করোনার বিষয়ে প্যানিক অবশ্যই করার প্রয়োজন নাই। কিন্তু, রাষ্ট্রীয় অকর্মণ্যতা, অযোগ্যতা এবং – জিয়া হাসান

করোনার বিষয়ে প্যানিক অবশ্যই করার প্রয়োজন নাই। কিন্তু, রাষ্ট্রীয় অকর্মণ্যতা, অযোগ্যতা এবং ভুল পলিসিকে আড়াল করার জন্যে প্যানিক না ছড়ানোর নির্দেশ যেন ঢাল না হয়ে দাঁড়ায়।

ভুটানের প্রাইম মিনিস্টারের অফিসের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস প্রথম কমেন্টে দেওয়া আছে। পড়লে বুঝতে পারবেন ভুটানে প্রথম করোনা রোগী ধরা পরার পরে তারা কি ব্যবস্থা নিয়েছে।

দুই জন টুরিস্ট প্রবেশ করার পরে প্রাথমিক স্ক্রিনিং পার হয়ে গেলেও, একদিন ভ্রমণ করার পরে তারা হসপিটালে রিপোর্ট করে এবং তাদের করোনার সিম্পটম ধরা পরে।

মোটামুটি মাঝারি সাইজের এই স্ট্যাটাসে দেখবেন , ভুটান প্রাইম মিনিস্টারের অফিস থেকে ঐ রোগীরা, কোন প্লেনে করে ভুটানে এসেছে, এই প্ল্যানের বাকি প্যাসেঞ্জার কোন দেশের ছিল, কোন হোটেলে থেকেছে, কোন সময়ে কোন এলাকা ভ্রমণ করেছে , তার সব বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

প্রাইভেসির খাতিরে রোগীদের নাম দেওয়া হয়নি কিন্তু এমন ভাবে বিষয়টি লেখা হয়েছে যেন, ওই লোকের সাথে যাদের যাদের ইন্টারেকশন হতে পারে তারাও তথ্য গুলো সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।

একটা প্যারাগ্রাফের শিরোনাম – কন্টাক্ট ট্রেসিং।
ওই প্যারাগ্রাফে জানানো হয়েছে ওই রোগীদের যাদের যাদের সাথে সাক্ষাতের সম্ভাবনা হয়েছে তাদের সকলের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। তাদেরকে করোনা টেস্ট করা হয়েছে। এমন কি ঐ রোগীরা যে সকল হোটেলে চা খেয়েছে, যে হোটেলে নাস্তা করেছে, লাঞ্চ করেছে সেই সকল হোটেলের নাম জানিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেই সকল হোটেলে যাদের তাদের সাথে যাদের সাক্ষাত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের সকলকে টেস্ট অথবা কয়ারান্টাইন করা হয়েছে।

ওই প্লেনে যারা যারা এসেছিল, তাদের সকলকে কয়ারান্টাইন করা হয়েছে। ঐ প্লেনের সকলেই ছিল, ইন্ডিয়ান। পুরো বিষয়টা ইন্ডিয়ান সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।

এয়ারপোর্ট থেকে ঐ টুরিস্টরা যে গাড়িতে এসেছিল, সেই গাড়ি ড্রাইভার, তাদের গাইড সকলের টেস্ট করা হয়েছে অথবা কোয়ারাইন্টাইন করা হয়েছে।

রেসপন্স প্ল্যান হিসেবে, উক্ত টুরিস্টরা যে সকল এলাকা ভ্রমণ করেছে, সেই সকল এলাকায় স্কুল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং আরো কিছু স্টেপ নেওয়া হয়েছে।

এইটা শুধু ভুটান নয়, কেরালায় যে পাঁচ জন রোগী সনাক্ত করা হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও দেখেছি। ওই রোগীরা যাদের সাথে সাক্ষাত করেছে, বা করার সম্ভাবনা ছিল তাদের সকলকে খড়ের বস্তার মাঝে সুই খুঁজে বের করার মত করে খুঁজে বের করা হয়েছে, টেস্ট করা হয়েছে।

সিঙ্গাপুরেও তাই। মালয়েশিয়াতেও তাই। জার্মানিতেও তাই। ইতালিতেও তাই।

বিশ্বের সকল দেশে করোনায় আক্রান্ত রোগী খুঁজে পাওয়া মাত্র এই স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে।

এক মাত্র বাংলাদেশেই দেখলাম, গতকাল করোনায় ইতালি থেকে আসা দুই জন এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে একজন রোগী খুঁজে পাওয়ার ডিক্লেরাশেন দেওয়ার পরে , আমরা মুজিব বর্ষের উদযাপন বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার জন্যে থ্যাংক ইউ পি জানাতে ব্যস্ত হয়ে গ্যাছি।

এবং তারপরে আমরা সোশাল মিডিয়াতে ফাইট করতে বসেছি, করোনা যেহেতু গরমের বেচে থাকেনা ফলে আমাদের কিছু হবে কি হবেনা বা করোনায় ফ্যাটালিটি যেহেতু খুবই কম, তাই কয় জন্যে ঐকিক নিয়মে মরতে পারে কি পারেনা। এপিডলমজির পিএইছডি করা মানুষ চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতেছে, করোনায় মৃত্যুর হার দুর্ঘটনার থেকে কম হবে।

কিন্তু যে রোগীদের করোনা ধরা পরেছে তাদের কন্টাক্ট ট্রেসিং এবং তারা যে এলাকা গুলো ভ্রমণ করেছে সেই এলাকা গুলো কয়ারান্টাইন করতে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছেনা। (অন্তত এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য মতে না)

এবং বলা হচ্ছে প্যানিক না ছড়াতে।

অবশ্যই প্যানিক না ছড়ানোর জন্যে অথরিটিকে যথাযথ পদ্ধতি নিতে হবে। কিন্তু বেসিক কাজ গুলো না করে , ট্রেসিং, আইসোলেশান এবং কয়ারান্টাইন এর হু এর বলে দেওয়া স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল অনুসরণ না করে নিজের অদক্ষতা ও অকর্মণ্যতা আড়াল করার ঢাল হিসেবে যদি বলা হয় প্যানিক না করতে তবে মানুষ প্যানিক করবেই।

আমি দেশের বাহিরে। আমি যে স্টেটে সেই স্টেটে করোনা রোগী আছে। আমি খেলতে ফিরতে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কারণ, আমি জানি রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যদি করোনা নাও আসে, তবুও আমি আমার পরিবার এবং বন্ধুদের জন্যে উদ্বিগ্ন কারণ আমি জানি রাষ্ট্র “জাস্ত প্যানিক করবেনা গরম আসলে সব ঠিক হয়ে যাবে” বাদে আর কোন ব্যবস্থা নেয় নাই।

একটা জিনিষ বুঝতে হবে, করোনায় ফ্যাটালিটি নিয়ে আলোচনাটা এই মুহূর্তে সঠিক আলোচনা নয়। কারণ এই মুহূর্তে ফ্যাটালিটি কত সেইটা প্রশ্ন না প্রশ্ন হচ্ছে, করোনার বিস্তার বন্ধ করা।

পৃথিবীর কোন দেশ বলছেনা, করোনার কারনে অনেক ফ্যাটালিটি হবে। কারণ, চিকিৎসা ব্যবস্থা এগিয়েছে। মানুষের সচেতনতা বেড়েছে।

কিন্তু ভুটান থেকে ইন্ডিয়া, নাইজেরিয়া থেকে ইতালি করোনা চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথে এর বিস্তার প্রতিরোধে খুবই স্পেসিফিক একশন নিয়েছে যা বাংলাদেশ সরকার নেয় নাই।

তারা জাস্ট তিন যোগ রোগী পাওয়া গ্যাছে, তাদের নাম ঘোষণা করেই ক্ষান্ত।
যে ফ্লাইটে তারা এসেছে, তাদেরকেও সরকার নোটিফাই করতে পারতো। করে নাই।
তারা কোন এলাকায় এলাকায় গিয়েছে তা নিয়ে সরকার নোটিফাই করতে পারতো। করে নাই।

এইটা বলতে হেলথ এক্সপার্ট হইতে হবে না যে , এই অকর্মণ্যতা এবং খামখেয়ালী পনা খুব ডেঞ্জারাস। প্রশ্নটা শুধু মাত্র ফ্যাটালিটির নয়।

প্রশ্নটি হচ্ছে যদি করোনা ছড়িয়ে যায় তাকে মোকাবেলা করতে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত নয় ।

আমাকে একজন ডাক্তার জানিয়েছে, বাংলাদেশে শুধুমাত্র কুর্মিটোলা এবং কুয়েত মৈত্রী হসপিটালে করোনা ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা রয়েছে। এবং মোট সিট সংখ্যা মাত্র ৫০।
বাংলাদেশে মোট আইসিউ বেড ১০০০ নাকি ৫০০০ এই নিয়ে আরেকজন বন্ধু ডাক্তারের সাথে দীর্ঘ বিতর্ক হল।

ফলে, আজ যদি করোনা বিস্তার লাভ করে, বাংলাদেশের ক্ষতি চায়না বা আমেরিকার সমান হবেনা। অনেক বেশী হবে। বি ভেরি ক্লিয়ার এবাউট ইট। ইরানের ফ্যাটালিটি চায়না থেকে অনেক বেশী।

আমি তবুও বলবো, ফ্যাটালিটি কত তা এই মুহূর্তের সঠিক প্রশ্ন নয়। করোনার ফ্যাটালিটি যদি কম ও হয়, এই ভাইরাসটি যদি আমাদের অসতর্কতার জন্যে জনপদে ছড়িয়ে পরে, বি সিউর, বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়া কমিয়ে দেবে এবং গার্মেন্টসের রপ্তানি আদেশ ও ইম্প্যাক্টেড হবে।

কারণ বিশ্ব দেখবে, ভুটানের মত দেশ করোনার বিস্তার ছড়াতে যে স্টেপ গুলো নিয়েছে আমরা নেই নাই। তিন জন করোনা রোগী পাওয়া গ্যাছে ডিক্লেয়ার করে সবাই গরমের অপেক্ষায় বসে গ্যাছে এবং থ্যাঙ্ক ইউ পিএমের বন্যা বয়ে গ্যাছে।

ফলে প্যানিক না করার উপদেশটি সঠিক কিন্তু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, এই উপদেশটি অকর্মণ্যতার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাজারে একটা গুজব আছে, একটা টেকনিকাল কারণ দেখিয়ে মোদীর সফর বন্ধ করার জন্যে সরকার এই ঘোষণা দিয়েছে।

দোয়া করেন, গুজব টা যেন ঠিক হয়।

বিভিন্ন কারনে, করোনা বিষয়ে এইটি আমার সর্বশেষ মন্তব্য এবং আগামী কিছু দিন সোশাল মিডিয়া থেকে দূরে থাকবো।

আপডেট ঃ এই স্ট্যাটাসের পরে বাংলাদেশ টাইম ৯ঃ১৫ তে একজন বন্ধু জানিয়েছে যে ৪০ জনকে কয়ারান্টাইন করা হয়েছে। এইটা একটা সুসংবাদ। কিন্তু আমি বলবো তাও এনাফ না ।
তারা কোন ফ্লাইটে এসেছে, কোন এলাকায় গ্যাছে, এ সকল নিয়ে আরো তথ্য সরকারের দেওয়া উচিত, যেভাবে ভুটান সরকার দিয়েছে।

৩ জন রোগী পাওয়া গ্যাছে, ৪০ জন কয়ারান্টাইন করেছি, এইটা আরো বড় অযোগ্যতা। আরো ডিটেল কমিউনিকেশান করা প্রয়োজন। কারণ শুধু মাত্র ওই ফ্লাইটেই ২০০ যাত্রী থাকার কথা।
এবং যত দেরি করা হবে ততই বিস্তার ছড়াবে।

তবুও আশা রাখি কাজটা শুরু হয়েছে এবং সরকার এই ক্ষেত্রে দ্রুত মুভ করবে যা এখন পর্যন্ত দেখা যায় নাই।

Zia Hassan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-03-09 19:54:19