জামাল খাশুগজি পর্ব ২ঃ সৌদি আরবের ভুমিকা আর অবস্থান – সাবিনা আহমেদ

জামাল খাশুগজি পর্ব ২ঃ সৌদি আরবের ভুমিকা আর অবস্থান

এখন পর্যন্ত সৌদি আরব জামাল খাশুগজির হত্যার ব্যাপার অস্বীকার করে যাচ্ছে। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোন বক্তব্য না দিলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছে এসব গল্প মিডিয়ার তৈরি আর সৌদি ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে কুচক্রীদের চাল। সৌদি নিউজ মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া জামাল খাশুগজিকে জঙ্গি, সন্ত্রাসী, মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য, বিন লাদেনের প্রতি সহমর্মিতা ধারণকারী বলে প্রচার চালাচ্ছে। এমনকি তার বাগদত্তা খাদিজাকে নিয়েও রিতি মতন নোংরামি করছে। বলছে খাদিজা আদতে একজন পুরুষ, সৌদির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। মোটামুটি এসব সংবাদের একটাই উদ্দেশ্য। যদি শেষ পর্যন্ত তুরস্ক প্রমান করে ছাড়ে যে জামাল খাশুগজিকে আসলেই সৌদি সরকার হত্যা করেছে তাহলে সৌদি জনগন আর সৌদি সাপর্টারেরা যেন এই হত্যাকে জঙ্গি হত্যা বা ইখওয়ান হত্যা হিসাবে জায়েজ করে নেয় অথবা একে যেন সৌদিদের বিরুদ্ধে কারো গভীর ষড়যন্ত্র হিসাবেই বিশ্বাস করে।

প্রশ্ন করতে পারেন মুহাম্মদ বিন সালমান ( এমবিএস ) কেন বিদেশের মাটিতে এমন এক ঝুঁকিপূর্ণ খুনের (এলেজড) অপারেশানের সিদ্ধান্ত নিলো? তাও নিজেরদের লোক পাঠিয়ে, কেন অজ্ঞাত হিট্ম্যান পাঠায়নি? এর জবাব খুজতে গিয়ে নজর দিতে হবে বিন সালমানের পূর্বের আরেক হঠকারী সিদ্ধান্তের উপর। সেটা ছিল লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরিকে সৌদিতে দাওয়াত দিয়ে এনে গৃহবন্দী করা আর জোরপূর্বক তাকে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করানো। অবশেষে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রনের হস্তক্ষেপে সেই ঘটনার অবশান ঘটেছিল।

এই একই ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত হচ্ছে জামাল খাশুগজিকে তুরস্কতে হত্যা ( এলেজড) করা। যেহেতু জামাল খাশুগজিকে প্রলুব্ধ করে সৌদিতে বা সৌদির মিত্র কোন দেশে নেয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে, জ্বি সেই চেষ্টাও করা হয়েছিল; আবার জামাল যেখানে বাস করেন অর্থাৎ আমেরিকা অথবা ইয়োরোপের কোথাও এই ধরনের কোন অপারেশান করা মানে নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা তাই সৌদিদের হয়ত মনে হয়েছে সেকেন্ড বেস্ট অপশান হচ্ছে যেখানেই জামালকে পাওয়া যাবে সেখানেই কিছু করা। এসবই এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য থিওরি মাত্র।

এই থিওরির সপক্ষে আরেকটা ঘটনা আছে। গতকাল সৌদি প্রিন্স খালিদ বিন সাউদ, যে এখন জার্মানিতে বাস করে, সৌদি সরকারের সমালোচক, ইন্ডিপেন্ডেন্টকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছে তাকেও প্রচুর প্রলোভন দেখিয়ে সৌদিতে ফেরত নেয়ার চেষ্টা করছে সৌদি রাজ সরকার, তার অর্থকষ্ট যাচ্ছে বলে বিশাল চেকের প্রলভন দেখিয়ে ৩০ বারের মতন অনুরোধ করেছে মিসরে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে যেতে। সে নিজ নিরাপত্তার ভয়ে যেতে অস্বীকার করেছে। এই খবর যদি সত্যি হয় তাহলে এখানে আমরা সৌদিদের চিন্তাধারার আর প্লটের একটা প্যাটার্ন দেখতে পাচ্ছি।

এও হতে পারে হয়ত জামালকে হত্যা করা তাদের মুল উদ্দেশ্য ছিলো না, তাদের উদ্দেশ্য ছিল জামালকে জোর করে সৌদিতে তুলে নিয়ে গিয়ে তার মুখ বন্ধ করা । সেজন্যই একজন দুইজন নয় বরং ১৫ জনকে তুরস্কে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কোন কারনে তা ভেস্তে গেলে তারা জামালকে হত্যা করতে বাধ্য হয়। এসবের সঠিক উত্তর আমরা হয়ত কোনদিন জানতে পারব না; আনলেস কোন দিন ভিতরের কেউ যদি মুখ খুলে।

সৌদি আরবের ভিতরে এখন অনেক টারময়েল চলছে, তাদের নিজেদের প্রিন্সরাই সমালোচনা অথবা বিরোধিতা করলে গুম কিংবা গৃহবন্দি অথবা কারাগারে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে । হতে পারে নিজ মাটিতে যা খুশি করে পার পেতে পেতে তারা এখন দেশের বাইরেও যা খুশি করার সাহস পেয়ে গেছে। আর যতদিন ট্রাম্প ক্ষমতায় আছে ততদিন তারা যা খুশি করার গ্রিন সিগনাল পেয়ে গেছে বলে অনেকের ধারনা। এক সাক্ষকাতকারে এমবিএস বলেছে সৌদি আরব আমেরিকাকে এখন নিজ পকেটে রাখে। এসব মিলিয়ে হয়ত এমবিএস ড্যাম কেয়ার পর্যায়ে চলে গেছে। অবশ্য সে যে ড্যাম কেয়ারেই চলে তার প্রমান ইয়েমেনের যুদ্ধ, রাজ পরিবার এতদিন যেই কন্সেন্সাস নিতিতে চলত তা থেকে ড্রাস্টিকভাবে সরে গিয়ে একক রাজত্বের পথে চলে যাওয়া, বিভিন্ন সৌদি প্রিন্সদের গৃহবন্দি বা কারাগারে নিক্ষেপ করার মাঝেই দেখতে পাই।

এবার প্রশ্ন করতে পারেন প্রচুর সৌদি বংশদ্ভুত লোক আছে যারা বিশ্বের চারিদিকে ছড়িয়ে আছে, যারা সৌদি রাজসরকারের আর রাজপরিবারের সমালোচনা করে, কই তাদের তো দেশের বাইরে সৌদি কর্তৃপক্ষ হত্যা করে নি, তাহলে জামালকে কেন?

জামাল খাশুগজি যেমন তেমন সৌদি সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি একজন অত্যন্ত উচু লেভেলের আর ওয়াশিংটন আর লন্ডনে অত্যন্ত অয়েল কানেক্টেড একজন সাংবাদিক ছিলেন, যার টূইটার ফলয়ারের সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। ওনার একেক লেখা, টুইট লাখ মানুষ পড়ত আর প্রভাব ফেলত।

জামাল খাশুগজি এক সময় আরেক সৌদি প্রিন্স তুর্কি আল ফায়সাল, ফর্মার ইন্টালিজেন্স চিফ, এর অধিনেও উচু পোস্টে চাকুরি করতেন, আর সেই সুবাদে সৌদি রাজপরিবারের ভিতরের অনেক গোপন খবর জানতেন; বলা হয় জামাল খাশুগজি সত্যিকারের রিফর্মিস্ট ছিলেন যিনি মোহাম্মদ বিন সালমানের রিফর্মের নামে করা এন্টাই রিফর্ম কাজ কারবারের প্রচুর সমালোচনা করতেন। ফলে ২০১৭ সালে প্রানের ভয়ে দেশ ছেড়ে আমেরিকায় চলে আসতে বাধ্য হন। অবশ্য সৌদি আরব ততদিনে তার লেখালেখির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। কিন্তু আমেরিকায় এসে তিনি সৌদি সরকার তথা এমবিএস এর সমালোচনা করে বিশ্ববাসীর সামনে, এমনকি সৌদিদের কাছেও তার ভাবমূর্তি নষ্ট করে চলেছিলেন।

তাই হয়ত আর চান্স না নিয়ে জামালের মুখ বন্ধ করার প্রয়াসেই জামালকে সরিয়ে ফেলার এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু মনে রাখতে হবে সৌদি সরকার কোন দিন এই হত্যাকাণ্ডের দায় কাঁধে নিবে না। যদি হত্যাকান্ড প্রমাণিতও হয় তখনও তারা কোন কনভেনিয়েন্ট স্টোরি বানিয়ে দায়মুক্ত থাকবে। বা ড্যাম কেয়ার নিতিতেই অটল থাকবে। তারা একবার বলেছে জামাল কনস্যুলেটে কাজ শেষে বের হয়ে গেছিল, এরপর বের হয়ে যাওয়ার ভিডিও দেখাতে বললে, বলেছে সেদিন ভিডিও সিস্টেম কাজ করে নাই। এরপর বলেছে জামাল খাশুগজির অন্তর্ধানের পিছনে কাতারিদের হাত আছে, মুসলিম ব্রাদারহুডের হাত আছে, যারা সৌদি আরবের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চায়। কিন্তু কথার কোন প্রমান এখন পর্যন্ত দেখাতে পারে নাই। অবশ্য ভবিষ্যতে কি দেখাবে বলা মুশকিল।

প্রথমে তুর্কিদের সাথে সহযোগিতা করতে না চাইলেও, তুরস্ক তাদের কাছে জামাল খাশুগজির হত্যাকাণ্ডের অডিও ভিডিও প্রমান আছে বললে এবং সম্ভবত আমেরিকান এডমিনিস্ট্রেশানের চাপে তুরস্কের সাথে এই ঘটনার তদন্ত করতে রাজি হয়েছে।

হতে পারে আমেরিকার সহযোগিতা পেতেই এই সময়ে তুরস্কে গৃহবন্দি করে ধরে রাখা আমেরিকান ধর্মযাজক এন্ড্রু ব্র্যান্সনকে তুরস্ক মুক্তি দিয়েছে। তুরস্ক যেভাবে সৌদি কন্স্যুলেটের ভিতরের হত্যা প্রমানে উঠে পড়ে লেগেছে সেখানে ঘটনা মিথ্যা হওয়ার চান্স খুবই নগন্য।

মুলত সৌদি সরকার আর তুর্কি সরকার উভয়ে ঘটনার বলয়ের দুই দিকে অবস্থান করছে আর এক গ্যাঁড়াকলে আটকে গেছে। যেখানে সৌদিরা সিমপ্লি সব এভিডেন্স বানোয়াট বলে এখন পর্যন্ত এড়িয়ে দিচ্ছে আর তুর্কিরা অনেক প্রমান সবার সামনে তুলে ধরছে। এখন কোন দেশ কিভাবে সেসব প্রমান বক্তব্য গ্রহন করবে তা নির্ভর করছে তাদের নিজেদের সেলফ ইন্টারেস্টের উপর। আর তুরস্কের জোরালো ভুমিকার উপর।

But no matter what, the relationship between Saudi Arabia and Turkey will sour further more.

Sabina Ahmed | উৎস | তারিখ ও সময়: 2018-10-13 19:28:53