অভিজিৎ ব্যানার্জি করোনা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দিচ্ছে – জিয়া হাসান

অভিজিৎ ব্যানার্জি করোনা সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশকে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দিচ্ছেন – এই পরামর্শটিকে আমি ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ মনে করি।

নাসিম নিকলাস তালেব যে অর্থনীতিবিদদের ,বোধবুদ্ধিহীন ব্যবসায়ী, ঘিলুতে পদার্থ-হীন পদার্থবিদ এবং অণ্ডকোষ বিহীন জুয়াড়ির সংমিশ্রণ বলেছেন- তার টিপিকাল একটা প্রমাণ হচ্ছে, অভিজিতের এই পরামর্শ।

নাসিম তালেবের অর্থনীতিবিদদের এই ধরনের চিত্রায়ন করার মূল কারন টি হচ্ছে , অর্থনীতিবিদদের স্কিন ইন দা গেম না থাকা। স্কিন ইন দা গেম বোঝাতে, নাসিম তালেব খারাপ ড্রাইভারের উদাহরণ দেন। উনি বলেন যে, একটা খারাপ ড্রাইভার যদি বাজে ভাবে রাস্তায় গাড়ি চালায় তবে সে এক্সিডেন্ট করলে, তারা নিজের মৃত্যু হতে পারে। কিন্তু যেহেতু তার স্কিন ইন দা গেম আছে ফলে সে সব সময়েই এমন সিদ্ধান্তে নিবে, যা শুধু নিদের প্রান বাচাবেনা একই সাথে অন্যদের প্রান বাঁচাবে। কিন্তু, স্কিন ইন দা গেম না থাকাতে অর্থনীতিবিদেরা এমন সব পরামর্শ নেন, যা রিস্ক এবং প্রবেবিলিটি হিসেব করে না, ফলে মূল উদ্দেশ্য ত অর্জিত হয়ই না বরং বরং আরো ভিন্ন সমস্যা তৈরি করে যা তারা আগের থেকে থেকে হিসেব করে দেখে না।

আমার হিসেবে অভিজিতের এই ভুলটা করার কথা ছিল না। কারন, শ্রদ্ধেয় অভিজিৎ ব্যানার্জি মুলত একজন মাইক্রো ইকনমিস্ট। এবং অভিজিৎ এবং এসথার ডাফলোর গবেষণা এবং নোবেলের মূল ইস্যু হচ্ছেই, মাইক্রো লেভেলে এভিডেন্স বেজড ডিসিশন। যেইটা স্কিন ইন দা গেম না থাকার একটা খুব ভালো এন্টিডোট। ।

কিন্তু দুঃখ জনক ভাবে অভিজিৎ, এখন ম্যাক্রো লেভেলে এমন একটা এডভাইজ করে বেড়াচ্ছেন, যেইটা উনার স্পেশালাইজেশানের বাহিরের শুধু নয়, তার যে স্পেশাইলেজানের কারন তিনি নোবেল পেলেন যে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে র‍্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল করে এভিডেন্স বেজড সিদ্ধান্ত নিতে হয়- সেই বোঝাপড়ার বাহিরে। তিনি এমন একটা এডভাইজ করছেন যার কোন উদাহরণ অর্থনীতির ইতিহাসে নাই।

জাস্টিফকেশানের জন্যে অভিজত বলেছেন, ইউএস টাকা ছাপাচ্ছে। কিন্তু ভারত এবং বাংলাদেশে এখনো সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে নাই। ইউএস টাকা ছাপাচ্ছে কারন ইউএস ইনফ্লেশানের রিস্ক বাদ দিয়েই টাকা ছাপাতে পারে। কারন ইউএস ডলার একটা গ্লোবাল কারেন্সি। তাদের মুদ্রাস্ফিতির দায় পুরো পৃথিবীকে নিতে হবে। এই আনইকুয়াল রাইট তো বাংলাদেশ এঞ্জয় করে না।

আরো বড় প্রব্লেম হচ্ছে, অভিজিৎ এমন একটা রাষ্ট্রে এসে এই এডভাইজ করতেছেন যার অর্থনীতি সম্পর্কে তিনি যথেষ্ট জানেন না।

অভিজিৎকে ব্রান্ড হিসেবে প্রমোট করছে ব্রাক। লারজ কর্পোরেশন এবং স্কিন ইন দা গেম ছাড়া নোবেল বিজয়ী খুব ডেডলি কম্বিনেশন। বিট কয়েনের বেশ কয়েকটা বড় কোম্পানি এই ভাবে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের সামনে রেখে তাদের বাবল তৈরি করেছে যার ফলে বিশ্বের লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারি বিভ্রান্ত হয়ে তাদের বিনিয়োগ নষ্ট করেছে। ।
তাই, লারজ কর্পোরেশনের সাথে যখনই নোবেল বিজয়ীয় অর্থনীতিবিদ দেখবেন, তাদের পরামর্শ নিয়ে সতর্ক হবেন। (যদিও আমি মনে করি, এই ক্রাইসিসে ব্র্যাকের রোল খুব পজিটিভ ছিল। ভালো কিছু স্কিম এবং ভালো কিছু স্টাডি করেছে।)

প্রথম সমস্যা হচ্ছে, আমাদের সরকার এর মধ্যেই টাকা ছাপাচ্ছে। ফলে এমনি নাচুনি বুড়ি, তার উপরে নোবেল বিজয়ীর ঢোলের বাড়ি।

উন্নয়নশীল দেশের ফিনান্সিয়াল ক্রাইসিসে, সবার প্রথম যেইটা প্রটেক্ট করতে হবে সেইটা হচ্ছে, কারেন্সি।

যদিও বাংলাদেশের কারেন্সি এখনো খুব শক্তিশালী দেখাচ্ছে কিন্তু, এই শক্তি একটা নড়বড়ে ভিত্তির উপরে দাড়িয়ে আছে। এবং এইটাকে সরকার স্টেরয়েড দিয়ে দাড়ায় রাখছে।

২০১৩ সালকে বেজ ইয়ার ধরলে বাংলাদেশের কারেন্সি ২০১৮ সালেই, ৩৩% অভারভ্যালুড ছিল।(সূত্র ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক ডেভেলপমেন্ট আপডেট ২০১৯) ।
তারপরে ভারত, পাকিস্তান , শ্রীলঙ্কা সহ আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সকল কারেন্সির ব্যাপক পতন হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক, ডলার কিনে কিনে স্টেরয়েড দিয়ে টাকার মান ধরে রেখেছে।

বিভিন্ন দেশের তুলনা করে, বাংলাদেশের শক্তিশালী টাকার মান নিয়ে ন্যাশ্নালিস্টরা অনেক গর্ব করলেও, এইটা একটা ভয়ংকর সিনারিও। বাংলাদেশে কারেন্সি একটা ক্রাশ এন্টিসিপেট করছে।

পাকিস্তানেও নেওয়াজ শরিফের আমলে, পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী এই ভাবে আরটিফিসিয়ালি রুপির মান ধরে রাখার চেষ্টা করেছিল। । তার অবসেশান ছিল, রুপির মান ১০০তে ধরে রাখা। তারপরে তার নিকনেম হয়ে গেলো “১০০ রুপি ইশাক”।

ফলে ইমরান খান ক্ষমতায় এসে যখন কারেন্সি বাজার রেটে রেগুলারাইজ করলো পাকিস্তানের কারেন্সি খুব দ্রুত পতন হয়। এবং তারপরে পাকিস্তানে খুব দ্রুত একটা মূল্যস্ফীতি হয়।
যার ধাক্কায় পাকিস্তানে গত ডিসেম্বার জানুয়ারিতে খাদ্য দ্রবের অফিসিয়াল ইনফ্লেশান ১৫% থেকে ২০% এবং কিছু কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় পন্যের দাম ৩০% থেকে ৪০% বেড়ে যায় কয়েক মাসের ব্যবধানে। যার ফলে দরিদ্র মানুষদের প্রচণ্ড একটা সংকটে পড়তে হয়।

বাংলাদেশের কারেন্সি অনন্ত কাল এই ভাবে আরটিফিসিয়ালি ধরা রাখা যাবেনা।। এর একটা কারেকশন হবেই। এই কারেকশন যখন হবে, তখন এমনিতেইর টাকার মান কমবে। এবং তখন একটা ক্রাইসিস দেখা দেবে।

টাকার মান তিন টা ফরসের খুব ইউনিক ডেলিকেট ব্যাল্যান্স। প্রথমত, রিজার্ভ ও ব্যাল্যান্স অফ পেমেন্ট, দ্বিতীয়ত একটি দেশের মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতি এবং তৃতীয়ত , মানি মার্কেটের চাহিদা এবং জোগান ই।

এই তিনটা ফ্যাক্টরের মধ্যে, আমাদের প্রথম ফ্যাক্টর মানে, রিজার্ভ ও ব্যাল্যান্স অফ পেমেন্টের অবস্থা এতো দিন ভাল ছিল। কিন্তু, কভিড ১৯ এর কারনে এইটা এখন খারাপের দিকে যাবে।

দ্বিতীয়টা মানে মুদ্রাস্ফীতি ও মূল্যস্ফীতির অবস্থা ভালো না। যদিও মানি সাপ্লাই ঋণ প্রবাহ কমে আসার কারনে কমে এসেছে বিস্ময়কোর ভাবে আমাদের মূল্যস্ফীতি যথেষ্ট চড়া এবং অফিসিয়াল মূল্যস্ফীতির সাথে আনঅফিসিয়াল মূল্যস্ফীতির বড় পার্থক্য রয়েছে। প্রকৃত মূল্যস্ফীতির সাথে তাল মিলিয়ে, টাকার মানের আরো পতন হওয়ার কথা কিন্তু সেইটাই আর্টিফিশিয়ালি ধরে রাখা হয়েছে।

এই অবস্থায় অভিজিৎ যে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দিচ্ছেন, এইটা আরো একটা মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি যোগ করবে। কারন, টাকার খোজে দিশেহারা সরকার অভিজিতের পরামর্শের আগেই টাকা ছাপিয়ে তার খরছ সংকুলান করছে।

এবং তৃতীয় ফ্যাক্টরে , ইন রিয়ালিটি বাংলাদেশি কারেন্সির কোন আন্তর্জাতিক চাহিদা নেই। বিশ্বের সকল স্পেকুলেটর জানে, বাংলাদেশের কারেন্সি অভার ভ্যালুড। করোনার আগেই, বাংলাদেশ থেকে বিশাল বড় স্টক একজোডাস হয়েছে, কারন, ইনভেস্টররা একটা ডিভ্যালুয়েশান এন্টিসিপেট করছে।
রিজার্ভ থাকার কারনে, সরকার এই চাহিদা জোগান টা ব্যাল্যান্স করে গ্যাছে। মানটা ধরে রাখা হয়েছে। ২০১৯ সালে, ২.৪ বিলিয়ন ডলারের উপরে ডলার কিনেছে ব্যাঙ্ক গুলোর কাছ থেকে টাকার মান ধরে রাখার জন্যে। একই কাজ ১০০ রুপি ঈশাক ও করতো। ব্যাঙ্ক গুলোকে ডলার সাপ্লাই দিয়ে, আরটিফিসিয়ালি ১০০ রুপি মান ধরে রাখতো।

ব্যাঙ্কগুলোর কাছে এই মুহূর্তে পর্যাপ্ত ডলার নাই।২৩ এপ্রিলে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের রিপোর্টে দেখলাম ডলার সংকটের কারনে কিছু কিছু ব্যাঙ্ক এলসি ওপেন করতে পারছেনা। কভিড-১৯ এর সংকটের পরে প্রতিদ্বন্দ্বী বেশ কিছু দেশ তাদের মুদ্রা আরো ডিভ্যালুশান করেছে। এবং এই অবস্থা আরো দিরঘায়িত হলে এবং আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ গুলো যদি আরো ডিভ্যালু করে তবে আমাদের কারেন্সি আরো শক্ত হবে। এবং যে কোন সময়ে একটা কারেকশন হবে।

ফলে, আমরা বলছি যে, টাকা ছাপিয়ে নয়, এডিপি থেকে সরায় খরচ করেন। এইটা নিয়ে কেঞ্জিয়ানরা যে আপত্তি করেন, তার একটা লম্বা উত্তর আছে। অল্প কথা বলি যে, এডিপির টাকার বড় একটা অংশ বাংলাদেশে অপচয় হয়। এবং এমনিতেই অধিকাংস প্রজেক্ট এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে। । এবং অধিকাংস প্রোজেক্ট বর্তমান অর্থবছরে শেষ পারবেনা কারন লক ডাউন ঈদ সব কিছু মিলে, আমরা বর্ষা সিজনে ঢুকে যাচ্ছি যে সময়ে কন্সট্রাকশান কাজ আর চলবেনা। ফলে, টাকা ছাপানোর কোন দরকার নাই, সরকার চাইলে এডিপির জন্যে বরাদ্দ থেকে নিয়ে খরচ করতে পারে। প্রাসচাত্যের অস্টারিটির রাজনীতির সরাসরি বাংলাদ অনুবাদ সব সময়েই প্রযোজ্য নয়।

কারন, বাংলাদেশ সরকারের অনুন্নয়ন ব্যয়, প্রতি বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২০ অর্থ বছরের বাজেটে অনুন্নয়ন ব্যায়ের পরিমান ৫৯.৫০% যা বছর বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে কোন ধরনের গুনগত মানের উন্নয়ন বাদে কারন এর বড় একটা অংশ অপচয়, লুট এবং দুর্নীতিতে ব্যয় হয়। সরকার চাইলে এর থেকে কাটছাট করে কমাতে পারে, টাকা ছাপানোর প্রয়োজন নেই। এবং করোনাপূর্ব যে মন্দার দেখা দিয়েছিল, তার পেছনে ছিল, ২০১৯ সালের ব্যাপক ট্যাক্স বৃদ্ধির কারনে পন্যের অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি যা রড, সিমেন্ট হতে শুরু করে, অনেক গুলো সেক্টরের ব্যবসায়িরা বলেছেন।

যেখানে কভিড ১৯ এর সংকটের পূর্বেই ওয়েজ এন্ড মিন্স থেকে ধার নিয়ে নতুন টাকা ছাপিয়ে সরকার প্রতি মাসেই খরছ করছে এবং সেখানে নতুন করে দরিদ্রমুখি অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ মত টাকা ছাপিয়ে বিলাতে বলা হচ্ছে, নাচুনী বুড়িকে ঢোলের বাড়ি দেওয়া।

অভিজিৎ ব্যানার্জির দরিদ্র বিমোচনে গবেষণার একজন অনুরাগী হয়েও নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি, বাংলাদেশের অর্থনীতির এই বিষয় গুলো তিনি জানেন না। তিনি নাসিম তালেবের টিপিকাল বোধবুদ্ধিহীন ব্যবসায়ী, ঘিলুতে পদার্থ-হীন পদার্থবিদ এবং অণ্ডকোষ বিহীন জুয়াড়ির মত পরামর্শ দিচ্ছেন।

এইটা খুব ভয়ংকর পরামর্শ যখন আমাদের আরো সহজ ও গ্রহণযোগ্য বিকল্প আছে।



Zia Hassan | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-04-24 12:44:31