তোমার পতাকা যাহাকে দিয়েছ, হে প্রভূ! – ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ

তোমার পতাকা যাহাকে দিয়েছ, হে প্রভূ!
তাহা বহিবার শক্তি ও প্রজ্ঞাও তাহাঁকে দাও!

৬ দফা ও ৭ মার্চ মুজিবের এস্টাব্লিশ্মেন্ট বিরোধী স্ট্রাটেজিক রাজনৈতিক দুরদর্শিতার এক অনন্য দলিল। এটা ইহাও নির্দেশ করে স্বাধীনতা পূর্ব মুজিব অনন্য বুদ্ধিমত্তা সহিত পরিচালিত একদল জ্ঞানী ও প্রাজ্ঞ নাগরিক নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক আবহে অবস্থান করেছেন।

আফসুস যে ক্ষমতা প্রাপ্ত মুজিব এই মৌলিক আবহকে হয় অস্বীকার করেছেন নচেৎ ক্ষমতা দম্ভের অহংকারে নিজেই দূরে ঠেলেছেন।ফলে রাজনৈতিক ব্যবস্থাপক হিসেবে অনভিজ্ঞ মুজিব আর পার্ফর্ম করে উঠতে পারেননি, যুদ্ধ বিধ্বস্ত ক্ষুধা ও দারিদ্রের দেশে যা কিছু সমস্যা অপরাধ অপব্যবস্থাপনা দুর্নীতি ও চুরি কারণে তৈরি হয়েছে তার সবকিছুকে তিনি ইন্সটিটিউশন হীন আমিত্ব ও দলীয় দমন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে চূড়ান্ত ব্যর্থ হয়েছেন।

৭ মার্চের ভাষাণের যে ইন্টেলেকচুয়াল ভিত্তি তাতে, মওলানা ভাসানী সহ সকল প্রাজ্ঞ নাগরিকের বিস্তর অবদান আছে। এই অবদান যাতে আমরা ভুলে না যাই। বাংলার পথ প্রান্তরে মুক্তি সংগ্রামের জন্য জনমত গঠন শেষে মওলানা পল্টেনে এসে বলেছিলেন “এবার সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম”। ৭ মার্চে তাকে পুর্ণতা দিয়েছে “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম”।

৭ মার্চের মূল আবেদন স্বধীনতার জন্য চাতক পাখির মত তাকিয়ে থাকা বহুধা বিভক্ত রাজনৈতিক সমাজ ও আপামর নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ করা। যার ফলে জিয়ার ২৬ ও ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ডাক এবং ২৫ মার্চের রাতের মুজিব মতান্তরে তাজউদ্দীনের বেতার বার্তায় স্বাধীনতার ডাক গুলো মানুষের আস্থায়, বিশ্বাসে ও বোধগম্যতায় এসেছে, আপামর নাগরিক বিবেক তাড়িত হয়েছে এবং অস্ত্র ধরেছে স্বদেশকে হানাদার মুক্তির তরে।

অর্থাৎ বাংলার মানুষের ঐক্যের সর্বোচ্চ স্তরকে ভিত্তি দিয়েছে ৭ মার্চ।

সাবেক সময়ে এবং বর্তমানেও কিছু বুদ্ধিজীবী ৭ মার্চের স্ট্রাটেজিক রাজনৈতিক ভাষাণ কে স্বাধীনতার মূল ঘোষণা বলে আসলে জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণাকে ডিনাই করতে চেয়েছেন। এটা তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অপকৌশল হলেও আসলে এটা তাদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞাহীনতার প্রকটতা।

অন্যদিকে তাদেরই আরেকদল সম্প্রতিক সময়ে কাতালোনিয়ার একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণা ব্যর্থ হওয়ায় মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন কেন কৌশলী মুজিব ৭ মার্চে রাজনৈতিক সমাধানের পথা খোলা রাখতে একচেটিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। আদতে স্বাধীনতা প্রাক্কালে মুজিবের রাজনৈতিক স্ট্রাটেজি অনন্য ছিল। তবে এখানে একটি অন্যায় তুলনা চলে আসে, স্পেনিশ ধনিক অংশ ঐতিহাসিক উমাইয়া-আব্বাসীয় খিলাফতের সুফল ভোগ করে, ইউরোপীয় এবং নন ইউরোপীয় কলোনিয়াল পিরিয়ডের সকল প্রাচুর্য ভোগে করে এসে গরীব হবার উপলক্ষ তৈরি হলে, তার সম্পদের সহ-ভাগীদার ভাই ব্রেদার থেকে দূরে সরে এসে সাংস্কৃতিক সেপারেশনের যুক্তি দিয়ে স্বাধীনতা চাচ্ছে। এটা বাংলার স্বাধীনতা দাবির মৌলিক মূল্যবোধের আদর্শিক পরিপন্থী। আরেকটি বিষয় ইউ ফ্রেইম ওয়ার্ক। এই ফ্রেইম ওয়ার্ক করাই হয়েছে অবিভাজ্যতার ভিত্তি যেখানে ২৮ টি মেম্বারের শুধু একটি ভেটো দিলে স্বাধীনতা অক্ষম। যে কারণে জার্মানির ব্রাভারিয়া, বেলজিয়ামের ওলোনিয়া বা ফ্লামিশ কিংবা ইটালীর অংশবিশেষ স্বাধীন হতে পারবে না। ফলে স্বাধীনতা ঘোষণার একচেটিয়া চেষ্টা ব্যর্থ। যার বিপরীত আলোচনায় মুজিব সফল। আসলে স্বাধীনতা পাবেনা শত ভাগ জেনেও কাতালোনিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে নিজেদের স্বাধীনতার দাবি টাকে গণতান্ত্রিক মোরালিটির দীর্ঘমেয়াদি একটি রাজনৈতিক রূপ দিতে চেয়েছে, কারণ গণতান্ত্রিক ইউরোপীয় সমাজ এই প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেয়। অন্যদিকে বাংলাদেশী স্বাধীনতা ঘোষণা ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বৈষম্যের উপর দাঁড়ানো একমূখী এবং বিকল্পহীন সংগ্রামী ডাক। সুতরাং কোন ভাবেই ৭ মার্চ ও ২৬ মার্চের সাথে এই তুলনা চলে না।

৭ মার্চ মুজিবকে অনন্য করেছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের স্থপতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিকে নাগরিক ঐক্যের মাধ্যমে সু-সংহত করেছে।

পুনশ্চ, এই বলে আপনি যে কোন লক্ষে, উপলক্ষে, জন্মে মিরত্যুতে, শোকে শান্তিতে অবিরত মাইক বাজিয়ে এই ভাষণকে মূল্যহীন করতে পারেননা।

বরং সাধারণের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি কেন ৪৬ বছর পরেও আসেনি তার আত্ম উপলভদ্ধির তৈরির শুরু করুণ, দেশে গড়ার কাজে মনোনিবেশ করুণ এবং রাষ্ট্রে ইন্সটিটিউশনাল কাঠামো তৈরির উপলভদ্ধি চিন্তার চর্চা করুণ। স্বাধীনতাকে উন্নত জীবনমান, উন্নত শিক্ষা, উন্নত স্বাস্থ্য, মানসম্পন্ন কর্মাসংস্থান, টেকসই কৃষি ও পরিবেশের মাধ্যমে কিভাবে অর্থবহ করা যাবে, দেরিতে হলেও সেই চর্চার শুরু করুণ।

তোমার পতাকা যাকে দিয়েছ, হে প্রভূ!
তা বহিবার শক্তি ও প্রজ্ঞাও তাঁকে দাও!

ফাইজ় তাইয়েব আহমেদ | উৎস | তারিখ ও সময়: 2018-03-07 21:00:56