এই যে অথর্ব, অপদার্থ দিয়ে একটি দেশ ভর্তি, যেখানে কিছুই হয় না ও কিছুই কাজ করে না- – এএসএম ফখরুল ইসলাম

এই যে অথর্ব, অপদার্থ দিয়ে একটি দেশ ভর্তি, যেখানে কিছুই হয় না ও কিছুই কাজ করে না- আপনার কি ধারণা এটি এমনি এমনি হচ্ছে? নাহ্‌। পৃথিবীতে এমনি বলে কিছু নেই। প্রতিটি বিষয়ের পেছনে যথাযথ কারণ ও ব্যাখ্যা আছে।

এই করোনাভাইরাস পরিস্থিতিটাই ধরুন। এই ধরণের পরিস্থিতিতে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল কি, স্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর কি- বাংলাদেশে জন্মানো ও বেড়ে ওঠা কেউ এগুলো জানার প্রশ্নই ওঠে না। এগুলো জানে আমাদের মত যারা দেশের বাইরে দীর্ঘদিন পড়াশোনা ও কাজকর্ম করেছে তাঁরা। তার প্রমাণ হচ্ছে, বাংলাদেশে সামান্য একটা মেশিন কিনলেও সেটা চালানোর জন্য বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ ধরে নিয়ে আসতে হয় কিংবা আমাদের “বিশেষজ্ঞ”দের বিদেশে দৌড়াতে হয়।

আমার ইউনিভার্সিটিতে করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে সে বিষয়ে আগামী এক মাসের পরিকল্পনা করা হয়ে গেছে। প্রিটি শ্যুর এটা আমেরিকা সব প্রতিষ্ঠানেই করা হয়ে গেছে। এখানে সব প্রতিষ্ঠান ও ডিপার্টমেন্ট একটি আরেকটির সাথে কোঅর্ডিনেশান করে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা তাঁদের গবেষণা করছে, সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেখানে প্রয়োজন সেখানে বিজ্ঞানীদের ডাকছে, সবাই মিলেমিশে কাজ করছে, সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এদেশে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি ডিপার্টোমেন্টের প্রতিটি প্রফেসার যে পরিমাণ কোলাবোরেশানে কাজ করে বাংলাদেশের পুরো রাষ্ট্র এরকম গুছিয়ে একটা কোলাবোরেশান কখনো করেছে কিনা সন্দেহ। হ্যাঁ, একটা গোটা রাষ্ট্রকে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসারের সাথে তুলনা করলাম। লজ্জা হওয়া উচিত!

এই দেশে প্রতিটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেই এরিয়ার এক্সপার্টের সাথে সলাপরামর্শ করে। রিয়েল এক্সপার্ট। ডিগ্রীধারী অথর্ব এক্সপার্ট না।

যেমন, আমার ইউনিভার্সিটিতে এক মাস পর্যন্ত কর্মপরিকল্পনা যে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছে? আমি এর সঠিক উত্তর জানি না, কিন্তু বলে দিতে পারি বিশেষজ্ঞনের পরামর্শ অনুযায়ী ও নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনেই সেটা করা হয়েছে। এখানে প্রটোকল/নিয়মের বাইরে গাছের পাতাও নড়ে না।

আমার স্টেইটে কতজন করোনাভাইরাস আক্রান্ত হয়েছে, তাঁদের অবস্থান কোথায়, তাঁদের সাথে কতজনের কন্ট্যাক্ট হয়েছে সবকিছু নিশ্চয় হিসাব করা হয়ে গেছে। করোনাভাইরাস কি হারে ছড়িয়ে কবে কোন অবস্থায় গিয়ে পৌঁছুবে এগুলো প্রেডিক্ট করার জন্য বিজ্ঞানীদের কাছে মডেল আছে। এসব মডেল বেশ রিলায়েবলি প্রেডিক্ট করতে পারে। একজন গবেষক হিসেবে আমাকেও প্রচুর মডেলিং করতে হয়। সুতরাং কিছুটা জানি।

একটা মজার জিনিস লক্ষ্য করেছি, মাঝেমধ্যে এমন হয়, সাগরে নিম্নচাপ শুরু হবার পর আকাশে কাঠফাটা রোদ সত্ত্বেও ইউনিভার্সিটি সপ্তাহখানেক আগেই সপ্তাহখানেক পরের কোনো দুই দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা হয়ে যায় (আনলাইক বাংলাদেশ, এখানে অকারণে একটা ক্লাসও মিস হয় না, আবার যথাযথ কারণ দেখা দিলে ক্লাস বাতিল করতেও কার্পণ্য করা হয় না)। এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করি, ঠিক ঠিক বন্ধের সময় ঘনিয়ে আসতেই আকাশ কালো হয়ে ঝড়বৃষ্টিও শুরু হয়ে যায়। উইচ রিমাইন্ডস মি দ্যাট “Any sufficiently advanced technology is indistinguishable from magic.”

তার মানে, বিজ্ঞানীরা মডেল ব্যবহার করে ওয়েল এহেড অব টাইম ও রিলায়েবলি ওয়েদার ফোরকাস্ট করতে পারে।

তো, এই যে মডেলিং করা, প্রেডিক্ট করা, গবেষণা করা, কাজ করা- এগুলো এদেশে কারা করছে? আমরাই তো করছি। আমার মত কোনো বাংলাদেশি বা ইন্ডিয়ান বা আমেরিকান করছে। আমেরিকার এই ওয়ার্কফোর্সের বড় একটি অংশ ইমিগ্র্যান্ট। বাংলাদেশিও। আমরা এই দেশে এসে পড়াশোনা করে কাজ শিখে আবার এই দেশেই সেই ট্রেনিং কাজে লাগাই। কিন্তু আমরা এখানে যা শিখছি সেগুলো এই দেশে যেভাবে কাজে লাগাচ্ছি সেটা কি বাংলাদেশে গিয়ে লাগাতে পারবো? আমাদের কি লাগাতে দেয়া হবে? নাকি উল্টা আমাদের উপুত করে লাগানো হবে?

বাংলাদেশে সাফল্যের একমাত্র ও একমাত্র পূর্বশর্ত তাঁবেদারি। মোর অ্যাকুরেটলি, বাংলাদেশে ব্যর্থ না হবার একমাত্র পূর্বশর্ত তাঁবেদারী। স্বভাবতই, এই দেশে আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত প্রতিটি পদ, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান অথর্ব লোকজন দিয়ে ভর্তি। এখানে যোগ্য লোকেরা ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে, অথবা তেলবাজি ও গ্রুপিং করতে না পারার দরুণ কোণঠাসা হয়ে থাকে।

অন্যদিকে, যারা এসব কিছুতে নাই, নিজের মত পড়াশোনা আর কাজকর্ম নিয়ে আছে, কখনো দেশের বাইরে পা রাখে নি, সভ্য দেশ থেকে পড়াশোনা করে আসে নি, দীর্ঘদিন সেসব দেশে বসবাস করে কাজ শিখে আসে নি, এসব তথাকথিত এক্সপার্টদের যেহেতু কোনো ধারণাই নেই সভ্যতা কি ও কিভাবে কাজ করে, সুতরাং এই এক্সপার্টরা জাতে গুন্ডা না হলেও কাজে ঠনঠন। এরা মুখস্থ করে খাতায় নাম্বার তুলেছে কেবল। যোগ্যতা বলতে এদেরও কিছু নেই। সুতরাং এদের সবার সমন্বয়ে দেশ যেমন চলার কথা তেমনই চলছে।

কিন্তু এই অপদার্থদের (এটা গালি না, বর্ণনা) জায়গায় উন্নত দেশ থেকে শিক্ষা ও কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে আসা লোকেরা কাজ করলে কি দেশের এ অবস্থা থাকতো? কথায় কথায় এ দেশের “বিশেষজ্ঞ”দের ট্রেনিং নেয়ার জন্য কি তখন বিদেশে দৌড়ানো লাগতো?

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে করণীয় কি, কিভাবে স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকল মানতে হয়, কিভাবে কোয়ারেন্টিন করতে হয়, কিভাবে মডেলিং করতে হয়, কিভাবে ব্যবস্থা নিতে হয় এগুলো জানা লোকেরাই তো তখন সব ধরণের সিদ্ধান্ত নিতো। এই লোকগুলোই তো বিশ্বের সেরা দেশগুলোতে বছরের পর বছর ধরে কাজ করে এসেছে, সেসব দেশ চালিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি পদে, প্রতিটি স্তরে এ ধরণের লোকজন বসে থাকলে দেশের অবস্থা কেমন হতো ভাবতে পারেন?

দুই দিন আগেও যেমন বলেছি, সভ্যতার এসব বর্ণনা আপনারা পড়েনই কেবল। রিলেট করতে পারেন না। কারণ আপনারা সভ্যতা এক্সপেরিয়েন্স করেন নি। সুতরাং সভ্য দেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা এক্সপার্টদের দিয়ে দেশের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান চালালে কি কি হওয়া সম্ভব আপনারা সেটা ধারণা করতে পারছেন না। এসব দেশে বছরের পর বছর ধরে আমাদের যা শেখানো হয় তার ৫০%ও যদি আমরা দেশে গিয়ে কাজে লাগাতে পারি, আমাদের প্রতিটি পিয়ার যদি গুন্ডা, দলদাস, তাঁবেদার কিংবা বিষয়জ্ঞানহীন ভালো ছাত্র না হয়ে উপযুক্ত ট্রেনিং ও শিক্ষা পাওয়া বিদেশফেরত এক্সপার্ট হতো, তাহলে এতদিনে বাংলাদেশ আমেরিকা না হলেও অন্তত বাংলাদেশ হয়ে থাকতো না। কিন্তু সেটা তো সম্ভব না। কারণ সোলায়মান সুখন, আরিফ আর হোসেনরা বলে দিয়েছে, “দেশও আমার, দোষও আমার।”

Asm Fakhrul Islam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-03-13 12:08:36