূর্ণ উপায়ে বিতর্ক করাটা ভুল ছিলো। বলছি, এককালের হিট মুভি দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে দেখতে বসে এসব ভাঁড়ামি এখন ৩০ মিনিটের বেশি নিতে পারবেন না। বাজারে এখন হাজারো জনরা চলে এসেছে। সেগুলো দেখার পর ৩০ বছর আগের সস্তা, চটুল প্রেমের গল্প ভালো না লাগাটা অস্বাভাবিক না।

বিতর্কের সেই ভাইরাল ভিডিওগুলোর একমাত্র “গুণী” দিক ছিলো প্রমিত ও শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণ। গ্লোবালাইজেশানের যুগে শিল্পকলা একাডেমির নাটুকে বাংলা হারিয়ে গেছে বিধায় নাইনটিজের প্রমিত বাংলা শুনে আমাদের মুগ্ধ লাগা ঠিকই আছে।

বিতর্কের যে কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ দেখে আপনারা উত্তেজিত হয়ে আছেন সেখানে সাবস্টেন্স বলতে আসলে কিছু নেই। কারণ সেগুলো সত্যিকারের ডিবেট ছিলো না। প্রীতি বিতর্ক ছিলো। বিতর্কের মজা পেতে হলে এইসব “প্রীতি” বিতর্ক না দেখে সত্যিকারের বিতর্ক দেখতে হবে। তখন বিটিভিতে প্রতি সপ্তাহে ডিবেট প্রচারিত হতো। আমি প্রতি সপ্তাহে এক ঘন্টা ধরে পুরো ডিবেট দেখতাম।

সুতরাং তখন সত্যিকারের ডিবেট কেমন ছিলো সে ব্যাপারে আমি ধারণা রাখি। সে সময় অনেক জটিল ও সিরিয়াস বিষয়ে দুর্দান্ত বিতর্ক হতো। আমি শ্যুর এই ডিবেটারদেরই সেরকম সিরিয়াস ডিবেটের অসংখ্য দৃষ্টান্ত আছে। সেগুলো রেখে “হতেম যদি” কিংবা “দরজা খুইলা দেখমু যারে করমু তারে বিয়া” ধরণের বিষয়ের উপর বিতর্ক নামক আবৃত্তি দিয়ে কাউকে জাজ করা বা মুগ্ধ হওয়ার কোনো কারণ আমি সত্যিকার অর্থেই দেখি না। প্রমিত বাংলা উচ্চারণ মেধা বোঝার কোনো মেট্রিক না। টিএসসিতে ছয় মাসের কোর্স করলে আপনি প্রমিত বাংলায় ফট ফট করে কথা বলতে পারবেন।

সময় বদলায়, সমাজ বদলায়, প্রেক্ষিত বদলায়। ডন ব্র্যাডম্যানের সাথে শচীন টেন্ডুলকার বা শচীন টেন্ডুলকারের সাথে বিরাট কোহলীর তুলনা টানা যেমন সম্ভব না, তেমনি নাইনটিজের সাথে টুয়েন্টি নাইনটিনকে মেলানোও সম্ভব না। এই তুলনাটা আপেলের সাথে কমলা তুলনা করার মত।

সময় পাল্টেছে, প্রেক্ষাপট পাল্টেছে। এই বাস্তবতায় কোনটা ভালো ছিলো, কোনটা খারাপ ছিলো, কোনটায় মেধার প্রকাশ পেতো, কোনটায় পেতো না সেটা বলার মত কোনো অবজেক্টিভ মেট্রিক নাই। এইখানে অনেক ভ্যারিয়েবল বিদ্যমান। সবগুলো ভ্যারিয়েবলকে অ্যাকনলেজ করে এক লাইনের উপসংহার টানা অসম্ভব। মোটা দাগের উপসংহারও টানা অসম্ভব। আপনি চাইলে অতীতকে অ্যাডভান্টেজ দিতে পারেন, গ্ল্যামারাইজ করতে পারেন, রোমান্টিসাইজ করতে পারেন। আমি বিষয়টাকে এত সিমপ্লি দেখি না।

Asm Fakhrul Islam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-07-29 12:45:20