বই পড়া নিয়ে সামান্য এক দুইটা জ্ঞানের কথা বলে ঘুমাইতে যাব :P – জাহিদ রাজন

বই পড়া নিয়ে সামান্য এক দুইটা জ্ঞানের কথা বলে ঘুমাইতে যাব

বাঙ্গালি পাঠকের পড়ার উপর আস্থা রাখা কঠিন। কয়েকটা কারণে-

একটা হোল বেশীরভাগ মানুষের রিডিং লিস্ট বা বুকস টু রিড লিস্টটা খুবই পুওর। সমরেশ মজুমদার, সুনীল, লাল মিয়া, সাদা মিয়া-দের অলমোস্ট আকাইম্যা গল্পের বই ছাড়া বেশীরভাগ পাঠকের পড়ার অবস্থা করুণ। আমি নিজেও অনেকাংশে এই দলের অন্তর্ভুক্ত, তবে সমস্যার সমাধানে প্রথম স্টেপ হিসেবে এটা উপলব্ধি করা জরুরী মনে করি।

বিনোদনের জন্য পড়ার পাশাপাশি,জ্ঞান মূলক বই পড়া অর্থাৎ সিরিয়াস স্টাডি করা খুবই দরকারি। এমনকি আনন্দের জন্য গল্পের বই পড়তে হলেও এখানেও চয়েজ একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এছাড়া, বর্তমান সময়ে কোন একটা সিরিয়াস টপিকের উপর এত এত বই লেখা হয়েছে, বা বাজারে এত এত গল্পের বই আছে যে বলে বা পড়ে শেষ করা যাবে না। এর মধ্যে আপনি যদি ঢাকা শহরের বাসিন্দা হন তাহলে আপনার জীবনের প্রায় বিশ ভাগ সময় জ্যামে কাটবে। দশ ভাগ কাটবে দাওয়াত দিয়ে এবং খেয়ে। চাকরি করা, বাজার করা আরও হাবিজাবি কাজ করার পরে সময় ম্যানেজ করা দুরুহ কাজ। অতএব, আপনার জীবনে বই পড়ার সময় এবং সুযোগ খুব কম, তাই বই সিলেকশন বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

দুই, পুওর ক্রিটিক্যাল রিডিং স্কিল। একটা বইয়ের কাছ থেকে কি আশা করা যায় (যেটা লেখক প্রিফেইস এ লিখে থাকেন। ধরেন একজন পাঠক একটা লেখকের বই পড়ে বললেন, এই বইতে এটা নাই, সেটা নাই কেন, হয়ত দেখা গেল, লেখক শুরুতেই লিখেছেন এই বইয়ের স্কোপ এটা কাভার করে না), লেখক এর সমর্থনে কি কি যুক্তি পেশ করেছেন, কোন কোন জিনিস তিনি প্রমাণ করতে পেরেছেন, কোনগুলো পারেন নি, কেন পারেননি, কি ভুল করেছেন এ ধরনের এনালাইসিস গুরুত্বপূর্ণ।

তিন, আমাদের বই পড়া অনেকটা মনোলগ পর্যায়ের। আমরা লেখকের লেখা পড়ি কিন্ত লেখকের সাথে কনভারসেশনে লিপ্ত হই না। লেখক বলেন, আমরা পড়ি। ফলো করতে না পারলে বাদ দেই, কিছুদুর পড়ে রেখে দেই। ভাল পাঠকেরা কিছু পড়লে এর ব্যবচ্ছেদ করেন। পড়তে পড়তে সমালোচনা করা তাদের পড়ার খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেমনটা কোন জার্নালের রিভিওয়াররা করে থাকেন। সমালোচনা বলতে কেবল ক্রিটিক্যাল হওয়া নয়া- বরং ভাল দিক এবং খারাপ দিকের পাশাপাশি কোন একটা বিষয়ে মতামত নেই, বা এই বই পড়ে এই বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় না এ ধরনের মতামতও জরুরী।

আরেকটা ব্যাপার হোল- আমরা বেশীরভাগই আরামদায়ক বই পড়ি। যেটা পড়লে সময় কাটবে, আরাম করে আনন্দে পড়া যাবে এ ধরনের বই আমাদের হাতের কাছে, বালিশের কাছে থাকে। নিজের চেয়ে উচু লেভেলের বই না পড়লে ক্রিটিক্যাল রিডিং (থিঙ্কিং) স্কিল ডেভ্লাপ করে না। যেই পর্যায়ে আছি সেই পর্যায়ে থেকে যাওয়ার লোভটা কঠিন, কিন্তু এটা ফেটাল। আপনার অনেক বন্ধুকে দেখলে আপনি মাঝেমাঝেই অবাক হয়ে ভাববেন- হাইস্কুলের পরে তার মানসিক বিকাশ বন্ধ হয়ে গেছে ! অনে হবে যেন ঠিক আগের জায়গাতেই রয়ে গেছে সে। এই অবস্থা পরিবর্তনে কিছুটা কঠিন বই পড়ার অভ্যাস করা, চিন্তা করা, ক্রিটিক করা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

একটা বইয়ের সকল অংশ সমান গুরুত্বপূর্ণ না। কিছু অংশ কম এবং কিছু অংশ বেশী গুরুত্বপূর্ণ। বেশী গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিছুটা আস্তে পড়া এবং কম গুরুত্বপূর্ণ অংশ কিছুটা দ্রুত পড়ার অভ্যাস করা দরকারি। বেশী গুরুত্বপূর্ণ অংশের পুনঃপাঠ এবং উল্লেখিত রেফারেন্স বা টপিকের উপর একাধিক লেখকের বই পড়া ক্রসচেক করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের পাঠ্যসূচিতে ভাল পাঠক তৈরির ইনসেন্টিভ খুব কম। এমনকি হারডলি আমরা একটা বই (বিশেষ করে কোর্স ওয়ার্ক এর ক্ষেত্রে) শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব কিছু পড়ি। যখন একটা বইকে আমরা রেফারেন্স বই হিসেবে কোর্সওয়ার্ক এ পড়ি, আমরা ধরেই নেই উক্ত লেখক এই বিশেষ বিষয়ে পারদর্শী। আমাদের উচিত অন্তত একজন লেখক এই বিষয়ের উপর যে বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন, সেগুলো জানতে চেষ্টা করা। আমরা কেবল পরীক্ষা পাশের জন্য কিছু চ্যাপ্টার পড়ি এবং এর মধ্য দিয়েই এই বইয়ের সাথে সম্পর্কের ইতি ঘটে।

আমাদের পড়া প্রায়শই লক্ষ্যহীন। আমরা একটা বিষয়ে পড়ার জন্য কারও সাজেশন নিয়ে কিনি না, ইন্টারনেট ঘেঁটে, রিভিও পড়ে, সময় ব্যয় করে বই কিনি না, পড়ার পড় ইভালুয়েট করি না। আমাদের কাছে বই, সংবাদপত্র এবং ফেসবুক স্ট্যাটাস সমান পর্যায়ের জিনিস। বরং শেষোক্ত দুই জিনিসের আকর্ষণ অনেক বেশী।

আমাদের বই সিলেকশন ভাল না। একটা বিষয় জানতে হলে সে বিষয়ে কোন কোন বই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এ বিষয়ে অন্যের কাছ থেকে কোন প্রকার ফিডব্যাক বা পরামর্শ নেই না। এছাড়া কোন বিষয়ে মোটামুটি পর্যায়ের জ্ঞান অর্জনের জন্য যে ধরনের সময় ব্যয় করা দরকার এটা করতেও আমরা আগ্রহী নই।

জ্যাক অব অল ট্রাডস এন্ড মাস্টার অব নান হওয়াটা আমাদের পাঠাভ্যাসের চূড়ান্ত রুপ। এই ইনেফিশিয়েন্ট পদ্ধতি পরিবর্তন করা দরকার।

বিশেষ কোন বিষয়ে আমরা কোন পর্যায়ের দক্ষ হতে চাই, হলে আমি কি করতে সক্ষম হব, অর্থাৎ 'হাউ ডাজ সাকসেস লুক লাইক' এটা মাথায় নিয়ে এরপর শুরু করা যেতে পারে। 'হাউ টু রিড এ বুক' এই বইটা এ বিষয়ে একটা ভাল শুরু হতে পারে ।

Jahid Razan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2016-07-20 05:14:53