বাঙালির শিষ্ঠাচার জ্ঞান – শাফকাত রাব্বী অনিক

বাঙালি দুনিয়ার যেইখানেই যাক না কেন, তার শিষ্ঠাচার জ্ঞ্যান মোটা দাগে নিম্নে বর্নিত রীতিনিতি মেনে চলেঃ

বাঙালি আপনাকেঃ

— সম্মান এবং শ্রদ্ধা নিবেদন করবে “বিনম্র ভাবে”। কিন্তু অসম্মান এবং অশ্রদ্ধা জানাবে শক্ত হাতে, উচ্চ স্বরে, কলপারে দাঁড়িয়ে।

— ভালোবাসতে কিংবা আদর সোহাগ করতে বলবে গোপনে। কিন্তু আপনাকে ঘৃণা করবে প্রকাশ্যে, জন সম্মুখে, মাইক বাজিয়ে।

— সন্তুষ্টি জানাবে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে — ” ছি ছি, এতো রান্না করার দরকার কি ছিল, আমরা তো খেয়েই এসেছি।” কিন্তু অসন্তষ্টি জানাবে ডাইরেক্ট ভাবে, একেবারে উইকেট – টু – উইকেট — “**ঙ্গের পোলা, এইটা কি বানাইছস, তোর **কি দিয়া আমি **** ভরুম” ।

— অনুরোধ করতে বলবে হাত কচলাতে কচলাতে, সেটা যতো মামুলি কিংবা ন্যায্য অনুরোধই হোক। কিন্তু আপনার অনুরোধ অগ্রাহ্য করবে বুক ফুলিয়ে, গলা চড়িয়ে, ” আমারে চিনস? তোর কথা না শুনলে তুই কি করবি? ”

বাঙালির চোখে আপনি ঃ

— যদি জ্ঞ্যানী ব্যাক্তি হন, তাহলে আপনাকে কথা বলতে হবে মিন মিন করে, মাটির দিকে তাকিয়ে, থাকতে হবে ময়লা, ছেড়া ত্যানা মার্কা কাপড় পড়ে — যাতে করে মুর্খরা গলা উঁচু করে আপনার সামনে আরাম করে, দম্ভের সাথে তাদের বক্তব্য রাখতে পারে।

— যদি ধার্মীক ব্যাক্তি হন, তাহলে আপনাকে সব সময় থাকতে হবে কাফনের কাপড় পরে, ভাঙ্গা দালানে, ফকিরের বেশে। যাতে করে পাপী-তাপীরা নিজেরা দুনিয়ায় আরাম আয়েশ ভোগ করার পাশাপাশি আপনার পরকালের পরীক্ষাটা দুনিয়াতেই নিতে পারে, এবং আপনাকে সেই পরীক্ষায় জিপিএ ফাইভ দিতে পারে।

— যদি যুক্তিবাদী হন, তাহলে আপনাকে সব সময় দুই সাইডেই কাটে, “এটাও হতে পারে , সেটাও হতে পারে” — মার্কা যুক্তি দিতে হবে। সুনির্দিষ্ট কোন যুক্তি বা উপসংহার আপনি দিতে পারবেন না, সেটা যতো ভালো যুক্তিই হোক।

— যদি বিচারক হন, তাহলে আপনাকে যে কোন সালিশিতে “তোমারও দোষ — ওরও দোষ” — এই টাইপের মিমাংসা দিতে হবে। এখানে কার অপরাধ বেশি আর কারটা কম সেটা আপনি বাঙালির সামনে ক্লিয়ার করে বলতে পারবেন না।

— যদি সৎ পথে টাকা কামাই করেন, তাহলেও আপনাকে চলতে হবে ছেড়া স্যান্ডেল পরে, সিএনজিতে — যাতে করে অসৎ পথে যারা টাকা কামাই করে তাদের সামাজিক মর্জাদা ও প্রতিপত্তি আপনার কারনে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়।

ইংরেজিতে একটা শব্দ আছে “ফ্ল্যামবয়েন্স” — এইটার যথার্থ কোন বাংলা শব্দ আমার জানা নাই। বাঙালি সমাজে জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্যাক্তি হতে যদি চান, তাহলে মরে গেলেও নিজেকে ফ্ল্যামবয়েন্ট হতে দেবেন না। বাঙালি ফ্ল্যামবয়েন্সকে মারাত্মক ঘৃনা করে।

বাঙালির মানস পটে আপনি যদি সম্মানিত-জ্ঞ্যানী ব্যাক্তি হয়ে বাঁচতে চান, তাহলে আপনাকে থাকতে হবে অপিনিওন বিহীন, মিন-মিনে স্বভাবের, মাথা নিচু, কাঁধ কুঁজো, ময়লা-ঢিলা কাপড়ে, জীর্ন ঘরে, মাটিতে ল্যাটা মেরে — জাস্ট অনেকটা সদ্য প্যান্ট পড়া ল্যাংটা সাধুর বেশে।

Shafquat Rabbee Anik | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-02-14 11:27:38