বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন কি ব্যাকড্রপে রেখেও কোনো ডিসেন্ট এবং অবজেক্টিভ আলোচনা বাংলাদেশে সম্ভ – ফাহাম আব্দুস সালাম

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এমন কি ব্যাকড্রপে রেখেও কোনো ডিসেন্ট এবং অবজেক্টিভ আলোচনা বাংলাদেশে সম্ভব না। তার খাদেমদের কাছে তিনি অতিমানব, মৃত্যুর পরেও ক্রমবর্ধমান আর তার সমালোচনাকারীদের মতে তিনি সকল নষ্টের গোড়া। এর মাঝ খানে যে অ-নে-ক বিস্তৃত পরিসরে দোষগুণে মিলিয়ে একজন বঙ্গবন্ধু পাওয়া যায় এই সামান্য কথাটা আমাদের মাথায় ঢুকতে চায় না।

আমি তার ছবিটা ব্যবহার করে একটা প্রয়োজনীয় আলাপ শুরু চেয়েছিলাম, ছবিটা ছিলো টীজার মাত্র কিন্তু জশনে জুলুশ শুরু গেলো সেই ছবি নিয়েই। যাকগে, বঙ্গবন্ধুর ছবির কথা বাদ দেন। অন্যভাবে বলি।

একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করুন।

১৯৪৭-৪৮ সাল। ভারত-পাকিস্তান আলাদা হয়েছে। দুটো দেশের চরিত্র কেমন হবে কেউই ঠিক মতোন জানেন না – সবাই অনুমান করছেন। তখনও কেউ জানেন না যে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের যতো রস, যতো বিষ সব নিংড়ে নেবে পাঞ্জাবীরা কয়েক বছরের মধ্যে। কেউ কেউ জানলেও প্রক্রিয়াটা শুরু হয় নি। এতোটুকু তর্কাতীত সত্য।

আরেকটা তর্কাতীত সত্য হোলো – ঐ মুহূর্তে দুই পাকিস্তানেই “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” উত্তুঙ্গে থাকলেও ভারতবর্ষের যে সব মুসলমান রাজনীতি ফলো করেন তারা জানেন যে মুসলমানদের যে রাজনীতি সেই রাজনীতির লিভিং এমবডিমেন্ট হয়তো জিন্না কিন্তু জাতি হিসেবে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ নেতা সাপ্লাই করেছে বাঙালিরা।

মনে রাখতে হবে যে, কয়েক বছর আগের লাহোর প্রস্তাব পেশ করার জন্য জিন্না সাহেব দ্বারস্থ হয়েছিলেন শেরেবাংলা সাহেবের। এছাড়াও আছেন সোহরাওয়ার্দী সাহেব, মোহাম্মদ আলী বগুড়া, খাজা নাজিমুদ্দিন। এনারা প্রত্যেকেই পলিটিকাল হেভিওয়েট – অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এখনো পুরো ভারতবর্ষের মুসলমানরা বাঙালি মুসলমানদের এই ঐতিহাসিক অবদান স্বীকার করেন – এমন কি পাকিস্তানেও তা স্বীকৃত।

অন্যদিকেও এটাও সবার জানা যে পাকিস্তান হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই সকল সুবিধা, সকল রস পাঞ্জাবের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে যা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের প্রধান একটা কারণ। যাদের আমরা “চুতিয়া পাঞ্জাবী” বলি তাদেরকে তো আল্লাতালা সকল সুবিধা দিয়ে পাঠায় নাই, তারা নিজেরাই চুতিয়ামি করে পাঞ্জাবকে পুরা পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছিলো। প্রশ্ন হোলো এই কাজটা করার – অন্তত চেষ্টা করার সুযোগ তো বাঙালি নেতৃত্বের ছিলো। চেষ্টা করলেও আমরা হয়তো ব্যর্থ হতাম – মানি – কারণ আমাদের অর্থনীতি সে সুযোগ দিতো না। কিন্তু বাঙালি কেন পাঞ্জাবীদের স্পটটা নিলো না প্রশ্নটা কখনো করেছেন? এমনও তো হতে পারতো যে পুরা পাকিস্তানের সুযোগ সুবিধা পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালিদের হাতে কুক্ষিগত আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ন্যস্ত।

আমি বলছি না যে চাইলেই এটা হয়ে যেতো কিন্তু আমাদের নেতারা চেষ্টাও তো করেন নি। একটু বোঝার চেষ্টা করুন। ৪৭-৪৮ এ পাকিস্তানের পলিটিকাল স্ট্রাকচার তৈরী হয় নাই, বিশাল ভ্যাকুয়াম এবং এস্টাবলিশড নেতাদের একটা বড় অংশ বাঙালি এবং তাদের পলিটিকাল লেভারেজ মোটেও কম না। তা এই লেভারেজ দিয়ে তারা কী করলেন? আমাদের শ্রদ্ধেয় পূর্বপুরুষদের নিয়ে গালাগালি করাটা অশোভন তাই বিরত হই। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তারা নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করে মন্ত্রী হওয়ার রেসে টিকে থাকতে বাঙালির পলিটিকাল ক্যাপিটাল খোয়ালেন। কখনো প্রশ্ন করেছেন এই নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি তো পাঞ্জাবীদেরও করার কথা ছিলো, তারা কেন করলো না?

কখনো চিন্তা করেছেন জিন্না ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দু দিয়েই ছুটে গিয়েছেন পুরা ভারতবর্ষের মুসলমানদের কাছে, প্রেজেন্ট করেছেন তার কেইস। সেই কেইস ভুল কি ঠিক সেটা ভিন্ন আলাপ কিন্তু তিনি নিজে যা ঠিক মনে করেছিলেন পুরা ভারতবর্ষের মুসলমানদের কনভিন্স করে ছেড়েছিলেন তো (শায়িস্তা ইক্রামুল্লাহ খান জানাচ্ছেন যে একদিন সকালে তিন ঘন্টা ধরে জিন্না ওয়ান অন ওয়ান তার কেস প্রেজেন্ট করলেন এক অখ্যাত মহিলাকে)। ১৯৩৬ এর নির্বাচনের ভরাডুবির পর ১৯৪৩ – মাত্র সাত বছরে এখনকার মতো সর্বব্যাপী মিডিয়া ছাড়াই ভাঙ্গা স্বাস্থ্য নিয়ে পুরা ভারতে পাকিস্তানের আইডিয়া স্ট্যাবলিশ করেছিলেন তো।

এখন আপনি বলেন জিন্না যা পেরেছিলেন সেটা সোহরাওয়ার্দী সাহেব কেন পারেন নি? শিক্ষা-দীক্ষা, পারিবারিক আভিজাত্য, টাকা পয়সা, পেশাগত সাফল্য – সব দিক থেকেই তিনি জিন্নার সাথে তুলনীয়। কখনো শুনেছেন বঙ্গবন্ধু লাহোর কিংবা ইসলামাবাদে বিশাল জনসভায় এড্রেস করে তার ছয় দফার ন্যায্যতা পেশ করছেন? কখনো শুনেছেন বাঙালির আক্ষেপের কথা জানাতে এবং পাঠানদের সাথে ঘোট পাকানোর জন্য পেশাওয়ারের বিশাল ময়দানে সোহরাওয়ার্দী উর্দুতে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে পাঠান ও বাঙালিরা মিলে পাঞ্জাবীদের পাছায় বাঁশ ঢুকাবো এই ফন্দি করছেন? ফন্দি তিনি খুব ভালোই করতেন কিন্তু করতেন আরেক বাঙালি নেতার বিরুদ্ধে।

আরো আগে যাই। ১৯১১ পর্যন্ত রাজধানী কলকাতায়। পুরা ভারতবর্ষের বলতে গেলে যেকোনো প্রফেশনের এবং শিক্ষার নেতৃত্ব কলকাতায় অথচ দেখেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় নেতৃত্বে অবাঙালিদের জয়জয়কার।

এবার আরেকবার চিন্তা করে বলুন কেন এটা হচ্ছে বছরের পর বছর। কেন আমরা বাঙালিরা আমাদের চিন্তা আমাদের কালচার আরেকজনের উপর ইম্পোজ করতে পারি না, কেন অবাঙালিরা তাদের কালচার আমাদের ওপর ইম্পোজ করতে পারে? হিন্দি ফিল্মের ভারতীয়ত্ব মানে প্রায় এক্সক্লুসিভলি উত্তর ভারতীয়ত্ব এবং কখনোই বাঙালিত্ব না। কেন ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্তানীরা আমাদের নিয়ে হাসাহাসি করে?

কারণ হচ্ছে আমাদের মিনমিনে স্বভাব, সবল থেক দশ মাইল দূরে থেকে দুর্বলের ওপর মহা প্রতাপ। নিজেদের জাতিকে শ্রেষ্ঠ মনে করি কিন্তু অন্যেরা আমাদের ল্যাটকামি দেখে হাসে।
ব্যক্তিত্বের অভাবকে আমরা মনে করি সম্পদ আর সৌন্দর্যের অভাব।

আমি কোনোদিনও বলি নাই যে ইংরাজি না জানার কারণে এই দুরাবস্থা হয়েছে। কিন্তু এটা বলি যে শিক্ষার অভাব এর একটা মূল কারণ। ইংরেজি শিখলে আপনি আপনার সামগ্রিক শিক্ষার অভাব থেকে খুব দ্রুত উপরে উঠতে পারবেন এবং মোর ইম্পর্টান্টলি, এই ইংরেজি ব্যক্তিগত পর্যায়ে আপনাকে পাঞ্জাবি, উত্তর ভারতীয়, তামিল, পাঠান সবার সাথে এক কাতারে আনবে – এই কনফিডেন্স আমাদের নাই দেখেই হে হে করে ল্যাটকামি করি। এখন ইংরেজি শিখলেই আর পায়ের ওপর পা তুলে কথা বললেই সানি লিওন বম্বে থেকে আপনার জন্য ছুটে আসবে না – সত্য – কিন্তু এট দা লীস্ট, প্লেনে পাশাপাশি বসে ট্রাভেল করলে আপনাকে দেখে ছুটেও পালাবে না।

আমার আলাপ শেষ হয়েছে।

Faham Abdus Salam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2014-08-14 11:44:38