নামাজ পড়তে বাধ্য করার সীমা-পরিসীমা গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে – আমান আবদুহু

নামাজ পড়তে বাধ্য করার সীমা-পরিসীমা গ্রহণযোগ্যতা-অগ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে নানা কথাবাত্রা হচ্ছে। এইসব জ্ঞানগম্ভীর কথাবাত্রা থেকে আমরা জ্ঞান আহরণ করছি এবং সবসময়ের মতোই সমৃদ্ধ হয়েই চলছি। তবে জ্ঞানের দিক থেকে আমি যেহেতু দরিদ্র তাই ভাবলাম এই চান্সে অন্তত নিজ চোখে যা দেখেছি তার একটু বর্ণনা লিখে কিছু লাইক কামিয়ে নেই।

পৃথিবীতে সম্ভবত একটাই দেশ আছে যেখানে নামায পড়তে বাধ্য করা হয়। আল্লাহ রসুলের দেশ সৈদি আড়ব। আযানের পর দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, জামায়াত শেষ হওয়ার পর আবার খুলে। আযান শেষ হওয়া থেকে নামাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত এ সময়টাতে রাস্তাঘাটে একদল বিশেষ পুলিশ পেট্রল দেয়। রিলিজিয়াস পুলিশ। তাদের কোন ইউনিফর্ম নাই, অন্য সবার মতোই সাদা জুব্বা। কেউ কেউ উপরে ভেস্ট পড়ে। কিন্তু তাদের গাড়িগুলো মার্কামারা খাকি রঙের জিএমসি সাবার্বান এসইউভি। সবাই বুঝে যায় মামুরা আসছে।

সবাই তাদেরকে মুতাওয়া নামে ডাকে। মুতাওয়া মানে পরহেযগার বা ধর্মভীরু। তবে তাদের বাহিনীর আসল নাম হলো হাইয়াতুল আমর বিল মা'রুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার। অর্থ্যাৎ সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা বাহিনী। সউদিরাও অবশ্য এতো লম্বা নামে ডাকে না। হয় ডাকে মুতাওয়া, অথবা শুরতা দিনিয়্যাহ, অর্থ্যাৎ রিলিজিয়াস পুলিশ।

আপনি যদি আযানের পর দোকান খোলা রাখেন তাহলে তারা আপনাকে গ্রেফতার করবে। গ্রেফতার করে মসজিদে নিয়ে গিয়ে নামায পড়াবে, লম্বা লেকচার দিবে এবং মাঝে মাঝে খানাপিনাও দিবে। তারপর ছেড়ে দিবে। ততক্ষণে অনেক রাত হয়ে গেছে, আপনার সারাদিনের কাজকর্ম খালাস। বারবার যদি একই অপরাধে ধরা খান তাহলে তারা জরিমানাও দিতে পারে। মুতাওয়াদের কাজকর্ম অবশ্য যে শুধু নামাজ ফাঁকিবাজদেরকে ধরা তা নয়, বরং আপনি বোরকা ছাড়া রাস্তায় বেরুলে কিংবা বিড়ি খাইলে, যেসব কাজ ফৌজদারী অপরাধ নয় তবে ওয়াম্বালি মাযহাব (৭০% ওয়াহাবি + ৩০% হাম্বালি) অনুযায়ী ইমানদারী অপরাধ এইধরণের অপরাধে তারা আপনাকে মৃদু শাস্তি দিবে। কিন্তু অমুসলমানদেরকে তারা কিছু বলে না বা করে না। নন মুসলিম মানে তাদের জুরিসডিকশন না।

একসময় মুতাওয়ারা বেশ প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ছিলো। তখন এই প্রসঙ্গ নিয়ে পাশ্চাত্যের মানবতাবাদী আধুনিকতাবাদী উল্লুকরা খামাখা প্রচুর চিল্লাফাল্লাও করতো। সময়ের বিবর্তনে তাম্বু উড়িয়ে পথ চলা জামানার ইমাম মাহদী মিস্টার বোন স এর আধুনিকীকরণের ঠেলায় অবশ্য এখন মুতাওয়ারা না কি দুস্প্রাপ্য প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে বলেই শুনেছি।

যাইহোক আজকে আমরা মুতাওয়াদের দুই একটা মজার ঘটনা আলোচনা করবো। যেসব বাঙালি নামাজ পড়ে না, অথবা জামাতে পড়ে না তাদের অনেকেই দোকান বন্ধ করে পেছনের রুমে আড্ডা পেটায় এসময়। এদেরকেও মুতাওয়ারা ধরে ফেলে খুঁজেপেতে তদন্ত করে। আমার এক বন্ধু ডমিনোস পিজা ডেলিভারি দেয়ার কাজ করতো। একদিন রাত বারোটার সময় তার ফোন। তাকে উদ্ধার করতে হবে। এশার নামাযের সময় তারা স্টোর বন্ধ করে পেছনের রুমে তাস পিটাচ্ছিলো, দরজার ফাঁক দিয়ে আলো বের হতে দেখে মুতাওয়া হাজির। তাদেরকে নিয়ে গিয়ে অফিসে জামাতে নামাজ পড়াইছে, তারপর লেকচার শুনাইছে এক বাংলাদেশী হুজুর মারফত, তারপর একেকজনকে একেক জায়গায় রাস্তার মোড়ে নামায়ে দিছে। তাকে যেখানে নামাইছে ঐটা তার বাসা বা স্টোরের এলাকা থেকে প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার দূরে।

আরেকবার আমাদের ভার্সিটির লন্ড্রির এক ড্রাইভারের ঘাড় দেখি ব্যান্ডেজ করা। ভাই কি হইছে? উনারা এক নিরাপদ জায়গায় বসে টাইম পাস করতেছিলেন কিন্তু ভাগ্যের দুর্বিপাকে মুতাওয়া হাজির। সবাই পালিয়ে গেলো কিন্তু ড্রাইভার ভাই একটু মোটাসোটা ছিলেন, জানালার গ্রিল ফটকে বের হতে গিয়ে আটকে যান এবং কাঁচে ঘাড় কেঁটে যায়। মুতাওয়ারা তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়েছে।

মুতাওয়াদের মাঝে অনেক ভালো লোক আছে অনেক বদমাশও আছে। একবার পত্রিকায় দেখেছিলাম এক মুতাওয়া বোরকা ইসলামসম্মত না হওয়ার অপরাধে মেয়েদের গায়ে বড় ব্রাশ দিয়ে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে দিচ্ছিলো রাস্তার উপর। এটা নিয়ে তখন বেশ আলোচনা হয়েছিলো। তবে মুতাওয়াদের উপর কেউ কথা বলে না, প্রশাসন বা রাজপরিবার সবাই মুতাওয়াদেরকে পাবলিকলি কখনো সমালোচনা করে না সউদি আরবে। দরকার হলে গোপনে টাইট করে আর কি জামানার ইমাম মাহদির মতো। বাইরে সম্মান ঠিকই আছে।

আজকের আলোচনা শেষ করবো মুতাওয়াদের ইনসাফি নিয়ে। সউদি আরবে প্রচুর বিদেশী মানুষ থাকে। পুরো দেশটাই আসলে বিদেশী মানুষ দিয়ে ভর্তি। মুতাওয়াদের সমস্ত বাহাদুরি এবং ইসলাম কায়েমের শিকার মূলত বিদেশীরাই। স্থানীয় সউদি কারো উপর তারা ইসলাম কায়েম করতে অথবা কোন চোটপাট করতে পারেনা। একেবারেই মারাত্মক ক্রাইম যেমন মদ্যপান কিংবা পতিতাবৃত্তির মতো ঘটনা হলে তখন সউদিদেরকে পুলিশ ধরার সময় সাথে মুতাওয়া পুলিশরাও থাকে। অন্যথায় তাদের নাইনটি ফাইভ পার্সেন্ট কাজকার্বার বিদেশীদের নিয়ে। মসজিদে নামাজ হচ্ছে তখন রাস্তা দিয়ে কোন সউদি হেটে গেলে বড়জোর তারা চুমাচুমি করে বিনয়ের সাথে একটু রিকোয়েস্ট করবে তাবলীগ স্টাইলে আসেন ভাই নামাজ পড়ি বহুত ফায়দা হবে। কিন্তু বিদেশী হলেই ধরা।

যেমনভাবে কোনদিন দেখবেন না বড় কোন কর্পোরেশনের অফিসে গিয়ে কর্মকর্তাদেরকে বলতেছে এখন তোমাদেরকে নামাজ পড়তে হবে বাধ্যতামূলকভাবে না হলে বেতন কেটে নিবো। দুনিয়ার দেশে দেশে ও বিভিন্ন সমাজে এইরকম নিয়মকানুন কড়াকড়ি কিংবা মানবিক অসম্মান সবকিছু কেবলমাত্র গরীব মিসকীন শ্রমিক শ্রেণীর মানুষদের জন্যই বরাদ্দ থাকে। এটা মানুষের সমাজের নিয়ম, কিছু করার নাই স্বামী বিদেশ থুক্কু পকেট খালি।

Aman Abduhu | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-02-20 16:11:19