হালকা একটা খুট শব্দে রশিদ সাহেবের ঘুম ভেঙে যায় – আমান আবদুহু

হালকা একটা খুট শব্দে রশিদ সাহেবের ঘুম ভেঙে যায়। এমনিতেই তার পাতলা ঘুম। তার উপর আজ তিনি বাড়তি সতর্ক, সন্ধ্যা থেকেই মনে কূ ডাকছিলো। এতোগুলো টাকা বাসায়। কোনমতে আল্লাহ আল্লাহ করে সকাল হলেই টাকাগুলো ব্যাংকে জমা করে দেবেন। কিন্তু যে মুহুর্তে ঘুম ভেঙে গেলো, চোখ খোলার আগেই রশিদ সাহেব বুঝতে পারলেন আজ তিনি ধরা খেয়ে গেছেন। ডিমলাইটের আবছায়া আলোতে তিনি দেখলেন, বিছানার পাশে বুঙ্গাবুঙ্গা দাঁড়িয়ে আছেন।

জয়নাল এই শহরের খুবই ঘাঘু একজন চোর। চোর হিসেবে তার ক্যারিয়ারে কোন ব্যর্থতা নাই। তার এই কৃতিত্বের কারণে লোকজন তাকে জয়নাল মহাজন নামে ডাকে। আজ রাতে সে অন্য সব অপারেশনের মতোই সব প্রস্তুতি নিয়েছে ঠিকমতো। আগে থেকে হোমওয়ার্ক করেছে। সে জানে পুরো সপ্তাহের বেচাবিক্রির টাকা আজ রাতে রশিদ পাটওয়ারির বাসার সিন্দুকে আছে। শরীরে ভালোমতো সরিষার তেলও মেখেছে, সিঁদটা কেটেছে পারফেক্ট। প্রস্তুতি হিসেবে আজ বাড়তি যোগ হয়েছে বুঙ্গার মুখোশ। জয়নাল একজন আপডেটেড মানুষ। সে যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলে। সিঁদেল চোর হলেও সে হোমওয়ার্ক করে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সুতরাং সে জানে বুঙ্গা এখন তার ব্যবসার জন্য খুব উপকারী একটা উপকরণ।

রশিদ সাহেব চোখ খুলে তাকতে দেখে বুঙ্গা হিসহিসিয়ে বললেন, খামোশ!! কোন শব্দ করবি না। জংবংলাও বলবি না। চাবি দে। রশিদ সাহেব দ্বিধায় পড়ে গেলেন। একবার ভাবলেন প্রতিবাদ করবেন কি না। কিন্তু স্বাধীনতাবিরোধীতা করতে তার সাহসে কুলালো না। বিনাবাক্যব্যয়ে তিনি সিন্দুকের চাবি তুলে দিলেন বুঙ্গার হাতে।

ঠিক একই সময়ে শহরের অন্য প্রান্তে ব্যাংকের সামনে একটি গাড়ি এসে থামলো। গাড়ি থেকে নামলো স্থানীয় ছাএলীগের পাঁচজন নেতাকর্মী।

আধামাইল দূরের পতিতালয়ে শেষরাতের হালকা ব্যস্ততা। সারারাতে মোটামুটি ভালো উপার্জন হয়েছে শাবনুরের। কিন্তু মাসীকে কমিশন দেয়ার পর যা থাকবে তা দিয়ে ছেলের স্কুলের বেতন হবে না, এটা নিয়ে তার মনে হালকা একটা আক্ষেপ আছে। এই মুহুর্তে সে চুপচাপ শুয়ে আছে। এবং তার উপর ক্রমাগত হাপিয়ে যাচ্ছে মুখোশ পড়া বুঙ্গা। শেষ খদ্দেরের মুখে বুঙ্গার মুখোশ দেখে নিজের ভাগ্যকেই মনে মনে গালি দিয়েছে শাবনুর। এই লোক টাকা দেবে না, মাগনা খেয়ে যাবে কিন্তু কিছু করার নাই। তাই সে এখন নিরুপায় চুপচাপ বুঙ্গার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে।

এদিকে ব্যাংকের সামনে পার্ক করা গাড়ি থেকে অন্য সবার সাথেই নামলো সুমন। সে জেলা ছাএলীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। গেট ও ভল্ট কাটার জন্য এসিটিলিন ব্লো টর্চও রেডি। সভাপতি রাশেদ এসে সুমনের পাশে এসে দাঁড়ালো। বুঙ্গা দে। তখন হঠাৎ সুমনের খেয়াল হলো, তাড়াহুড়ায় বুঙ্গা আনা হয়নাই। সে রাশেদকে বিষয়টা জানালে দলনেতার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এখন কি হবে? বুঙ্গা ছাড়া অপারেশন খুবই রিস্কি। তাহলে কি এতো প্রস্তুতি নেয়ার পর এখন ফিরে যেতে হবে? রাশেদ চারপাশটা ভালোভাবে দেখলো। সব শুনশান অন্ধকার জনশুন্য। সে খিস্তি করে সুমনকে আরেকবার গালি দিয়ে বুঙ্গাবুঙ্গার নাম নিয়ে ব্যাগ তুলে নিলো কাঁধে। দলের সবাইকে নিয়ে সে ব্যাংকের দিকে আগালো।

রাশেদ দেখতে পায়নি কারণ ওসি বদরুল সাহেব খুবই অভিজ্ঞ একজন পুলিশ অফিসার। তিনি কোন কাঁচা কাজ করেন না। যদিও রাশেদের সাথে কথাবার্তা সব ঠিক হয়ে আছে কিন্তু তিনি ট্রেইনিং ভুলেননাই। সুতরাং তিনি খুব কাছেধারে পজিশন নেননাই। একটু দূরে অন্ধকারে পার্ক করা জীপে বসে আছেন তিনি ফোর্স নিয়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী একদল যুবক বুঙ্গার মুখোশ পড়ে ব্যাংকে ঢুকবে। তিনি আশেপাশের নিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন। অন্য কোন টহল ফোর্স যেন না এসে পড়ে। কিন্তু লুকানো অন্ধকার থেকে বদরুল যুবকদেরকে চিনতে না পারলেও অন্তত এটুকু দেখলেন যে তারা কেউ বুঙ্গাবুঙ্গা নয়। সবার মুখ খোলা। মুহুর্তে বুঝে ফেললেন তিনি আসল ঘটনা। কোন কারণে মুক্তিযোদ্ধার দল অপারেশন ক্যানসেল করেছে। এদিকে অপারেশন করে দিচ্ছে একদল স্বাধীনতাবিরোধী, এরা বুঙ্গাকে বুকে ও মুখে ধারণ করেনা। বদরুল সাহেবের চেতনা জেগে উঠলো। তিনি সন্তর্পণে ফোর্স নিয়ে এগিয়ে এসে ব্যাংকের দরজার কাছেই পজিশন নিলেন।

কিছুক্ষণ পরে আমাদের বন্ধু রাশেদের দল যখন টাকাভর্তি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসলো তখন ওসি বদরুল হুংকার দিয়ে উঠলেন, ফায়ার। মুহুর্মুহু গুলিতে ঝাঝরা হয়ে যাওয়ার মুহুর্তেও রাশেদ কিন্তু ওসি সাহেবকে বুঝাতে চাচ্ছিলো মুখের উপর বুঙ্গা না থাকলেও আসলে তারা ছাএলীগেরই সন্তান। সুতরাং সে গুলি খাচ্ছিলো এবং গলা ফাটিয়ে একটানা চিৎকার করে যাচ্ছিলো, জংবংলা! জংবুঙ্গাবুঙ্গা!

Aman Abduhu | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-03-02 04:03:31