উম্মি না পি এইচ ডি? – রেজাউল করিম ভূইয়া

উম্মি না পি এইচ ডি?
===
ছোটকালে মনে একটা প্রশ্ন ছিল। সেটা হল মুহাম্মদ(স) কে আল্লাহ উম্মি করে পাঠালেন কেন? কেন উনাকে সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩০ বছর পড়িয়ে তারপর নবী বানালেন না।
আজ সে প্রশ্নের উত্তর হাতের মুঠোয়।
===
ইসলামের পতনকালগুলো দেখেন। একটা পতনকাল: স্পেন। পতনের সময় শিক্ষা দীক্ষায় স্পেন কত উন্নত ছিল।
আরেকটা পতনকাল: বাগদাদ। পতনের সময় বাগদাদের শিক্ষা দীক্ষা- বেস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।
===
বলতে পারেন, তৎকালীন যুগের সব পিএইচডি ছিল ওই শহরগুলোতে। তাহলে প্রশ্ন হল, পতন হল কেন?
কারন একটাই। বেহুদা নলেজের ছড়াছড়ি। অতিরিক্ত গবেষণা। অতিরিক্ত বইয়ে মেতে থাকা। সারাদিন মাত্রাতিরিক্ত গবেষণা, এমন বিষয়ে, যাতে কারো কোন জ্ঞান নেই। তার থেকে অজস্র বিতর্কের সূত্রপাত। এবং বিভিন্ন ফিরকার আবির্ভাব। এই তর্ক বিতর্ক করতে করতে জীবনের ৪০-৫০-৬০ বছর শেষ। অথচ কাজের কাজ কিছুই করতে না পারা। বরং অতিরিক্ত পড়াশোনা করতে গিয়ে, প্র্যাকটিকাল কাজে কর্মে মানুষ অক্ষম হয়ে যায়।
===
জ্ঞানের জন্য পড়াশোনা অবশ্যই দরকার। কিন্তু সে পড়াশোনা হবে বাস্তব কাজ মুখী। বাস্তব মুখী। অকারন কিছু ইনফরমেশন মুখস্থ করে তা নিয়ে তর্ক বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার নাম এডুকেশন নয়।

নিজের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিভাকে শানিত না করে বরং আগের লেখা বইপুস্তক মুখস্থ করে আসলে কোন লাভ হয়না। এগুলোকে বড়জোর রেফারেন্স হিসেবে বিভিন্ন তর্ক বিতর্কে উপস্থাপন করা যায় মাত্র। নিজের এনালাইটিক এবিলিটিকে না বাড়িয়ে বরং 'বড় কেউ' এর শত বছর আগে করা এনালাইসিসকে মুখস্থ করার জ্ঞান নয়। সেটা শুধুই মুখস্থ। এরকম পড়াশোনা আমাদের মধ্যে আসলে কিন্তু আছে।

এজন্য ৩০-৪০-৫০ বছর চার দেয়ালের মাঝে নিজেকে বন্দী করে বই মুখস্থের নামে 'জ্ঞান চর্চা' করে দেখা যায়, পুরো জীবনটাই নষ্ট হয়েছে তর্কে বিতর্কে। অথচ কত জরুরী সিম্পল কাজ পড়ে আছে, করার মতন লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।
===
ইমাম গাজ্জালী মারা যান ১১১১ খ্রিস্টাব্দে। তিনি বাগদাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে আফসোস করতেন। যে কত রোগ, অথচ ভাল চিকিৎসক নেই। সবাই তর্কবিতর্কে ব্যস্ত। সবাই তর্কবিতর্কের ফিকহ শিখছে, কিন্তু চিকিৎসা বিদ্যা কেউ শিখতে আগ্রহী না।

তার মানে এডুকেশন দরকার। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের জন্যই তা হওয়া উচিত সিম্পল ৬-৮-১০ বছরে শেষ, এরকম। এরপর জীবন আছে, চাকরি বা ব্যবসা আছে, বিয়ে শাদী আছে। কিছু লোক হয়তো একটু বেশী পড়াশোনা করে এক্সপার্ট হবে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু সেটা সবার জন্য না। খুব অল্প ০.১% লোকের জন্য। আর সব দরকারী বিষয়ে প্রোপরশন অনুপাতে লোক দরকার। সবাই এক বিষয় পড়লে ইমব্যালেন্স।

===
দেখেন বাংলাদেশের অবস্থা আজ। ইঞ্জিনিয়ারও পিএইচডি, কন্ট্রাক্টর হয়তো কম করে হলেও এমএ পাশ। কিন্তু রাস্তা বানাইলে ৬ মাস থাকেনা। টাকাও খরচ হয় ইউরোপের মতন।

আর ওদিকে অশিক্ষিত লোক আগে রাস্তা বানাইতো, এরশাদ আমলে, বা তারও আগে , সেই রাস্তা ১০ বছর থাকতো। তাহলে এত পড়াশোনা, কি লাভ? মুঘল আমলের অশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারদের করা রাস্তাও আজ টিকে আছে, কিন্তু বর্তমান যুগের পিএইচডি করা লোকদের রাস্তা ৬ মাস টিকেনা।
===
এখন জাস্ট সামাজিক মর্যাদা অর্জনের জন্য সবাই যুগের পর যুগ পড়াশোনা করে একটা গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রী অর্জন করছে। সবাই ডিগ্রী পাশ, সবার হাতে সার্টিফিকেট, কিন্তু কেউ কোন কাম পারেনা। কাম করে বিদেশীরা, আর দেশের লোক বেকার।
===
বাগদাদের অবস্থাটা আমি চিন্তা করতে পারি। খাওরাজিম সাম্রাজ্য ধ্বংসের ৩৭ বছর বাগদাদ চেয়ে চেয়ে দেখেছে। কিন্তু কোন ব্যবস্থা নেয়নি। তাদের লাইব্রেরীর জ্ঞান কোন কাজে আসেনি। টন টন গোল্ড সঞ্চিত ছিল, ম্যানপাওয়ার ছিল, কোন কাজে লাগায় নি তারা। সুতরাং ধ্বংস হয়ে গেছে।
===
এজন্যই সবসময় সিম্পল ভাবে যারা দুনিয়াকে দেখে, অতিরিক্ত গবেষণা করতে গিয়ে ত্যানা পেঁচায় না, তারাই সফল হয়। এদিকে কেউ হয়তো ৪০ বছর ধরে ইসলাম নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে সারাদিন ফিকহী তর্কে বিতর্কে লিপ্ত, আরেকদিকে কোন অশিক্ষিত দিনমজুর লক্ষ লোককে কালেমা পড়িয়ে ফেলেছে। কে সফল বলেন তো?

আগেকার যুগে, পারসিয়ান – রোমান সাম্রাজ্য কিভাবে চলতো দেখেন, ইভেন আমাদের অটোমান সাম্রাজ্য দেখেন। একটা ছেলেকে মাত্র ৮-১০ বছর প্রশিক্ষণ দিয়ে অফিসার বানাই দিতো। কি সুন্দর সে একাই বাংলাদেশের দশ গুন জায়গা একাই সামাল দিতো। আর এখন? ৩৫ বছর বয়স্ক শত শত পিএইচডি সিভিল সার্ভেন্টস মিলে সরকারী কাজ করতে পারেনা। একটা ছোট মামলার বিচার করতে ২০ বছর লাগে? পঞ্চাশ জন শিক্ষিত লোক মিলে একটা ছোট্ট মামলার রায় ২০ বছরে দিয়ে শেষ করতে পারেনা, দিলেও আবার ভুল দেয়। অপরাধ কইরাও বেকসুর খালাস। বা অপরাধ না করে জেলে। কি লাভ বলেন এই শিক্ষা দিয়ে?

আগে সফল ছিল: কারন সিম্প্লিসিটি।
এখন ব্যথ: কারন অতিরিক্ত পেপারওয়ার্ক, অলসতা, অতিরিক্ত নিয়ম কানুন, দুর্নীতি, যেগুলার কোন মানে নাই।

আর ১৫-২০ বছর অকারন পড়াশোনা করে টাকা নষ্ট, সময় নষ্ট, জীবন নষ্ট, বিয়া শাদী নাই – এসব তো আছেই।

===

এজন্য আসলে পড়াশোনা দরকার, তবে তার থেকে বেশী দরকার 'কাজের লোক' এর। যে ময়দানে কাজ করতে পারে, সে হল আসল লোক, সে শিক্ষিত না উম্মী – সেটা বড় কথা না। এজন্য ইসলামের উত্থান সবসময় এমন জনগোষ্ঠী দ্বারা হয়েছে, যাদের মধ্যে উম্মী লোক বেশী, কিন্তু তারা কাজের।
কারন যারা বেশী পড়াশোনা করে, তারা অধিকাংশ সময়ই ময়দানে কাজ করতে চায়না, এসিরুমে বসে কাগজে কলমে অর্ডার লিখে সই করতে চায়। ময়দানে কাজ করতে চায়না। কিন্তু আসল কাজ তো ময়দানে হবে, যে কাজ করবে, তার দ্বারা? এজন্য কাজ পড়ে থাকে। পড়ে জমতে থাকে। ফলাফল: ব্যর্থতা।

এজন্য কাজের লোক হিসেবে উম্মীরা ভাল। আসলে ইখলাস, তাকওয়া , ইয়াকীন এসব তো আর সার্টিফিকেট দিয়ে অর্জন করা যায়না, তাইনা?
===

এজন্য দরকার ব্যালেন্স। এজন্য দরকার হাতে কলমে কাজ করায় এমন শিক্ষা। চার দেয়ালে বন্দী রেখে যুগ যুগ ধরে পড়ায়, এমন শিক্ষা অর্থহীন। মুখস্থ বিদ্যা নয়, প্র্যাকটিকাল কাজ করতে শিখানো। তা ইসলামী শিক্ষা হোক, সেক্যুলার শিক্ষাই হোক।
===
শেষ কথা: ইসলামের উত্থান হয়েছে, এক উম্মী নবী(স) র সাথে থাকা বহু উম্মী সাহাবী(রা) কে নিয়ে।
এরপর? অটোমানরা? এরাও কিছুটা উম্মী লোকই ছিল। এমন শিক্ষিত ছিলনা।

বর্তমানে? একই হিস্টোরী। উম্মীদের হাতেই। সেই উম্মী অশিক্ষিত পাখতুনখোয়ার জাতিগুলোর হাতেই হয়তো। দুই পরাশক্তি এক সাথে পরাভূত। অথচ , কত পিএইচডি করা জাতি ছিল, দেখেন পূর্ব থেকে পশ্চিম পর্যন্ত , কত জাতি? অথচ আল্লাহর পছন্দ উম্মীদেরকে? কারন তারা কাম পারে ।

কি ইন্টারেস্টিং!! তাইনা ?
===
তার মানে এই নয় যে পড়াশোনা অর্থহীন। বরং অবশ্যই পড়াশোনা দরকার। কিন্তু সারাদিন যেন বেশী বই পড়তে গিয়ে, আসল কাজটাই
যেন বাদ না দেয়া হয়, সেটাও দেখা দরকার।

পড়ার যে একটা আপার লীমিট আছে, বেশী হয়ে গিয়ে তা অযথা তর্ক বিতর্ক সৃষ্টি করে, সেটা মাথায় রাখা দরকার। পড়ার প্র্যাকটিকাল ইমপ্লীমেন্টেশন আছে, সেটা মাথায় থাকতে হবে। ইসলামী মহল, এবং সেক্যুলার মহল, সবার জন্যই এক কথা। ডিগ্রী তো নিবো ঠিক আছে, তবে আসল হল ' আসলে আমি কাজটা শিখলাম কিনা, ময়দানে কাজটা পারি কিনা? – সেটা কনফার্ম করা। '

আর ফোকাস হবে, 'মূল কাজ' এ। যেমন ইসলামের কথা বললে, মূল কাজ হল, সালাত ৫ ওয়াক্ত, সিয়াম, যাকাত, হজ্ব এসব করলেই হইলো, মূল কাজ শেষ। এরপর নিজেকে প্রডাক্টিভ বানিয়ে উম্মতের খেদমত করেন। সারাদিন অযথা তর্কবিতর্ক: পরিহার। আরেকজনের পিছে লেগে থাকা: পরিহার।
এনাফ হবে, টেইক থিংস সিম্পলী।
===

এজন্যই কি আল্লাহ আমাদেরকে উম্মী একজন নবী(স) দ্বারা কাজের মর্মটা শিখালেন? বর্তমান এডুকেশন সিস্টেমের ব্যর্থতা দ্বারা সেটাই বুঝা যায়।

M. Rezaul Karim Bhuyan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-04-01 10:01:11