বাঙ্গালির ফ্রি স্পিচ – আসিফ সিবগাত ভূঞা

বাঙ্গালির ফ্রি স্পিচ
————————

আমাদের দেশের মানুষের মনের মধ্যে যে জিনিসটা খুব গোড়ায় গিয়ে মিশে আছে সেটা হোলো 'ফ্যাশান'। এই অর্থে আমরা প্রায় সব বাঙালি/বাংলাদেশী একেকজন 'মডেল'। কেবল দেহসৌষ্ঠব আর পোশাকের না। এটার একটা চালু কথ্য বাংলা হোলো পাট নেয়া। আমরা জাতিগতভাবে পাট নিতে ওস্তাদ। যেমনটা বললাম এটা কেবল বাহ্যিক পোশাকি লেভেলে সীমাবদ্ধ না, আইডিয়া বা কনসেপ্টের ক্ষেত্রেও ট্রু।

ধরেন বর্তমান সময়ের একটা আধুনিক কনসেপ্ট হোলো বাক স্বাধীনতা। এই বাক স্বাধীনতা বা ফ্রি স্পিচের কনসেপ্টটা আসলে কী, এটা কেন দরকার, এবং এটার মোডাস অপারেন্ডিটা কেমন হওয়া উচিৎ – এটা নিয়ে বাঙ্গালির কোনও ভাবনা নাই, প্রশ্নও নাই। সে এটাকে বোঝে খুবই চটজলদি কনভিনিয়েন্ট সেন্সে এবং মোটা দাগে। তার কোনও কথার ঘোর সমালোচনা হলে সে খুব স্টাইল করে কিছু ক্লিশে ইউজ করবে – আমি আমার মত দেয়ার স্বাধীনতা রাখি, লেটস অ্যাগ্রি টু ডিসঅ্যাগ্রি। এসব কথার সঠিক ইমপ্লিকেশন অবশ্যই আছে, কিন্তু বাঙ্গালি এগুলো ইউজ করে একটা ফ্যাশান হিসেবে। তার মাঝে টু স্টেপ অ্যাহেড চিন্তা নাই যে ওয়াই বা হাও।

একারণে দেখবেন বাঙ্গালির কাছে মুড়ি মিস্রির একই দর। কাইক্যা মাছ খাইতে ভালো লাগে কিনা আর অমুককে ভুল বিচারে ফাঁসি দেয়া ঠিক হইছে কিনা – এই ব্যাপারে বাঙালি সেইম ক্যালিবারের ফ্রি স্পিচ অ্যাপ্লাই করে। বিচার পদ্ধতি, কাঠামো এসব কিছু ছাপায় গিয়ে বাঙালির যে গাট ফিলিং তা দিয়েই সে একটা ডিসিশনে চলে আসবে যে অমুককে ফাঁসি দেয়া উচিৎ কিনা। এক্ষেত্রে তার সকল পারসেপশন, যা সে জেনে আসছে – সে ঐতিহাসিক ধারণাকে প্রশ্ন করা দূরে ঠাক, সে বিচারের স্ট্যান্ডার্ডের মৌলিক আলোচনাও করতে রাজি না। সামহাও যার ফাঁসি হইতেছে তাকে তার অপছন্দ, তার বিরুদ্ধে যে ক্রাইমের অভিযোগ তার কোনও ভেরিফিকেশন দরকার নাই, ছোটবেলায় যে শিশুসাহিত্য পড়ে সে বড় হইছে তা দিয়েই সে ফাঁসি চাইতে চলে আসছে। আর কারও ফাঁসি চাইতে পারাটা তার কাছে ফ্রি স্পিচ। যেমন কাইক্যা মাছ ভালো লাগে এটা বলতে পারাও তার ফ্রি স্পিচ।

ফ্রি স্পিচ অধিকারের প্রশ্নে একটা অধিকার। কিন্তু এটার দায়িত্বের প্রশ্ন আলাদা। কারণ রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের যে চুক্তি যা দিয়ে সবার কল্যাণ নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে সেই প্রশ্নে ফ্রি স্পিচ একটা দায়িত্বও। যেমন পরীক্ষার খাতায় ভুল উত্তর দিতে পারাটা আপনার অধিকার, সেই সময়ও আপনাকে দেয়া হয়, পরীক্ষার আগেই বলা হয় না যে ভুল উত্তর লিখতে পারবা না। কারণ উত্তর ভুল না সঠিক সেটা তো উত্তরটা লেখার পর এবং সেটাকে পড়ার পরই প্রমাণিত হবে। এ কারণেই ভুল উত্তর দেয়ার অধিকার আপনার আছে। কিন্তু শিক্ষকের সাথে ছাত্রের চুক্তিতে এটাও আন্ডারস্টুড যে ভুল উত্তর না লেখাটা আপনার দায়িত্ব, সেই দায়িত্বে আপনি ভুল করলে আপনি পিনালাইজড হবেন। আপনার মার্ক্স কাটলে আপনি শিক্ষককে গিয়ে বলবেন না যে আই অ্যাম এনটাইট্‌ল্ড টু মাই ওপিনিয়ন বা লেটস অ্যাগ্রি টু ডিসঅ্যাগ্রি। কারণ আপনার ভুলটা অধিকারের জায়গায় হয় নাই, দায়িত্বের জায়গায় হয়েছে।

ফ্রি স্পিচের কন্সেপ্টের একজন মূল প্রবক্তা জন স্টুয়ার্ট মিল ফ্রি স্পিচের গুরুত্বের জায়গাটা যে এখানেই সেটা আমাদের বুঝিয়েছিলেন। 'অন লিবার্টি' নামের প্যামফ্লেটে আমরা দেখতে পাই যে তিনি আমাদের শেখাচ্ছেন যে কেন কনভেনশনাল ট্রুথের এগেইন্সটে কোনও মত দাঁড়িয়ে গেলে সেটাকে সহ্য করতে হবে। কেননা হতে পারে কনভেনশাল মতই ভুল আর এই নব্য চিন্তা সঠিক। সেক্ষেত্রে কনভেনশনাল মতকে বাদ দিতে হবে। অথবা কনভেনশনাল মত সঠিক আর নব্য চিন্তাটা ভুল। সেক্ষেত্রেও মিলের কথা হোলো কনভেনশনাল মতটা যে সঠিক সেটা তো বোঝাই যাবে এর বিপরীত মতের সাথে তুলনা করার মাধ্যমে। সেজন্যও বিপরীত মত দেয়ার অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। আবার এমন হতে পারে – এবং মিলের মতে এটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয় – কনভেনশনাল মত আর নব্য মত কোনটাই অবিমিশ্র ভুল বা ঠিক নয় – বরং দুটোতেই কিছু পরিমাণ সত্য আর ভুল আছে। ফলে এক্ষেত্রেও নব্য মতকে জায়গা দেয়া উচিৎ যাতে করে আমরা সেই বিশ্লেষণে যেতে পারি কে কতটা ঠিক।

২০১৩ সালে বাঙালি শাহবাগে আন্দোলন করে এক লোকের ফাঁসি আদায় করে নিলো আর এ নিয়ে সে কত আন্দোলন করলো – সবই সে মনে করেছে তার ফ্রি স্পিচ আর মুক্ত চিন্তার ফল। যদিও সে জানতো ভালো করেই যে পুরো বিচার প্রক্রিয়াটাই ছিলো প্রহসনের। তো ফ্রি স্পিচের ফ্যাশান করা এই বাঙালি যে শাহবাগে এত মনের জোর দেখালো সে কি একবারও এই প্রসেস দিয়ে গেছে? যে তার কনভেনশনাল ট্রুথ যা দিয়ে সে কিছু লোককে ঘৃণা করে সেটা কতটা সত্য। কী ছিলো তার এই আত্মজিজ্ঞাসার প্রসেস? শুধুমাত্র এই প্রশ্নটা কি সে নিজেকে করেছে যে যদি একটা লোকের এত স্পষ্ট অপরাধ থাকেই তাহলে সেটাকে প্রমাণ করতে কেন একটা ভুয়া বিচার পদ্ধতি তৈরি করতে হোলো।

আর এখন? এখন কই বাঙালির মুক্ত চিন্তা আর ফ্রি স্পিচের দেমাগ। তার সামান্য ভোট দেয়ার অধিকার নাই, ক্ষমতা নাই – যা কিনা যে কোনও উন্নত বিশ্বে একটা ন্যূনতম অধিকার। এখন বাঙালি চুপ কেন? যাবে না বাঙালি তার ভোটের অধিকার ছিনিয়ে নিতে শাহবাগে? লোক জড়ো করবে না? কোনটা বেশি জরুরি বাঙ্গালির জন্য – ভুয়া বিচার পদ্ধতিতে যাবজ্জীবন কারাদন্ড পাওয়া এক লোককে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য রাস্তায় নামা? নাকি জনগণের কাছ থেকে লুট করে নেয়া রাজনৈতিক অধিকারকে আয়ত্তে আনা?

আজ হাসি পায় যখন কতিপয় চেতনাবাজ স্বীকার করে যে ইলেকশনটা পাতানো হয়েছে। এজন্য আবার তাকে বাহ্বা দেয়া লাগে। নপুংশক বাঙ্গালির জন্য নাকি এটা অনেক বড় অ্যাচিভমেন্ট। ভ্যালা রে নন্দ, বেঁচে থাক চিরকাল!

Asif Shibgat Bhuiyan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2019-01-04 11:24:54