ভগ্নীপতি বিভীষণ – কায়কাউস

ভগ্নীপতি বিভীষণ
==========
#০১
“… সিভিল সার্ভিসে দলাদলি তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠলো। শেখ মুজিবর রহমানের আমলেই এই দলাদলি তীব্র হয়ে উঠেছিল তার ভগ্নীপতি প্রাক্তন ইপিসিএস অফিসারের জন্য। শেখ মুজিবুরের কারণে অনেককে টপকে তিনি হয়েছিলেন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব। সরকারের সব অফিসারের নিযুক্তি তার প্রভাবেই হত এবং স্বাভাবিকভাবেই তিনি প্রাক্তন সিএসপি-দের দাবি অগ্রাহ্য করে প্রাক্তন ইপিসিএস-দের স্বার্থ দেখতেন। তার অনায্য পদোন্নতি, প্রভাব-প্রতিপত্তি আমলাদের একাংশ বিশেষ করে সিএসপি-দের ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

… কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারেননি শেখ মুজিব। কিছুদিনের মধ্যেই দেখা দিয়েছিল আওয়ামী শাসনের অভিঘাত। পার্টির বিভিন্ন স্তরের কর্মী, নেতাদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ, রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন, দ্রব্যমূল্যের উর্ধগতি, দুর্ভিক্ষ সব মিলিয়ে জনজীবন হয়ে উঠেছিল দুর্বিষহ। শেখ মুজিবের মতো নেতারও সমালোচনা করা হচ্ছিল। নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিলেন তিনি সব-কিছুর ওপর, বোধহয় বিশ্বাসও। অধ্যক্ষ সাইদুর রহমান তার স্মৃতিকথায় উল্লেখ করেছেন, মুজিবকে তিনি যখন এসব কথা বলেছিলেন তখন মুজিব বলেছিলেন, 'আমাকে একশো ভালো লোক দিতে পারেন?' দলীয় লোকদের এ ধরণের আচরণ এবং এদের নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে তিনি আবার খানিকটা নির্ভর করছিলেন যাদের সঙ্গে পঞ্চাশ দশকের গোড়া থেকেই তার জানাশোনা ছিল। এটা ঠিক তারা তখন সিনিয়র হিসেবে উচ্চপদ পেয়েছিলেন কিন্তু মুজিব যে তাদের ওপর নির্ভর করতেন তা বোঝা যায় তাদের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোতে।

কিন্তু এ সময় একই সঙ্গে আমলাতন্ত্রেও অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ঐ সময় মুজিব যাদের সচিব পদে উন্নীত করেছিলেন তাদের অনেকেই ছিলেন পুলিশ সার্ভিসের যা প্রাক্তন ইপিসিএস বিশেষকরে সিএসপিরা পছন্দ করেননি। শেখ মুজিব বাইরে থেকেও পছন্দসই ব্যক্তিদের এনে উচ্চপদে বসিয়েছিলেন যেটা আমলাতন্ত্রের কেউই পছন্দ করেনি। তার ভগ্নীপতি [প্রাক্তন ইপিসিএস] অনেককে ডিঙ্গিয়ে উন্নীত হয়েছিলেন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের আত্মীয় হিসাবে তার দাপট ছিল অসম্ভব। প্রাক্তন ইপিসিএস ছাড়া অন্য ক্যাডারের আমলারা এটা পছন্দ করেননি। একটি বড় অভিযোগ ছিল, 'যিনি কয়েকদিন আগেও আমার সেকশন অফিসার ছিলেন [ অর্থাৎ ইপিসিএস ক্যাডারের ], তার অধীনে আমি কাজ করি কিভাবে?' আমলাতন্ত্রের এক বড় অংশকে শেখ মুজিব এভাবে নিজের শত্রু করে তুলেছিলেন॥”

– প্রশাসনের অন্দরমহল : বাংলাদেশ / মুনতাসীর মামুন ও জয়ন্তকুমার রায় ॥ [ দিব্য প্রকাশ – জুন, ১৯৯৪ । পৃ: ৫০ । ৬১-৬২ ]

#০২
“… বঙ্গবন্ধুর আপন ভগ্নীপতি সৈয়দ আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক হানাদার বাহিনীর অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটিতে মহকুমা হাকিমের দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি কর্মচারী হিসেবে তার পদমর্যাদা ছিল সেকশন হাকিমের সমমর্যাদাপূর্ণ। এ সৈয়দ আহমদ সাহেব মুক্তিযুদ্ধের পর আইনের দৃষ্টিতে এক নম্বর কোলাবোরেটর ছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হয়ে এ পাক বাহিনীর সহায়তাকারী তার ভগ্নীপতি সৈয়দ আহমদকে এক ধাক্কায় সংস্থাপন বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ যুগ্ম-সচিব পদে উন্নীত করেন। এর অল্পদিন পরেই এ সৈয়দ আহমদকে সংস্থাপন বিভাগের অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত করেন।

মন্ত্রণালয়ের সংস্থাপন বিভাগ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হওয়ায় এটি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ছিল। এই বিভাগ থেকে সরকারের অন্যান্য সকল মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি, অবনতি ও বদলিসহ চাকুরিতে নিয়োগপত্র প্রভৃতি কাজ করা হয়ে থাকে। সৈয়দ আহমদকে অতিরিক্ত সচিব করে এ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। কারণ, সৈয়দ আহমদ প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়তার সুযোগ নিয়ে ও প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নিয়ে সর্বময় ক্ষমতা চর্চা করতেন। এর ফলে সকল মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা সরকারের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।

এ সৈয়দ আহমদ সাহেব একজন করিৎকর্মা ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৫৬ সালে বঙ্গবন্ধু যখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী ছিলেন তখন সৈয়দ আহমদ সাহেব সাব-ডেপুটি ছিলেন। সাব-ডেপুটিরা ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের নিচের অফিসার ছিলেন। সে সময় সরকারী কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে সাব-ডেপুটি নিযুক্ত হওয়ার বিধান ছিল না। ব্রিটিশ আমলে বিভাগীয় পরীক্ষা দিয়ে সাব-ডেপুটি পদে উন্নীত করা হতো। অথচ পাবলিক সার্ভিস কমিশনে বিসিএস পাস করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হতেন। ব্রিটিশ যুগের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটরাই এসডিও / মহকুমা হাকিমের উপরস্থ কোন পদে অধিষ্ঠিত হতে পারতেন না। এ সৈয়্দ আহমদ সাহেব ব্রিটিশ যুগে সাব-ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হবার পর ১৯৫৬ সালে তিনি তার শ্যালক মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় পূর্ববঙ্গ আইন সভায় অ্যামালগেমেটেড ম্যাজিস্ট্রেট নামকরণে একটি বিল পাস করে বাংলার সকল সাব-ডেপুটিদের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের সমমর্যাদায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। এ হচ্ছে সৈয়দ আহমদের চাকরি জীবনের পরিচয়॥”

– শেখ আবদুল আজিজ (আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং মুজিব সরকারের তথ্য, কৃষি ও যোগাযোগ মন্ত্রী) / রাজনীতির সেকাল ও একাল ॥ [ দি স্কাই পাবলিশার্স – ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ । পৃ: ৩০৫-৩০৬ ]

Kumar Parveen | উৎস | তারিখ ও সময়: 2015-09-12 23:47:54