মিয়া স্মরণে – কায়কাউস

মিয়া স্মরণে
======
০১.
“… কয়েকদিন আগের ঘটনা। কথা নেই, বার্তা নেই, ওয়াজেদ মিয়া হঠাৎ গিয়ে হাজির বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বৃদ্ধা মাতার বাসা দিনাজপুরে। সঙ্গে ক্যামেরাম্যান। কারণ কি? ওয়াজেদ মিয়ার বায়না ছবি তুলবেন বেগম জিয়ার মা'র সাথে।

এর মাস কয়েক আগের ঘটনা। ওয়াজেদ মিয়া তখন সরকারী চাকরিতে। এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে ঘরের কথা টেনে আনলেন বাইরে। স্ত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন, 'যার চুল বাঁধতে লাগে তিন ঘন্টা, সে আবার দেশ চালাবে কি'? ইত্যাদি। এরপর বললেন কঠিন সত্য : 'এদেশ এখন বসবাসের অযোগ্য। তিনি দেশ ছেড়ে চলে যাবেন।'

শেষপর্যন্ত ওয়াজেদ মিয়া ঘরও ছাড়েননি, দেশও ছাড়েননি কিন্তু খেসারত দিতে হয়েছে স্ত্রী সম্পর্কে নাজায়েজ মন্তব্য করার জন্য। কারণে-অকারণে অবসরপ্রাপ্ত কত সরকারী কর্মকর্তা চাকরিতে এক্সটেনশন পেলেন কিন্তু ওয়াজেদ মিয়ার আর্জি শেখ হাসিনার দিলে এতটুকু রহম সৃষ্টি করতে পারেনি। এবারের অপরাধে অর্থাৎ বেগম জিয়ার বৃদ্ধ মায়ের সঙ্গে ছবি তোলার খায়েশের জন্য ওয়াজেদ মিয়ার কপালে কি আছে, তা উপর ওয়ালাই জানেন॥”

— সংঘাতের রাজনীতি / আমানুল্লাহ কবীর ॥ [ জ্ঞান বিতরণী – ফেব্রুয়ারি, ২০০৫ । পৃ: ১৩৯ ]

০২.
“… আমাকে তো কেউ তেমন কিছু জানালো না। আমিতো তাঁকে (হাসিনা) আর মাশরুরকে (জামাতা) জিজ্ঞেস করলাম সবাই মিলে ঘটা করে লন্ডন যাওয়া কেন? পত্র পত্রিকায় দেখলাম। কিছুটা আন্দাজও করেছি। ছেলে বড় হয়েছে। পছন্দ মতো মেয়েকে বিয়ে করবে এটাইতো স্বাভাবিক॥”

— ড: ওয়াজেদ মিয়া (দিনকাল – ০৭ জুলাই, '৯৯)

তথ্যসূত্র: কাজী সিরাজ / দু:শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই ॥ [ গ্রন্থকানন – সেপ্টেম্বর – ২০০১ । পৃ; ৫৪১ ]

০৩.
“… প্রকান্ড যে সফরসঙ্গী দল নিয়ে শেখ হাসিনা ওয়াজেদ লন্ডনে এসেছিলেন তাতে তার স্বামী ড: ওয়াজেদ মিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। এক কালে প্রবচন ছিলো 'পথি নারী পরিত্যাজ্য'। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বোধ হয় 'পথি স্বামী পরিত্যাজ্য' বাক্যাংশকেই প্রবচনে পরিণত করতে চাইছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু দিনে এদেশী সাংবাদিক মহলে বেশ কিছু আগ্রহ দেখা গেছে প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিত স্বামীকে নিয়েই। কোন কোন বৃটিশ পত্রিকা ফলাও করে খবর ছেপেছে যে, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন থেকে পারমাণবিক শক্তি কমিশন পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত একটা যাত্রার জন্যেও তাকে গাড়ী ব্যবহার করতে দেওয়া হয়নি বলে রাগের মাথায় তিনি দন্ডায়মান প্রধানমন্ত্রীর সরকারী গাড়ীতে লাথি মেরেছিলেন আর তাতে গাড়ীর হেডলাইট ভেঙ্গে গিয়েছিল।

এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। বাংলাদেশ পারমাণবিক শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড: ওয়াজেদ মিয়া দু:খ করে একটি বৃটিশ পত্রিকার সংবাদদাতাকে প্রধানমন্ত্রীর আজ্ঞাবহদের হাতে তার বহু হেনস্থা ও অপমানের কাহিনী বর্ণনা করেন। তিনি বলেন যে, একদিন প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে এসে দেখতে পান যে কিছু সংখ্যক দূর্বৃত্ত তার জন্য নির্ধারিত ঘরটি দখল করে আছে, তাই তাকে সে বাসভবন থেকে বেরিয়ে যেতে হয়। এখন আবার (২৭শে জুলাই) 'গার্ডিয়ান' পত্রিকার সাময়িকীর দেড় পাতা জুড়ে বাংলাদেশের প্রথম দম্পতির কান্ডকারখানা নিয়ে রসালো এক কাহিনী ছাপা হযেছে। এ প্রবন্ধে ড: ওয়াজেদ মিয়ার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে এই মর্মে যে, সাজগোজের সময় এক ঘন্টার মধ্যে সীমিত রাখা আর জি-টিভির অনুষ্ঠান দেখা কমিয়ে কিছু পড়াশুনা করার পরামর্শ দিয়ে তিনি স্ত্রীর বিরাগভাজন হয়েছেন।

ড: ওয়াজেদ মিয়ার একটি বিবৃতি জুন মাসের মাঝামাঝি কোন কোন বিদেশী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। এতে তিনি তার স্ত্রীর সমালোচনা করে বলেন যে, শেখ হাসিনা অর্ধ শিক্ষিতের মতো আচরণ করেন, তিনি কারো, এমনকি স্বামীরও, কোন পরামর্শ মেনে চলেন না। ড: ওয়াজেদ মিয়া মন্তব্য করেন যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী হবার যোগ্যতা তার স্ত্রীর নেই। কতগুলো 'সম্মানসূচক' ডিগ্রী নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আত্মম্ভরিতারও তিনি সমালোচনা করেন। আরো সম্প্রতি কোন কোন পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ড: ওয়াজেদ মিয়া নাকি বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রীর অনুগ্রহ পাবার আশায় জনৈক আমলা মন্ত্রী বিভিন্ন ডিগ্রি কিনে এনে প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিচ্ছেন॥”

— সিরাজুর রহমান (প্রখ্যাত সাংবাদিক, বিবিসি বাংলা বিভাগের প্রাক্তন পরিচালক) / ইতিহাস কথা কয় ও নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ ॥ [ শিকড় – ফেব্রুয়ারী, ২০০২ । পৃ: ১৬২-১৬৩ ]

০৪.
“… অন্যদিকে তোর বোনকে (কাদের সিদ্দিকী ও হাসিনাকে ব্যঙ্গ করে – KK) বৃত্ত করে যারা বিচরণ করছে, নেতা-কর্মী মহলে তাদের তেমন সুনাম বা মর্যাদা নেই। তোর বোন আমার সঙ্গে এমনিতে ভাল ব্যবহার করলেও আমার প্রতি তার একটা শৈত্যভাব লক্ষ্য করি। তার আশপাশের লোকদের সম্পর্কে আমার মতামত তার কাছে তেমন গ্রহণীয় নয়। অগ্রহণীয় হওয়ারও যথেষ্ট কারণ আছে। ভাল কেউ যদি পাশে না থাকে, তাহলে সে কী করতে পারে, তাকে তো কাজ করতে হবে।

… আমার সবচেয়ে বড় ভয় অন্য জায়গায়। ড: ওয়াজেদ আমাদের পিতার দ্বিতীয় সংস্করন — শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়া। বাবার সঙ্গে অমিলও যথেষ্ট। বাবা আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর নন, ড: ওয়াজেদ এগুলোর ডিপো। “হাসু” দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে সর্বদা অবহেলা-অবজ্ঞায় নিগৃহীত। অন্ধকার জীবন থেকে হঠাৎ আলোর পৃথিবীতে এসে চোখ ধাঁধাঁনোতে বিপথে চালিত হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আলামতও ইতোমধ্যে স্পষ্টত: দৃশ্যমান।

… সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয়, শেখ পরিবারের আত্মীয়রা আওয়ামী লীগকে 'হরিলুটের বাতাসা' মনে করছে। লক্ষণ অতিশয় খারাপ॥”

[ প্রতি : কাদের সিদ্দিকী / পৃ: ৩৫৪-৩৫৬ / ১৬.০৬.১৯৮১ ]

— আবদুল লতিফ সিদ্দিকী / নির্বাসিতের জার্নাল ॥ [ নান্দনিক – ফেব্রুয়ারী, ২০০৯ ]

০৫.
“… হাসিনার সঙ্গে মিন্টো রোডে আরেকবার আমার দেখা হয়, কয়েকজন কবিকে যখন ডেকেছিলেন দুপুরের খাবার খেতে। শামসুর রহমান, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চৌধুরী আর আমি। হাসিনা অনেকক্ষণ তার স্বামীর কথা বললেন, স্বামীটি যে কী নচ্ছার, তারই নিঁখুত বর্ণনা। স্বামী ওয়াজেদ মিয়া নাকি ফাঁক পেলেই খালেদা জিয়াকে ফোন করে রসের গপ্প মারেন। রাজনীতি বা সাহিত্য নিয়ে গভীর আলোচনায় হাসিনা যাননি। খাওয়া দাওয়া ঘর সংসার এসব বিষয় নিয়ে বেশির ভাগ সময় একাই কথা বলেছেন। আমি চুপচাপ বসে দেখছিলাম শেখ হাসিনাকে, তার কথাবার্তা আমাকে মোটেও মুগ্ধ করেনি॥”

— তসলিমা নাসরিন / কথা ক বকুলি ॥ [ চারদিক – সেপ্টেম্বর, ২০০৩ । পৃ: ২৫৫ ]

কায় কাউস কাউস | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-05-09 14:12:33