ক্রুসেডের প্রসঙ্গে মুসলমানদের কিছু ভুল ধারণা – ফাহাম আব্দুস সালাম

ISIS যে ইসলাম ধর্ম মানে এমন অপবাদ কেও দিতে পারবে না – এটা পুরনো খবর। অবাক হওয়ার বিষয় হোলো ISIS নিয়ে সৃষ্ট আলোচনায় বাংলাদেশ তো বটেই বাইরেও মুসলমানরা ক্রুসেডের তুলনা বারবার টানছেন। এই প্রসঙ্গে মুসলমানদের কিছু ভুল ধারণা আছে।

ক্রুসেড আক্ষরিক অর্থেই একটা য়োরোপিয়ান টার্ম, মুসলমানরা দুইশ বছর ব্যাপী জেরুসালেমের দখল নেয়ার যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ হিসেবে দেখা শুরু করেছে য়োরোপিয়ান ন্যারেটিভ নকল করতে গিয়ে। সে সময়ের সে অঞ্চলের মুসলমানরা ধর্মযুদ্ধ তো নয়ই এমন কি প্রথম দিকে “জিহাদ” হিসাবেও উল্লেখ করে নি।

কেন?

এই যে বিধর্মীদের সাথে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধ করাকে “জিহাদ” বলে, এই টার্মের রেলেভেনসই ছিলো না তখন। প্রথম ক্রুসেড শুরু হয় ১০৯৬ সালে। মুসলমানদের যে টেরিটোরিয়াল রীচ সেটা মোটামুটি সম্পন্ন হয় সপ্তম শতকে। এর পরে মুসলমানরা মূলত মারামারি করেছে নিজেদের মধ্যে – সেটাকে তো আর জিহাদ বলা যায় না। মাঝখানে কেটে গেছে প্রায় সাড়ে চারশ বছর। ততোদিনে মুসলমানের পৃথিবী বদলে গেছে। একাদশ শতকে মুসলমানরা জিহাদ বলতে নিজের বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম সেটাই কেবল মীন করতো।

মুসলমানরা এই যুদ্ধকে কেবল একটা আপদ হিসেবে দেখেছিলো। তারা ক্রুসেডকে আল-ইফ্রানজদের যুদ্ধ বলতো। প্রথম ক্রুসেডের য়োরোপিয়ানরা নিজেদের ফ্রাঙ্ক বলতো। আরবরা ফ্রাঙ্ককে আল-ইফ্রানজ হিসেবে উচ্চারণ করেছিলো।

য়োরোপিয়ানরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ মনে করলেও মুসলমানদের এই যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ মনে না করার বহু সঙ্গত কারণ ছিলো। প্রথমত মুসলমানরা এটাই জানতো না যে প্রাক্তন বিজেন্টিন এম্পায়ারের পশ্চিমে অর্থাৎ এখনকার বালগেরিয়ার মোটামুটি পশ্চিমে যারা থাকে তারা ক্রিশ্চান। মানে এখনকার ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স এসব অঞ্চল সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণাই ছিলো না। কারণ এসব অঞ্চল তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে আরবদের চেয়ে বহু পিছিয়ে ছিলো। আরবরা তাদের অসভ্য মনে করতো। প্রথম ক্রুসেডাররা সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে। এমন কি ক্রুসেডাররা নিজেরাই বলছে যে তারা মুসলমানদের হত্যা করে সুপ বানিয়ে খেয়েছে – এমন কি কুকুরও খেয়েছে। লেভানথের মুসলমান তো বটেই ক্রিশ্চানরাও রেহাই পায় নি এই তাণ্ডব থেকে। জেরুসালেমের সব ইহুদিকে সিনেগগের মধ্যে পুড়িয়ে মেরেছিলো তারা। রোমের চার্চ যারা মানে না – অর্থাৎ গ্রীক, আর্মেনিয়ান, কপটিক চার্চ মানা ক্রিশ্চানদের সব সম্পত্তি দখল করে দেশছাড়া করেছিলো ক্রুসেডাররা। আল-ইফ্রানজদের অসভ্য মনে করাটা পুরোপুরি অসঙ্গত ছিলো না।

তার উপর মুসলমানদের যে হার্টল্যান্ড – মক্কা, মদিনা, বাগদাদ এসব শহরের কাছাকাছিও ক্রুসেডাররা আসতে পারে নি। মানে ক্রুসেডাররা আরবদের ইন্টেলেকচুয়ালি চ্যালেঞ্জ করতে পারছে না, সম্রাজ্যের মূল অংশে ঢুকতে পারছে না – এমন শত্রুকে খারিজ করার জন্য অসভ্য ভাবাটাই সবচেয়ে সহজ – আরবরা তাই করেছিলো।

তাহলে দুইশ বছর ধরে জেরুসালেম তারা ধরে রাখলো কীভাবে? কারণ মুসলমানরা ঐতিহাসিকভাবে যে কাজে সবচেয়ে পারদর্শী সে কাজেই বেশী সময় দিচ্ছিলো – তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি করাকে অনেক বেশি জরুরি মনে করেছিলো। এমন কি বহু মুসলমান ক্রুসেডারদের হয়েও যুদ্ধ করেছে। মাঝখানে ব্যাপারটা একটু হিন্দি সিরিয়াল হয়ে গিয়েছিলো আর কি। ত্রিপোলির সুন্নি শাসক শিয়াদের টাইট দেয়ার জন্যে ক্রুসেডারদের দাওয়াত দিয়েছিলো। মাঝখান দিয়ে ত্রিপোলিকে ক্রুসেডাররা ছেড়াবেড়া করে দিলো, ঐ ব্যাটার রাজত্বও গেলো। এন্টিয়োকের ক্রিশ্চান রাজা ট্যানক্রেড যুদ্ধ করছে মোসুলের মুসলমান আমির জাওয়ালির বিরুদ্ধে। ট্যানক্রেড এর বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ হোলো টার্কিশ মুসলমান যোদ্ধা, আবার মোসুলের আমিরের বাহিনীর এক তৃতীয়াংশ হোলো ক্রুসেডার – ট্যানক্রেড এর প্রতিপক্ষ রাজা বল্ডউইন থেকে ধার করা। পুরা সার্কাস।

মোদ্দা কথা হোলো মুসলমানরা সে সময়ে ক্রিশ্চানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাকে মহিমান্বিত করতে চায় নি – তারা দেখেছিলো একদল অসভ্য বরবর্দের বিরুদ্ধে কিংবা “পবিত্র ভূমি” থেকে তাড়িয়ে দেয়ার যুদ্ধ – এর বেশী একটুও না। যে কারণে দুই শ বছর য়োরোপিয়ানরা মুসলমানদের পাশে থাকলেও য়োরোপ সম্বন্ধে মুসলমানদের বিন্দুমাত্র কৌতুহল জাগে নি কিন্তু আরবদের কাছ থেকে দেখে বদলে গিয়েছিলো য়োরোপ (সে দীর্ঘ আলাপ অন্য কোথাও)।

তাই ISIS এর তাণ্ডবকে জাস্টিফাই করার জন্য যেসব মুসলমান ক্রুসেডের মধ্যে মহিমা খোঁজেন তারা আসলে তাদের শত্রুপক্ষের ন্যারেটিভেই শামিল হন। ইন ফ্যাক্ট, আপনি যদি একাদশ শতকে মধ্য প্রাচ্যের মুসলমান শাসক হতেন আপনার জন্য ক্রুসেডারদের চেয়ে দশগুণ বড় মাথা ব্যথা হতো এসাসিনরা (যাদের মহান কীর্তিগাথা থেকে ইংরেজি assassination শব্দের সূত্রপাত) যারা বলা নেই কওয়া নেই আমাদের RAB এর মতো হুট করে এসে আপনাকে মেরে ফেলবে।

য়েস মুসলমানরা ভয় পেয়েছে ক্রুসেডারদের, লড়াই করেছে দস্তুর মতোন, ঘৃণাও করেছে আচ্ছামতোন কিন্তু মনে রাখবেন ক্রুসেডাররা মুসলমানদের কাছে আল-নাসারা ছিলো না , ছিলো আল -ইফ্রানজ ।

Faham Abdus Salam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2014-10-01 20:02:34