নুসরাতকে ভুলে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা- – কল্লোল মোস্তফা

নুসরাতকে ভুলে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা-

খুন ধর্ষণ নিপীড়ন যারা করে, তারা কোন না কোন ভাবে ক্ষমতার সাথে সম্পর্কযুক্ত, ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা ধন্য। এরকম ক্ষমতাধরের বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তোলা কোন সহজ কথা না, এর জন্য যে নিশংক চিত্ত লাগে, যে সাহস ও শক্তি সঞ্চয় করতে হয়, তা সবার থাকে না। মাদ্রাসার ছাত্রী হয়ে খোদ মাদ্রাসার অধ্যক্ষের নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ানোর স্পর্ধা নুসরাতের ছিল। কিন্তু এ ধরণের ক্ষেত্রে ভিক্টিমের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন থাকার কথা, সেটা আমাদের নেই। বিশেষ করে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি ক্ষমতার সাথে কোন না কোন ভাবে যুক্ত থাকে তাহলে অভিযুক্তের বদলে অভিযোগকারী উল্টো বিপদে পড়ে, তাদের জীবন বিপন্ন হয় । নুসরাতের ক্ষেত্রে আমরা দেখলাম, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার পর থানার ওসি বলেছে অভিযোগ নাকি সাজানো। মামলা তুলে নেয়ার জন্য হুমকী দেয়া হয়েছে। সব শেষে পরীক্ষার হল থেকে ডেকে নিয়ে হাত পা বেধে আগুনে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হলো। কি ভীষণ আফসোসের ব্যাপার! যে সমাজ ও রাষ্ট্র এরকম সাহসী ও প্রতিবাদী মানুষদের রক্ষা করতে পারে না, তার পতন কে ঠেকাবে!

ফেনীর সোনাগাজী ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজউদদৌলার বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন ও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। গত ৩ অক্টোবর ২০১৮তেও তার বিরুদ্ধে আলিম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ করেন মেয়েটির বাবা কিন্তু এর কোন শাস্তি হয়নি। তাছাড়া ফেনীর উম্মুল কুরা ডেভলাপার্স নামের এক সমবায় প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে ১ কোটি ৩৯ লাখ ও মাদ্রাসা তহবিলের ৪৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। মাদ্রাসার দোকানপাট ভাড়া সহ বিভিন্ন খাত থেকে যে অর্থ অর্জিত হয় তা দিয়ে তিনি ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতা কেনেন। তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাকসুদুর রহমান। (সূত্র: 'চক্রে'র শক্তিতে বলীয়ান অধ্যক্ষ, প্রথম আলো, ১১ এপ্রিল ২০১৯) ২৮ মার্চ অধ্যক্ষ সিরাজদ্দৌলার মুক্তির দাবীতে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের যে মিছিল করতে বাধ্য করা হয়েছিলো, তার পেছনেও ছিলেন আওয়ামীলীগ নেতা মাকসুদুল আলম। এর সাথে যুক্ত ছিল অধ্যক্ষের দুর্নীতির সুবিধাভোগী তার সাবেক ও বর্তমান ছাত্র এবং মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটি। (সূত্র: অধ্যক্ষের মুক্তি চেয়ে সেই মিছিলের নেপথ্যে ছিল কারা!, বাংলা ট্রিবিউন, এপ্রিল ১০ , ২০১৯)

নুসরাতের সাথে যে যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে তা সারা দেশ জুড়েই তো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন স্থানে ঘটছে। এরকম কয়টা নিপীড়নের প্রতিকার হয়? আগুনে পোড়ানোর মতো নৃশংস ঘটনা না ঘটলে, নুসরাতের ঘটনাটাও মনোযোগের কেন্দ্রে আসতো না। এখন অভিযুক্ত অধ্যক্ষ ও তার সহযোগী- পৃষ্ঠপোষকদের বিচারের দাবী উঠবে, যদিও বিচার ও শাস্তি হবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা এই দেশে নাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এভাবে কি আমরা নুসরাতদের রক্ষা করতে পারবো? হয়তো এর চেয়ে নৃশংস কোন ঘটনায় গণমাধ্যমের মনোযোগ অন্যদিকে ধাবিত হবে, জামিনে বেরিয়ে আসবে অভিযুক্তরা, বড়জোর এক দুইজনের সাজা হতে পারে কিন্তু ক্ষমতার এই চক্র, যে চক্র একের পর এক নিপীড়ন চালিয়েও রক্ষা পেতে থাকে, তা তো আর এর মধ্যে দিয়ে উচ্ছেদ হবে না।

দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত ছোট বড় অসংখ্য 'ক্ষমতার চক্রে' বন্দী দেশের মানুষ। এই চক্র যতদিন অক্ষুন্ন থাকবে ততদিন এরকম অসংখ্য ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

Kallol Mustafa | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-04-11 12:38:19