ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আস্তে আস্তে জানা যাচ্ছে। শে – ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

ভারত-বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আস্তে আস্তে জানা যাচ্ছে। শেখ হাসিনা উপর্যুপরি ভারত সফর করছেন। আর বাংলাদেশ-ভারত সামরিক সহযোগিতা বাস্তবায়নের নামে এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে বাংলাদেশের ওপর ভারতের নিয়ন্ত্রণ।

জানা গেছে, নরেন্দ্র মোদি বিগত ঢাকা সফরে যে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার কথা বলেছিলেন, তার আওতায় প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশকে ৫০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে ভারত। ঋণের এই অর্থ ব্যবহারে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে দুই দেশ। এই অর্থের ৬৫ শতাংশ দিয়ে ভারত থেকে সামরিক সরঞ্জাম কিনতে হবে। বাকি টাকা দিয়ে অন্য দেশ থেকে আমদানি করা যাবে, তবে সেখানে ভারতের অনুমতি লাগবে। অথচ এটা কার না জানা যে, ভারতের সামরিক সরঞ্জামের মান খুবই নীচু, তাই তাদের বৈশ্বিক কোনো বাজার গড়ে উঠছে না। এখন তারা ঋণ গছিয়ে, শর্ত চাপিয়ে নিজেদের অস্ত্র বিক্রির পথ বের করেছে। তাছাড়া এ ধরনের ঋণের বড় একটি অংশ ব্যয় হবে সামরিক পরামর্শক তথা ভারতীয় মিলিটারি স্টাফদের পেছনেই।

চুক্তির আরেকটি দিক হলো, বাংলাদেশের শিপইয়ার্ডগুলোতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি। এর ফলে জাহাজ নির্মাণে বাংলাদেশের এত দিনের অর্জিত সক্ষমতা এখন ভারতের স্বার্থোদ্ধারে ব্যবহৃত হবে। যার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাবে না পাবে তা নিয়ে রয়েছে বিরাট শঙ্কা। এর আগে ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বাংলাদেশ তার ন্যায্য হিস্যা প্রায় বিনামূল্যেই ছেড়ে দিয়েছে। অথচ প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় এই শিল্পের মারফতে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার বিরাট সুযোগ ছিল। এখন ভারতের অংশগ্রহণের কারণে এই সুযোগ সীমিত হয়ে আসবে।

চুক্তির অপর ধাপটি হলো, দুই দেশের সামরিক স্কুলের শিক্ষার্থী বিনিময়। যেহেতু বাংলাদেশ-ভারত সমমর্যাদার দুটি দেশ নয়, ভারত প্রতিনিয়ত সীমান্তে এবং এ দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে অন্যায় হস্তক্ষেপ চালায়, তাতে করে এই প্রক্রিয়া নতুন দালাল সৃষ্টি ছাড়া আর কিছুই দেবে না। এই চুক্তির প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী ভারতের সঙ্গে এক দীর্ঘ সম্পর্কে জড়িয়ে যাবে, এর মধ্য দিয়ে সামরিক বাহিনীতে ভারতের প্রভাব বেড়ে যাবে এবং তা মুছে ফেলাটা হবে বিরাট কষ্টসাধ্য।

এটা স্পষ্ট যে, এই চুক্তি করা হয়েছে ভারতের প্রয়োজনে, তাদের স্বার্থই এখানে রক্ষিত হয়েছে। দেশবাসীকে অন্ধকারে রেখে শাসকদল গোপনে এই চুক্তি সম্পন্ন করেছে। ভারতের শাসকশ্রেণীকে ভেট দিয়ে, দেশের সামরিক ও জ্বালানি নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে ছেড়ে দিয়ে ক্ষমতায় চিরস্থায়ীভাবে টিকে থাকার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বর্তমান শাসকদল।

সর্বোপরি, বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থের দিক থেকে বলতে গেলে, এই ঋণ বা চুক্তির কোনো প্রয়োজনই ছিল না। সরকার ও তার সামরিক ব্যবসায়ীদের বাইরে এই চুক্তি দ্বারা বাংলাদেশের জনগণের লাভবান হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগও নেই। শাসকশ্রেণী যেভাবে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এটা জনগণের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বর্তমানে সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এমন কোনো চ্যালেঞ্জের মুখেও নেই যে, এই খাতে ৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে হবে। যা একটু চাপ আছে, মিয়ানমারের দিক থেকে, সেটার সমাধানও ভারতের সঙ্গে জোট বাঁধা হতে পারে না। কারণ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত এখনও মিয়ানমারের খুনী সরকারের পক্ষেই আছে।

বিপুল এই ঋণের ফলে বাংলাদেশ এখন ভারতের আরও অধীনস্ত হয়ে পড়বে, এটা নয়া-দাসত্বের সূচনা মাত্র। সামরিক-রাজনৈতিক অধীনস্ততা ছাড়াও জনগণকে গুণতে হবে বিপুল অঙ্কের সুদ, বইতে হবে বিশাল ঋণের এই বোঝা। এর বিরুদ্ধে কথা বলা, ভূমিকা রাখা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের কর্তব্য। ভারতের জনগণেরও উচিত, এই চুক্তির বিরোধিতা করা। কারণ এর মাধ্যমে সেখানকার শাসকশ্রেণী তাদের ন্যায্য সংগ্রামকে প্রতিরোধ করার আরও বেশি সক্ষমতা অর্জন করবে। দুই দেশের নিপীড়িত জনগণের মধ্যে ঐক্য দরকার, যৌথভাবে রুখে দাঁড়ানো দরকার গণবিরোধী এসব পদক্ষেপ।

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ | উৎস | তারিখ ও সময়: 2018-05-13 16:38:07