আপনারা যারা শেখ মুজিবকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নায়ক মনে করেন – করে "য়া – ফাহাম আব্দুস সালাম

আপনারা যারা শেখ মুজিবকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি নায়ক মনে করেন – করে “য়া মুজিবু, য়া মুজিবু” বা বাংলায় “হে পিতা, হে পিতা” জিকির করেন তাদের irrational exuberance আমার খুবই কিউট লাগে। মাঝে মাঝে দুর্বল মুহূর্তে অশিক্ষিত বেকুবদের প্রতি আমি করুণা বোধ করি নি – এমন দাবী করি নি কখনো।

মানুষ কেন হিরো ওয়ারশীপ করে – আপনারা বোঝেনই না তার মনস্তত্ত্ব ও ইতিহাস। আর একটা সাধারণ জিনিস বোঝেন না আপনারা। আপনার ছেলে কিংবা আপনার নাতি, আপনার মতো করে ভাবতে না পারার মধ্যে কোনো অপরাধ কিংবা গ্লানি দেখতে পাবে না।

আমার মাঝে তিল পরিমাণ সন্দেহ নাই যে শেখ মুজিব নায়ক হিসাবে ঠিকবেন না। হয়তো আমার জীবদ্দশাতেই তিনি হিরো হিসাবে টিকতে পারবেন না। এর কারণ বিএনপি-জামাত না ভাইয়েরা আমার, আওয়ামী লীগও না – তিনি নিজে।

আপনি মানব জাতির ইতিহাসে একজন নায়ক খুঁজে বের করতে পারবেন না যাকে মানুষ পাঁচশ বছর ধরে হিরো ওয়ারশীপ করেছে অথচ মানুষটা ছিলো রেলেটিভিস্ট। ইট জাস্ট নেভার হ্যাপেন্স। হিরোরা কখনোই রেলেটিভিস্ট হয় না – সেজন্যেই তারা হিরো। আপনি পৌরাণিক হিরোদেরও দেখতে পারেন। আপনি পৃথিবীর ইতিহাসে একজনও ব্যবসায়ী হিরো খুঁজে পাবেন না কারণ ব্যবসায়ীরা বাই ডেফিনিশন, রেলেটিভিস্ট হয়।

একটা মানুষ মরে যাওয়ার পাঁচশো বছর পরে শুধুমাত্র তখনই হিরো হিসাবে থেকে যায়, যখন এই মানুষটা সেই জনগোষ্ঠীর যেই মেটাফিজিকাল ড্রীম, সেই ড্রীমে অংশ নিতে পারে। মানুষ শুধুমাত্র, আবারো বলছি শুধুমাত্র এবসোলিউটিস্টদের এই মেটাফিজিকাল ড্রীমে জায়গা দেয়। একটা জাতি শত শত বছর ধরে একই মেটাফিজিকাল ড্রীম দেখতে থাকে। সেখানে একজন রেলেটিভিস্টকে জায়গা দেয়ার মানে হোলো স্বপ্নটাকে ডিজরাপ্ট করা – এই সামান্য কাণ্ডজ্ঞান কি আপনাদের আছে?

মুসলমানদের যে মেটাফিজিকাল ড্রীম – দেখবেন সেইখানে উসমানের কোনো উল্লেখ নাই। তিনি কিন্তু অসম্ভব সাকসেসফুল রুলার – কিন্তু তিনি মুসলমানদের ইমাজিনেশানে জায়গা করতে পারেন নাই। কারণ মুসলমানরা তাকে রেলেটিভিস্ট হিসাবে দেখেছে (কেন দেখেছে সেই আলাপ ভিন্ন)। তাকে হত্যা করা হয়েছিলো, আবার উমরকেও হত্যা করা হয়েছিলো। উমরকে মুসলমানরা আজো হিরো মনে করে, কারণ উমরকে মুসলমানরা রেলেটিভিস্ট মনে করে না। এই পার্থক্যটা মনে রাখবেন। এডমিরাল হোরেশিয়ো নেলসন ব্রিটিশদের হিরো – কারণ তিনি ব্রিটিশদের চোখে এবসোলিউটিস্ট এবং অবশ্যই তাদের মেটাফিজিকাল ড্রীমের নায়ক। প্লেটো মানুষের এই মনস্তত্ত্বটা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি যে অর্থে form (eidos) শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন এবং যে কারণে তার বিখ্যাত কেইভ এলেগোরিটা দিয়েছিলেন – আমার মনে হয় তিনি রেলেটিভিস্টদের eidos এর মধ্যে জায়গা দেন নাই এ কারণেই (এই লম্বা আলাপ অন্য কোথাও করা যাবে)।

শেখ মুজিব কোনোদিনও বাঙালি জনগোষ্ঠীর যে মেটাফিজিকাল ড্রীম – সেখানে জায়গা নিতে পারবেন না। তার কারণ তিনি নিজে। যে গণতন্ত্রের জন্যে শেখ মুজিব সারা জীবন সংগ্রাম করেছিলেন সেই গণতন্ত্র তিনি নিজের হাতে হত্যা করেছিলেন ক্ষমতায় গিয়ে – এই একটি বাক্য মানুষ যতোদিন মনে রাখবে – ততোদিন শেখ মুজিব পাদটীকা হয়েই থাকবেন। তিনি যে রেলেটিভিস্ট ছিলেন তার দলিল তিনি নিজেই লিখে গিয়েছেন পাতায় পাতায় – তার আত্মজীবনীতে।

আপনারা যারা মুজিববর্ষ বানিয়ে কিছু টাকা চুরি করছেন – করতে থাকুন। এতে শেখ মুজিবের লাভ-ক্ষতি কিছুই হবে না (যদিও হে পিতা-গোষ্ঠী দশ বছর পর এমন একটা ভাব করবে যেন শুধুমাত্র মুজিববর্ষ করার কারণেই শেখ মুজিবকে নিয়ে মানুষ হাসি তামাশা করছে)। দেখেন বাঙালি উত্তেজিত হয়ে গেলে সাথে সাথেই কিছু করতে চাঙ্গা হয়ে যায় – শিশুরা পাদ দিলে যেমন কেঁপে ওঠে। যেহেতু বাঙালির বুদ্ধি কম এবং তার চেয়েও কম হলো কল্পনা – সে “মুজিববর্ষ” করার মধ্যে খুব বড় কিছু হয়ে গেলো মনে করছে। গাণ্ডুরা এভাবেই চিন্তা করে। আসলে যে গাণ্ডুদের প্রায় যেকোনো কাজই মূল cause এর ক্ষতি করে, এটা বোঝে না দেখেই তো সে গাণ্ডু। আপনারা বরং চুরিই করুন। সেটাই হয়তো ভালো।

মুজিববর্ষ করেন বা না করেন – শেখ মুজিব ইরেলেভেন্ট হয়ে যাবেন। পৃথিবীতে সামান্য কিছু হিরো একটা জাতির মেটাফিজিকাল ড্রীমে জায়গা পান – বাকীদের জায়গা হয় শুধুমাত্র উইকিপিডিয়ায়।

হিরোয়িক জার্নি – সহজ না।

Faham Abdus Salam | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-03-17 09:43:34