আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছেন, বিজ্ঞান করা বলতে আমি কী বুঝি? বিজ্ঞান করা এবং বিজ্ঞানমনষ্ক – দু – ফাহাম আব্দুস সালাম

আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছেন, বিজ্ঞান করা বলতে আমি কী বুঝি? বিজ্ঞান করা এবং বিজ্ঞানমনষ্ক – দুটোর মাঝে পার্থক্য কী? এখানে খুব ছোট্ট করে একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবো। তবে বিজ্ঞানমনষ্কতার আলোচনা এখানে না। বিজ্ঞান করা জিনিসটা কী – সে সম্বন্ধে স্পষ্ট একটা ধারণা থাকা দরকার।

আমি দুটো প্রেমিস দেই প্রথমে। সেখান থেকে একটা উপসংহারে আসবো।
এক: যেসব ঢাকাবাসী হোলি খেলেছে পরশুদিন, তারা পেশাব বৃষ্টির শিকার হয়েছেন।
দুই: ধানমণ্ডির জনৈক অনুপম ওয়ানাবি রায় সেদিন হোলি খেলে বেকুবের মতো ইন্ডাসট্রিয়াল কেমিকেল গায়ে মেখেছেন।

এই দুটো প্রেমিস থেকে আমি উপসংহারে আসবো – সেটি হোলো:
তিন: ধানমণ্ডির অনুপম ওয়ানাবি রায় পেশাব বৃষ্টির শিকার হয়েছেন।

প্রথমে যুক্তিবিদ্যার কথা। আমাদের আগ্রহ এখানে ডিডাক্টিভ রিজনিং।ডিডাক্টিভ রিজনিংহোলো ওপর থেকে নীচে নামা। মানে খুব বড় ও সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকে ছোটো ও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে আসা। সেক্ষেত্রে প্রথম প্রেমিসটি সাধারণ এবং দ্বিতীয় প্রেমিসটি নির্দিষ্ট। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রস্তাবকে যদি আমরা সঠিক ধরে নিই তাহলে যুক্তির বিচারে অনুপম ওয়ানাবি যে পেশাব বৃষ্টির শিকার হয়েছে সেটা সঠিক। কারণ যুক্তির পরম্পরা এখানে নির্ভুল।

কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় প্রস্তাব সত্যিই সঠিক কি না সেটা আমরা এখনো পরীক্ষা করি নি। সেটার জন্য আমরা ইন্ডাকটিভ রিজনিং এর দ্বারস্থ হই – যেটা হোলো ডিডাক্টিভ রিজনিং এর ঠিক উল্টা। এক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ থেকে সাধারণ ও বড় পর্যবেক্ষণের দিকে যাবো।

অনুপম ওয়ানাবি যে রং মেখেছেন গায়ে সেটা তার ফেসবুকে আমরা দেখেছি। এবং সেটা যে ইন্ডাসট্রিয়াল গ্রেড ডাই সেটা আমাদের জানানো হয়েছে। ইন্ডাসট্রিয়াল ডাই ত্বকে লাগানো নেহাৎ নির্বুদ্ধিতা। কাজেই দেখা যাচ্ছে যে এক্ষেত্রে প্রথম পর্যবেক্ষণ (বা মূল প্রেমিস-২) সঠিক।

কিন্তু দ্বিতীয় প্রেমিসের (বা মূল প্রেমিস-১) স্কোপ খুব বড়। প্রথম সমস্যা হোলো সংজ্ঞার সমস্যা। পেশাব বৃষ্টি বলতে কী বোঝানো হয়েছে আমাদের জানা নেই – এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সংখ্যক অংশগ্রহণকারীর একটি নির্দিষ্ট উচ্চতা থেকে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সংঘবদ্ধ অনাচারের মধ্যে দিয়ে পেশাব ছেটানোকে পেশাব বৃষ্টি বোঝানো হয়েছে কি না আমাদের বলা হয় নি। আমরা যদি এই সংজ্ঞাটিকে সঠিক হওয়ার জন্য সম্ভব সর্বোচ্চ ছাড় দিই তাহলে বলতে হবে যে যারা হোলি খেলেছেন তাদের 'প্রত্যেকে' যে রং মেখেছেন তার অন্তত একটি অংশে পেশাবের উপস্থিতি আছে।

রংকে দ্রবীভূত করতে ডায়লুয়েন্ট প্রয়োজন এবং সেক্ষেত্রে পেশাব একটি কার্যকর ডায়লুয়েন্ট সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রথম সমস্যা হোলো পেশাবের এভেইলিবিলিটি। এতো বিপুল পরিমাণে পেশাব সংগ্রহ করা কঠিন কাজ। যদিও আমরা দেখেছি হোলি খেলার জনৈক অংশগ্রহণকারী একটি বোতলে তার নিজস্ব পেশাব সফল ভাবে সংগ্রহ করেছেন কিন্তু তিনি প্রতিটি অংশগ্রহণকারীকে এই যৎসামান্য সংগ্রহের একটি সুনির্দিষ্ট অংশ সুষম বন্টন করেছেন তার কোনো প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। শুধু যে আমাদের হাতে প্রমাণ নেই তাই না – এই কাজটি সফল ভাবে করার পেছনে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হোলো ফিজিকাল ল। একটি বোতলে ৩০০ থেকে ৬০০ মিলি (একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের ব্লাডার এই পরিমান পেশাব জমা রাখতে পারে) তরল যে কোনোভাবেই এক হাজার মানুষের ওপর ছেটানো সম্ভব না তার জন্য হাই-স্কুল লেভেলের গতিবিদ্যাই যথেষ্ট।

কাজেই দেখা যাচ্ছে যে মূল প্রস্তাবনার দ্বিতীয় প্রেমিসটি সঠিক না এবং সঠিক হওয়ার জন্য যে বিস্তারিত প্রমাণ আমাদের কাছে থাকার প্রয়োজন সেটাও নেই। এরকম ভুল/অসম্পূর্ণ পর্যবেক্ষণ থেকে যে সিদ্ধান্ত সেটা ভুল হতে বাধ্য।

বিজ্ঞান কী? সহজ ভাষায় বিজ্ঞান হোলো এই যে আমরা যুক্তির ওপর-নীচ করলাম তার গার্ডিয়ান। এই কাজটি বিজ্ঞান করে বেশ কয়েকটি টুল দিয়ে। ভেরিফায়েবল ডেটা, এবং রিপিটেবল অবজারভেশন হোলো বিজ্ঞানের প্রধান অস্ত্র যা দিয়ে প্রতিটি হাইপোথিসিস ও অনুমান পরীক্ষা করা হবে। এবং এই অস্ত্রগুলোর কারণেই বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যার অধিক। শুধুমাত্র যুক্তি দিয়ে আপনি সব ধরনের প্রেমিসের সঠিকত্ব পরীক্ষা করতে পারবেন না। সেজন্য বিভিন্ন ধরনের টুলস লাগে যেটা আপনাকে বিজ্ঞান দেয়। যুক্তির কাজ উপসংহারে আসা এবং যুক্তির শক্তিমত্তা যাচাই করা। বিজ্ঞানের কাজ মোটেও উপসংহার নিয়ে না। এই যে রিজনিং, রিপিটেবল অবজারভেশন, ডেটা এনালিসিস – এই প্রক্রিয়াগুলো ঠিকভাবে হচ্ছে কি না সেটা শক্তভাবে পরীক্ষা করা হোলো বিজ্ঞান। বিজ্ঞান ধরে নেয় যে প্রতিটি স্তরে প্রতিটি পদ্ধতি সন্দেহাতীত ভাবে নিষ্পন্ন হলে উপসংহার যেটা আসবে সেটা সঠিক হতে বাধ্য। অর্থাৎ আপনি মঞ্জিলে মকসুদ ঠিক করে যাত্রায় নামছেন না, আপনার যাত্রা মঞ্জিলে মকসুদ ঠিক করছে। এই পার্থক্যটা মাথায় রাখা খুবই জরুরী।

যেসব ঢাকাবাসী হোলি খেলেছে পরশুদিন তারা পেশাব বৃষ্টির শিকার হয়েছেন – এ কথা শুনেই হেসে উড়িয়ে দেয়া বিজ্ঞানের কাজ না। কিংবা হোলি আসলে খেলা হয়েছে পরশুদিনের আগেরদিন কিন্তু প্রস্তাবনায় যেহেতু ভুলে বলা হয়েছে পরশুদিন; তাই এই প্রস্তাব ভুল – এ ধরনের সিদ্ধান্তে আসাও ঠিক বিজ্ঞানসম্মত না (যেহেতু এই ভুল মূল প্রতিপাদ্যকে মিথ্যা প্রমাণ করে না) । আপনাকে প্রতিটি স্টেপে একেবারে আবেগশূণ্য হয়ে সব সম্ভাবনাকে এন্টারটেইন করতে হবে।

এখানে কয়েকটি ব্যাপার মাথায় রাখা প্রয়োজন। খুবই প্রয়োজন।

বিজ্ঞান কি ইনফ্যালিবল?

মোটেও না। বিজ্ঞানে প্রচুর ভুল হয় এবং সেটা শুধরেও নেয়া হয়।

কিন্তু

সায়েন্টিফিক থট প্রসেস বা বৈজ্ঞানিক চিন্তা প্রক্রিয়া ইনফ্যালিবল। পরীক্ষাযোগ্য সত্যে উপনীত হওয়ার জন্য বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি, পদ্ধতি হিসেবে নির্ভুল কিন্তু বিজ্ঞান নিজে ভুল করে – ভুল উপসংহারে আসে।

কি গোলমেলে লাগছে? নাহ! আপনি বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি বজায় রাখতে যে কোনো সময়ে এমন কিছু কৌশল, এমন কিছু অনুমান ব্যবহার করবেন যেগুলো ঐ সময়ের প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ নিশ্চিত ভাবে পরীক্ষা করার উপায় থাকে না। এগুলো আপনাকে ধরে নিয়ে সামনে এগুতে হয় যা সম্পূর্ণ সঠিক নাও হতে পারে। কিন্তু তার মানে এই না যে চিন্তার পদ্ধতিতে ভুল ছিলো। এটা হোলো একটা সময়ের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা।

এবং সায়েন্টিফিক থট প্রসেস হোলো একমাত্র চিন্তা প্রক্রিয়া যেটা সেল্ফ কারেক্টিং। বিজ্ঞান ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা প্রক্রিয়ার নিজেকে শুধরে নেয়ার ইন বিল্ট কোনো মেকানিজম নেই। কিন্তু মনে রাখতে হবে যে চিন্তা প্রক্রিয়ার এই অভিনবত্বকে যদি আপনি শ্রেষ্ঠত্ব হিসেবে হাজির করেন, তাহলেও এর ডোমেইন স্পেসিফিসিটি বা ক্ষেত্র নির্দিষ্টতা আছে। এমন বহু বিষয় আছে যা পরীক্ষাযোগ্য সত্যের আওতায় পড়ে না (যেমন আমার কেন ক্লডিয়া কার্ডিনেলকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মহিলা মনে হয়)। এসব ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতির শ্রেষ্ঠত্ব আপনার কোনো কাজে আসবে না।

এবং

আরো একটি ব্যাপারে সতর্কতা আবশ্যক। বৈজ্ঞানিক চিন্তা পদ্ধতি যদিও না পদ্ধতি হিসেবে নির্ভুল কিন্তু একজন ব্যক্তির চিন্তা পদ্ধতির মাঝে অনেক খাদ আছে। মনে রাখতে হবে যে নেচার আমাদের মাথাকে দুই আর দুই যোগ করলে যে চার হয় সেই অংক করার জন্য ডিজাইন করে নি। আমাদের মাথার মূল কাজ হোলো বিভিন্ন তাড়নার প্রতি সাড়া দেয়া। লটারীতে জ্যাকপট জেতা এবং এয়ার ট্র্যাভেলে এক্সিডেন্টে পড়ার সম্ভাবনা দুটোই খুব কম – শতকরার বিচারে একের চেয়েও অনেক কম। কিন্তু প্লেন ক্র্যাশে আপনার মরার যে সম্ভাবনা তার চেয়ে অন্তত এক হাজার গুণ কম সম্ভাবনা হোলো লটারীতে জ্যাকপট জেতার সম্ভাবনা। প্লেনের টিকেট কেনার সময় আপনি অনায়াসে প্লেন ক্র্যাশের সম্ভাবনা খারিজ করে দেন যদিও লটারী জেতার সম্ভাবনা আপনি খারিজ করতে পারেন না। কারণ আপনার মাথা সবভাবতই আশাবাদী – সে সকল লাভজনক সম্ভাবনায় সাড়া দেয়ার জন্য টেইলর মেইড।

আমাদের ব্রেনে বিভিন্ন ধরনের বায়াস কাজ করে যেটা সম্পর্কে সজাগ থাকা খুবই প্রয়োজন। যেমন ধরুন কালকে ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশের খেলায় বাংলাদেশের জেতার সম্ভাবনা ১০% (একটা মন-গড়া সংখ্যার কথা বললাম)। আপনি কি আপনার মাথাকে বোঝাতে পারবেন যে আমি কালকে ১০% আশাবাদী থাকবো? না পারবেন না। আপনার মাথা কিন্তু ১০০% আশাবাদীই থাকবে। আমাদের মাথা স্ট্যাটিসটিক্স বোঝে না, তাকে ট্রেইন করতে হয় স্ট্যাটিসটিক্স বোঝানোর জন্য। এটাই আমাদের মাথার স্বভাব এবং এর মাঝেই আমাদের এভোলিউশানারী এডভান্টেজ আছে। কিন্তু তাই বলে সব ক্ষেত্রে এই এডভান্টেজ কাজে লাগাতে গেলে আপনি মহাবিপদে পড়বেন। সেজন্য আপনার মাথাকে ট্রেইন করতে হবে এবং যে কোনো বিষয়ে যাই পড়বেন, বিশেষ করে ফেইসবুকে যাই পড়বেন তা বিশ্বাস করে বসেন না। যতোটুকু পারা যায় নিরাসক্ত হয়ে ফ্যাক্টকে বিবেচনা করবেন। এর মাঝে এলেম আছে।

Faham Abdus Salam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2015-03-08 18:27:13