"… তিন বছরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে গেছে। হাজার হাজার – কায়কাউস

“… তিন বছরেই বাংলাদেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে গেছে। হাজার হাজার লোক অনাহারে মরছে। দুর্নীতি আর প্রশাসনিক অব্যবস্থার সংমিশ্রণে দেশের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। দেশে ব্যাপকহারে রাজনৈতিক হত্যা ও সংঘর্ষ চলছে।

বাংলাদেশ – পাকিস্তানের প্রাক্তন পূর্বাংশ – যখন স্বাধীন হয় তখন শুভানুভূতি ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের উচ্ছাস বয়ে গিয়েছিল। আগামী গ্রীষ্মকাল নাগাদ বাংলাদেশ ৩ বিলিয়ন ডলার সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পেয়ে যেত, কিন্তু সাহায্যকারী দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান পরিতাপ এই যে, বাংলাদেশ একটি প্রশাসনিক কাঠামো পর্যন্ত গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দুর্নীতির পঙ্কিলে ডুবে আছে। অধিকন্তু, জনসংখ্যা বৃদ্ধির মোকাবেলায় একটি সংঘবদ্ধ কৃষি-নীতির রূপ দেওয়ার এখনো বাকী আছে।

এ দেশের জনগণ, রিলিফকর্মীরা এবং কূটনীতিবিদগণ দুনিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশটির সমস্যাবলীর ব্যাপকতায় পর্যায়ক্রমে হতাশ ও শংকিত বোধ করছেন। জাতিসংঘের একজন অফিসার মন্তব্য করলেন, “ভারত এবং দক্ষিণ এশিয়ায় ১৯৮০ সালের পর যা ঘটতে পারে, বাংলাদেশে এই মুহুর্তে তা ঘটছে।”

জনৈক বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ বললেন, “আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি। ভবিষ্যতে যে কি হবে, জানি না। নিজের পরিবারের ভরণ পোষণ আমার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে; অবস্থার অবনতি ছাড়া আমি আর কোন পরিবর্তন দেখছি না।”

একজন উর্ধ্বতন সরকারী কর্মচারী বললেন, “অবস্থা শুধু নৈরাশ্যব্যঞ্জকই নয়, মর্মান্তিকও বটে। নৈরাশ্যজনক এই জন্য যে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রবাহ দেশের প্রতিকূলে বয়ে চলেছে। মর্মান্তিক এই জন্য যে, দেশের লোক অনাহারে মরছে। বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখুন।”

অনাহারে হাজার হাজার লোক মারা গেছে। গত এক বছরে মোটা চাউলের দাম ২৪০ পার্সেন্ট বেড়েছে। প্রধান বিদেশী মুদ্রা অর্জনকারী পাটকলগুলোর উৎপাদন চার বছর আগের তুলনায় শতকরা ৪০ ভাগ কমে গেছে। হাজার হাজার চাষী হাঁড়ি-পাতিল, চাষের বলদ, এমন কি জমি-জমা বিক্রি করেও চাউল কিনে খেয়েছে। আজ তারা নি:স্ব হয়ে গ্রামের মাটি আঁকড়ে পড়ে আছে। ঢাকার রাস্তা দু:স্থা মেয়েলোকে ছেয়ে আছে এবং পয়সা ভিক্ষে করছে। কোলের নগ্ন শিশুগুলো এত জীর্ণ-শীর্ণ যে, দেখে ভয় লাগে। ক্ষুধার্ত মানুষ চারপাশে নীরবে বসে আছে। একটি মহিলা মৃত শিশু বুকে করে আমেরিকান এ্যাম্বেসী ভবনের বাইরে বিলাপ করছে।

দুর্নীতির প্রত্যক্ষ প্রমাণের কাহিনীতে ঢাকা ভরপুর। জনৈক প্রাক্তন সরকারী কর্মচারী বললেন যে, “দাতব্য ৭টি বেবীফুড টিনের মাত্র একটি এবং ১৩টি কম্বলের মধ্যে একটি মাত্র গরীবদের কাছে পৌঁছায়।” বাংলাদেশে রেড ক্রসের প্রধান ও ঢাকা নগর আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান গাজী গোলাম মোস্তফা, শেখ মুজিবের পরিবার এবং শিল্প, যোগাযোগ ও বাণিজ্য দপ্তরের পদস্থ আমলাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শোনা যায়।

জনৈক কেবিনেট মন্ত্রীর কথা বলতে গিয়ে একজন বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদ বললেন : “যুদ্ধের পর তাকে (ঐ মন্ত্রীকে) মাত্র দুই বক্স বিদেশী সিগারেট দিলেই কাজ হাসিল হয়ে যেত, এখন দিতে হয় অন্তত: এক লাখ টাকা (প্রায় ১২ হাজার ডলারের মত)।”

ব্যবসার পারমিট ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আওয়ামী লীগারদের ঘুষ দিতে হয়। সম্প্রতি জনৈক অবাঙালী শিল্পপতি ভারত থেকে ফিরে আসেন এবং শেখ মুজিবের কাছ থেকে তার পরিত্যক্ত ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানাটি পুনরায় চালু করার অনুমোদন লাভ করেন। শেখ মুজিবের ভাগিনা শেখ মণি – উল্লেযোগ্য যে, তিনি ঐ কারখানাটি দখল করে বসে আছেন – হুকুম জারি করলেন যে তাকে ৩০ হাজার ডলার দিতে হবে।

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের পশ্চিমবঙ্গে যে চাউল পাচার হয়ে গেছে, তার পরিমাণ ৩ থেকে ১০ লাখ টন।

শেখ মুজিবের সহকর্মীরা স্বীকার করেছেন যে, শাসক হিসেবে তার যোগ্যতা খুবই কম। খুব নগণ্য ব্যাপারাদি অনুমোদনের ফাইলে তার ডেস্ক সদা ভরে থাকে।

শেখ মুজিবকে ভাল করে জানেন এমন একজন বাংলাদেশী বললেন, “লোকজন তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করুক, তাকে দেশের সর্বময় কর্তা হিসাবে সম্মান করুক, এটা তিনি পছন্দ করেন। তার অনুগত্য নিজের পরিবার ও আওয়ামী লীগের প্রতি। তিনি বিশ্বাসই করেন না যে, তারা দুর্নীতিবাজও হতে পারে কিংবা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে॥”

– বার্নার্ড ওয়েনবার / নিউইয়র্ক টাইমস – ডিসেম্বর ১৩ , ১৯৭৪ ইং

তথ্যসূত্র : বাংলাদেশ : বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর / সম্পাদনা : মুনিরউদ্দীন আহমদ ॥ [নভেল পাবলিশিং হাউস – জানুয়ারি, ১৯৮৯ । পৃ: ৬০১-৬০২]

Kumar Parveen | উৎস | তারিখ ও সময়: 2015-09-29 23:09:34