আমার আর আমার নবাবের মধ্যে একটা অলিখিত সমান অংশীদারিত্ব (Equal Partners – সাবিনা আহমেদ

আমার আর আমার নবাবের মধ্যে একটা অলিখিত সমান অংশীদারিত্ব (Equal Partnership) আছে। নিজেদের অজান্তেই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ আর ভালবাসা থেকে কখন যে আমরা এই সিস্টেম সেট করে ফেলেছি আজ আর মনে নেই। নবাব বাড়ী ভাড়া দেন তো আমি ছেলেদের বেতন। আমি রান্না করি তো নবাব রান্না শেষে রান্না ঘর পরিষ্কার করে দেন। নবাব যেখানে ভেঙে পড়েন আমি সেখানে শক্ত করে হাল ধরি, নবাব মনে করেন আমি সব পারি। আর আমি যেখানে আশা ছেড়ে দেই, নবাব সেটা সুন্দর করে সামলে নেন, মনে হয় যেন একজন ম্যাজিশিয়ান।

যেহেতু দুজনই ফুলটাইম চাকুরি করি তাই এই নির্ভরতার প্রয়োজন অসীম। ছেলেরা যখন ছোট ছিল তখন আমি আর নবাব দুজনে ট্যাগ টীম করে সব কিছু সামলে নিয়েছি। ছেলেদের বুঝতেই দেই নি যে মা-বাবা দুজনই অসম্ভব ব্যাস্ত। আমার দুই ছেলেকেই প্রায় উইকেন্ডে ম্যাথ/সায়েন্স/স্কলারস কম্পিটিশানে শহরের বাইরে নিয়ে যেতে হোতো। সেই ক্ষেত্রে আমি ছিলাম তাদের কোচ, আর নবাব ছিলেন আমাদের ড্রাইভার। পুরা পরিবার এক সাথে যেয়ে কম্পিটিশান এটেন্ড করে ট্রফি নিয়ে আসতাম। ভারি সুন্দর ছিল সেই দিন গুলো। রেসাল্ট ঘোষণার সময় নবাব আর আমি একসাথে ছেলেদের পিছনে দুজনের হাত ধরে বসে দোয়া দরুদ পড়তাম, আর ছেলেদের নাম বিজেতা হিসাবে ঘোষণা হলে আমাদের খুশির সীমা থাকত না।

এক ব্যপারে আমাদের দুজনের দারুন মিল, সেটা হলো আমরা দুজনই কাজ পাগল আর অসম্ভভ গোছালো প্রকৃতির। যদিও বাসায় নবাবের অফিস রুম কে নবাব “No entry zone for Sabina Ahmed” ঘোষণা করেছিলেন, কারণ আমি ওই রুমে ঢুকলেই খালি গোছাই। সেটাতেও একটা ছেলেখেলা থাকে। আর এ ভাবেই জীবনের বেশ কিছু দিন কেটে গেলো।

আজকাল ছেলে মেয়েদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি এই শ্রদ্ধাবোধের বড়ই অভাব দেখি। বেশিরভাগই যেন জোর করে ইকুয়ালিটি আদায় করতে চায়, আর ইন প্রসেস তাদের ভালোবাসা হারিয়ে যায়। তারা যেন স্বীকার করতে চায় না যে ত্যাগ-সম্মান-ভালোবাসা দ্বিপাক্ষিক। একজন তাকিয়ে থাকে আগে অন্য জন করুক তারপর আমি করব। আবার এও দেখা যায় একজন করছে তো করেই যাচ্ছে, আর অন্য জন ভাবছে এটাই তো তার করা উচিৎ, এটাই নিয়ম। অথবা এও ভাবছে আমার মাকে অথবা বাবাকে তো করতে দেখেছি তাহলে ও কেন করবে না?

কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে, চাহিদা পাল্টেছে। মানুষের ব্যাস্ততা বেড়েছে। আর তার সাথে তাল মিলিয়ে যারা জীবনের সবকিছু নিজেদের মাঝে পরম শ্রদ্ধাভরে, ভালোবাসা মিশিয়ে ভাগ করে নিতে পারে তারাই জয়ী। জীবনটা বিশাল এক পরীক্ষা ক্ষেত্র। এই পরীক্ষায় সেই উত্তীর্ণ যারা সবকিছু একসাথে মোকাবেলা করে। তা না হলে জীবনটাকে অনেক লম্বা আর ভয়াবহ মনে হয়।

আপনারা আবার ভাববেন না আমার সারাটা জীবন কন্টকহীন গেছে, তাই সহজে এমন জীবন গড়েছি। সেই সব গল্প আর একদিনের জন্য তুলে রাখলাম। শুধু এটুকু বলে শেষ করলাম, “ দেবে আর নেবে, মেলাবে আর মিলবে, এই তো জীবন।“

Sabina Ahmed | উৎস | তারিখ ও সময়: 2018-09-15 22:25:29