Zia Hassan এর জবাবের প্রেক্ষিতে আমার দ্বিতীয় উত্তরঃ – পিনাকি ভট্টাচার্য

Zia Hassan এর জবাবের প্রেক্ষিতে আমার দ্বিতীয় উত্তরঃ

জিয়া হাসানের সাথে আমার পুরো আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনীতির প্রধান অন্তরায় কী?

আমি পরিষ্কার করে বলেছি এটা ব্যক্তিগতভাবে আপনার সাথে আমার বিরোধের জায়গা নয়। আপনার নিজের প্রসঙ্গ তোলার প্রয়োজন নাই। আপনি যাদেরকে এই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি মনে করছেন আমি তাদেরকে নিয়ে আলোচনা করেছি। আপনি এই রাজনৈতিক বিতর্কে নিছকই আপনার আর আমার মল্লযুদ্ধে পরিণত করতে চাইছেন। এটা আনপ্রডাক্টিভ এবং আপনার-আমার উভয়েরই সময়ের অপচয়। তবু আমি ধৈর্য ধরে আপনার সাথে এই আলোচনাটা চালিয়ে যাচ্ছি, কারণ প্রসঙ্গটা যখন উঠেছে তখন এর অন্তত একটা ফায়সালা আমাকে করতে হবে। আমি দীর্ঘ লেখা লিখতে স্বচ্ছন্দ বোধ করিনা। আমার পাঠকেরা এই দীর্ঘ লেখার জন্য আমাকে ক্ষমা করবেন।

হয়তো আপনার আগে চোখে পড়েনি জন্যই আমি আবারো স্পস্ট করে বলে নিতে চাই যে শাহবাগে অংশ নেয়া আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ছিলোনা। এটা ছিলো সিপিবির সিদ্ধান্ত। আপনি সিপিবি কেমন সংগঠন জানেন না জন্যই বলতে হচ্ছে, সিপিবির মেম্বারদের প্রেম, বিয়ে, লেখালেখি, বাবা মায়ের সাথে দেখা করার সময়, প্রেমিকার সাথে ডেটিং, কত টাকা আপনার নিজের জন্য খরচ করবেন সব কিছুই পার্টি ঠিক করে দেয়। অন্তত আমাদের সময় দিতো। আপনি আজকের বাকি বিল্লাহ মার্কা সিপিবিদের দেখে সিপিবি চিনিয়েন না। আমাদের প্রজন্মের কাউকে ঘনিষ্ঠভাবে দেখলে বা জানলে বুঝতে পারতেন। আপনি আমাদের প্রজন্মের সিপিবি হয়তো দেখেন নাই। তাই আপনার মতো ব্যক্তিগত ভাবে শাহবাগে যাওয়া বা না যাওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার লাক্সারি আমার ছিলোনা। সিপিবির মতো ক্যাডারভিত্তিক আদর্শিক পার্টির কতৃত্বের কাছে স্বেচ্ছা সমর্পণ থেকে বেরিয়ে আসাটা কারো পক্ষেই খুব সহজ কাজ নয়। আপনি আমার প্রজন্মের সিপিবি দেখে না থাকলেও জামায়াত থেকে বেরিয়া আসা কারো সাথে কথা বলে দেখেন। একই ফিডব্যাক পাবেন বলে আমার বিশ্বাস।

এই আলাপটা করে রাখলাম; কারণ আপনার অধিকাংশ অনুমান যার উপরে দাড়িয়ে সেইখানে একজন সিপিবির সক্রিয় সদস্য কী আচরণ করতে পারে সেটা না জানা থেকেই উৎসরিত হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস।

আবার আসেন আপনার উত্থাপিত আলোচনায়। আমাকে একটু পেছনে যেতে হচ্ছে যেইখানে আপনি ত্তত্বায়িত করেছিলেন, “বাংলাদেশে বামপন্থীরা এদেশের রাজনীতির মরাল কম্পাস!” আমি গত সাত বছর আপ্রাণ লড়াই করে দেখাতে চেষ্টা করছি বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদের কলকব্জা, ইন্টেলেকচুয়াল ফাউন্ডেশন এবং আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ন্যারেটিভ প্রডিউস করেছে এবং করছে প্রধানত বামপন্থীরাই। বাংলাদেশের হিস্ট্রিতে এইটা কন্সিসটেন্টলি দেখা গেছে এবং এখনও তাই চলছে। কষ্ট হলেও আপনাকে এইখানেই আলোচনায় এনগেজ হতে হবে।

আপনি এই মরাল কম্পাস তত্ত্ব অটুট রাইখা শাহবাগের পক্ষে লিখেছেন, কিন্তু একই সাথে হেফাজতের জন্য যৎসামান্য মানবিক সমবেদনাও বরাদ্দ রাখছিলেন। দুঃখজনকভাবে এখনো ফ্যাসিবাদের কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিকে মরাল লিডারশিপ দিয়ে লেজিটিমাইজ করে যাচ্ছেন। যেই মনোবৃত্তি, দৃষ্টিভঙ্গি এবং সংস্কৃতি এই মানুষগুলোকে রাজনৈতিক শত্রু বানায় সেই প্রকল্পের বিরুদ্ধে আপনার অবস্থানটা কি? অবস্থান স্পষ্ট থাকলে আপনি দুই দিকে গোল দেওয়ার মত এত সুন্দর অ্যাক্রোবেটিক হিরোইজমের গল্প বলতেন না। কী আশ্চর্য এই ভয়ানক ঘৃণাজীবিদেরকেই মরাল কম্পাস হিসেবে প্রচার করতে আপনি এখনো ব্যস্ত আছেন। আমি স্পস্ট করে বলতে চাই, আপনার এই অবস্থান কন্ট্রাডিক্টরি এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী ঐক্য ও সংগ্রামের জন্য ক্ষতিকর।

সরি জিয়া, আমি ফ্যাসিবাদের কেল্লায় বসে সমবেদনা জানানোর রাজনীতি করি নাই। আমার আত্মজিজ্ঞাসা দিয়া আমি সেই ফ্যাসিবাদী রাজনীতির সঙ্গ ত্যাগ করছি। আমি পরিষ্কার করে আমার অবস্থান বদলাইছি।

আমি সেই কেল্লায় আগুন ধরাইয়া দেওয়ার জন্য বাইরে চলে আসছি। আমি আমার তিরিশ বছরের জীবন, আমারে যারা তৈরি করছে সেই সিপিবি, আমার পরিবারের সাথে সিপিবির ঐতিহাসিক সম্পর্ক, আমার রাজনৈতিক বন্ধু, আমার ক্যারিয়ার, নিরাপদ জীবন সবকিছু ত্যাগ করে আসছি। কারণ আমি জানি ওই কেল্লায় আগুন ধরায়ে না দিলে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি নাই। ঢাকায় আইস্যা যখন তারা মাসল ফ্লেক্স করার শক্তি রাখছিলো তখন না আমি তাদের পরাজয়ের সময় তাদের বিপযর্স্ত হওয়ার সময়ে তাদের পাশে আইস্যা দাড়াইছি। সেই দাড়ানো কেমনে সুবিধাবাদি পজিশন হয় আমার মাথায় আসেনা।

আমার আলোচনার ভারকেন্দ্র ছিল বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় কি এবং সে ক্ষেত্রে কাদের ভূমিকা আমি সমস্যা বলে মনে করি। অথচ আলোচনার এই ফোকাসটাকে বিচ্যুত করে পুরো আলোচনাকে আপনি শাহবাগের সময়ে আমি এবং আপনি কিভাবে এক্ট করেছি তারমধ্যে রিডিউস করেছেন। এইটা আপনার জন্য মোক্ষম কৌশল, কারণ এইভাবে আপনি আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চাইছেন। এবং এটার মাধ্যমে বাংলাদেশে বামপন্থীদের আমার বিরুদ্ধে প্রধান আক্রোশটাকে খুব আকর্ষণীয় করে হাজির করেছেন। এইটা রেটরিক মুভ, আ বিট ইমোশনাল কিন্তু এইটায় পলিটিকাল কোন সাবস্টেন্স নাই।

যদি সিরিয়াস এবং সিনসিয়ার হন তাহলে আপনার প্রথম জিজ্ঞাসা হওয়া উচিত বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বহাল রাখার রাজনৈতিক শর্তগুলা কি কী? এর সামনের ও পেছনের শক্তিগুলো কারা? কারা এটাকে আওয়ামী লীগের দুর্দিনে টিকিয়ে রাখে? আমি সিপিবি করছি আপনি করেন নাই। আমি জানি কীভাবে কোন তরিকায় ১৯৭৫ এর পরে বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগ সিপিবিকে আশ্রয় কইর‍্যা উঠে দাড়াইছে। আপনি কইছেন সিপিবিরে তো আমিও গাইলাই। হাসাইয়ান না জিয়া। সিপিবি বলতে আমি শুধু আজকের ভঙ্গুর সিপিবি নামের রাজনৈতিক দলটাকে বুঝাই না। বুঝাই সিপিবির তৈরি কালচারাল হেজিমনিকে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামবিদ্বেষ যেভাবে ক্রিয়াশীল আছে তার সাথে বামপন্থার সম্পর্ক ও দায় নিয়ে বামপন্থীরা আজ পর্যন্ত কোন আন্তরিক পর্যালোচনা ও পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে?

ফ্যাসিবাদের উদয় আর অবসান শাহবাগেই ঘটে নাই। তার আগের ইতিহাস আছে, বাকশাল আছে, শাহবাগ পরবর্তীতে গত ৭ বছরের অবর্ণনীয় ফ্যাসিবাদী শাসনের বিভীষিকা আছে। আমি তার লিগ্যাসি, পরম্পরা, ধারাবাহিকতা কিভাবে কাজ করে সেই পলিটিক্যাল এন্টারপ্রাইজ এবং হিস্টোরিক্যাল ন্যারেটিভের কথা বলছি। এইটা বোঝার মত যথেষ্ট বুদ্ধি আপনার আছে, কিন্তু জিয়া, আপনি পুরো আলোচনাটাকে তর্কে জেতার ইচ্ছায় শাহবাগে রিডিয়ুস করতে আরাম বোধ করেছেন; মূলত আমাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানোর কৌশল হিসেবে। এটা দুঃখজনক।

আপনার পুরো আলোচনার সিদ্ধান্তটা একবাক্যে বলে দেওয়া যায়: জিয়া হাসান শাহবাগ কালের হিরো আর পিনাকী ভট্টাচার্য হচ্ছে ভিলেন।

আপনি বলতে চাইতেছেন, শাহবাগ নিয়ে আমার কোনো রিভিউ নাই! শাহবাগের আমার অবস্থান আমি যথাস্থানে রাইখা গত সাত বছর এর বিরোধিতা করতেছি। তাই আমি কারো কাছে ঐতিহাসিক দায়মোচন কিংবা নিদেনপক্ষে একটা অনেস্ট একনলেজমেন্ট দাবি করতে পারিনা। এইসব প্রশ্নের সুরাহা করার দাবি তুলতে পারবো না। সবচেয়ে হাস্যকর এবং মিথ্যা দাবিটি করেছেন যে, আমি আমার অবস্থান পাল্টিয়েছি একটা সুবিধাজনক সময়ে।তাই নাকি জিয়া!?

শাহবাগের রাজনীতি যখন তুঙ্গে, রাষ্ট্র যখন সর্বগ্রাসী সন্ত্রাসী শক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাপলাতে গণহত্যা সংঘটিত করেছে, হাসিনা যখন তার বিরোধীতাকে প্রায় নিস্তব্ধ করে দিতে চাইছে, সেই সময় থেকে আমি শাহবাগের সমস্যা এবং ফ্যাসিবাদী চিন্তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। গত ৭ বছর আমি নিরবিচ্ছিন্নভাবে এবং কন্সিস্টেন্টলি এর বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছি। ফ্যাসিবাদ যখন তুমুল শক্তিশালী, আরো বেশী আগ্রাসী হয়েছে তখন তার বিরুদ্ধে লড়াই চালানো, চ্যালেঞ্জ করা কিভাবে একটা সুবিধাজনক সময় হতে পারে? সুবিধাজনক হতো যদি আমি থাকতাম বামপন্থীদের ফ্যাসিবাদী কেল্লায়। যাদের পক্ষে সাফাই গাইছেন আপনি।

জিয়া, আমার লেখায় কোথাও আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে এই ফ্যাসিবাদী বয়ানের সমর্থক বলি নাই। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, আপনি নিজের ক্রেডিবিলিটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতেছেন, বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর একটা জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় যে অংশটা তাদের অবস্থানকে আড়াল করতে। আপনি সমবেদনা জানাইছেন জন্য বাংলাদেশের সব বামপন্থীকে আমার সেই ক্রেডিট দিতে হবে? তার তার জন্য সবাই বামপন্থীদের ইনডেম্নিটি দিবে? এইটা কেমন আবদার?

আপনার ফর্মুলা মতো যে যার অবস্থানে যেমন আছে সেখানে থাকবে, আর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে হঠাৎ একটা জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠবে। এরকম এ্যাবসার্ড রিয়েলিটির কল্পনা আপনি করতে পারেন, কিন্তু রাজনীতির কান্ডজ্ঞান যার আছে যে মাঠের রাজনীতি করছে এক সময়, যার মিনিমাম পলিটিক্যাল ট্রেনিং আছে তার পক্ষে করা সম্ভব না।

বাংলাদেশের বর্তমান সমস্যা যদি ফ্যাসিবাদ হয়, বাংলাদেশে যদি লড়াই করে ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র এবং তার ক্ষমতাকে অপসারন করতে হয়, তাহলে আপনাকে তো মিনিমাম কন্সেন্সাস তৈরি করতে হবে। ডান-বাম সবাইকে এই প্রশ্ন সামনে রেখেই ঐক্যের সূত্র খুঁজতে হবে। যারা রাষ্ট্রকে ফ্যাসিস্ট করে তুলেছে, যে রাজনীতি তাদেরকে এখনো এর সহযোগী কইরা রাখছে তার কোন রিভিউ হবে না? এটা কে আপনি এড্রেস করতে বলবেন না, কিন্তু আশা করবেন ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আসমান থেকে ঐক্য গড়ে উঠবে। এরকম স্যুররিয়াল চিন্তা করলে তো আর কারও কাফকা পড়ার দরকার নাই।

ছাত্র ইউনিয়ন ও সিপিবি মিলে আমার দীর্ঘ ৩০ বছরের লিগাসি। সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের আমার পুরানা বন্ধুবান্ধব, সকল সহকর্মী, তাদের চিন্তাচেতনা, তাদের রাজনৈতিক বয়ান, ফ্যাসিবাদের পক্ষে নিরন্তর সমর্থন দিয়ে যাওয়া— এগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো, এগুলোকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে সামনে আগানোটা কিভাবে শাহবাগ থেকে প্রাপ্ত পলিটিকাল ক্যাপিটাল হইতে পারে? ওইটারে যদি ক্যাপিটাল মনে করতাম, তাহলে আমি আমার সেই টক্সিক ক্যাপিটাল নিয়া আপনার মত রাষ্ট্রচিন্তা মার্কা সংগঠনের পিছনে ঘুরঘুর করতাম। ওইসব শাহবাগের ডাস্টবিনে ফালায় আসতাম না।

জিয়া বেজার হইয়েন না, একটা সত্য কথা বলি। শাহবাগ আমার না, আপনার পলিটিকাল ক্যাপিটাল। এই লিগাসি এবং ক্যাপিটাল ধইরা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা আপনার প্রধান সমস্যা। আপনি নিজেকে বারবার ওদের বন্ধু প্রমাণের চেষ্টা করতেছেন। আপনি তাদের বানানো কমপ্লেক্সের ফাঁদে পইড়া আটকাইয়া গেছেন।

বামপন্থী এবং আওয়ামী সেকুলার বয়ানের বাইরে দাড়াইয়া কোথায় ফ্যাসিবাদ বিরোধী লড়াই, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, গণঅভ্যুত্থানের রাজনীতি তৈরি হবে, সেই পাটাতনের নাগাল আপনি পাইতেছেন না।
আপনি ঘুরেফিরে তাদের মরাল কম্পাস দিয়া আওয়ামী ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামে ব্যতিব্যস্ত রাজনৈতিক দলকে সমালোচনা করেন। আপনার সমস্যাটা কোথায়, তা আপনি এখনো টের পান না।

জিয়া আপনি ব্লগে লেখালেখি কইরা পরিচিত হইছেন। আমি ছাত্র রাজনীতি কইর‍্যা বড় হওয়া মানুষ। স্কুল থেকেই রাজনীতি করছি। আমি রাজশাহী মহানগরের সিপিবির জেনারেল সেক্রেটারি হইছি ২৪ বছর বয়সে। আমি ২৭ বছর বয়সে সিপিবির পঞ্চম কংগ্রেসের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হইছি। জান লড়ায়ে এরশাদের স্বৈরশাসন ফাইট করছি। দিনের পর দিন মাথায় হুলিয়া নিয়া পলায়ে থাকছি, জেলে গেছি, পুলিশি নির্যাতনে মরতে মরে বেঁচে গেছি। আমি আমার পরিণত বয়সের এই অবস্থাই না আমার যৌবন আর তারুণ্যও আমি উতসর্গ করছি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। আমার দুনিয়া ব্লগে আর শাহবাগে সীমাবদ্ধ না। কোন বামপন্থীর দোকানে গিয়া নতুন কইরা প্রগতিশীলতার সার্টিফিকেট আমার কিনতে হবে না। আমারে আপনি পলিটিক্যাল ক্যাপিটালের গল্প শুনান জিয়া? আমি কর্পোরেট দুনিয়ায় না আইস্যা রাজনীতিতে থাকলে আজ থিকা দশ বচ্ছর আগেই পুরানা পল্টনের সিপিবির মুক্তি ভবনে আমি প্রথম না হইলেও দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি হইতাম।

আপনি কি মনে করেন, স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বাহাত্তর থেকে পঁচাত্তর সালের অপশাসন, ৭৪ এর দুর্ভিক্ষ, বাকশালের সমস্যা, শেখ মুজিবের কাল্ট প্রতিষ্ঠার দায়-দায়িত্বের জন্য কারো অতীত সংশোধন করতে হবে না? প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে না? এই প্রশ্নের সুরাহা করবেন, শাহবাগে আপনি কী করছেন সেই ঘটনা দিয়া?

আমি আলোচনা করছি বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী রাজনীতির হিস্টোরিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি, পলিটিক্যাল এজেন্সি নিয়ে। আপনি এই এন্টায়ার পলিটিকাল হিস্ট্রি, সেই পলিটিকাল হিস্ট্রির লিগ্যাসি এবং এটার কালচারাল ইন্ডাস্ট্রিটাকে অস্পষ্ট করে দিতে চাচ্ছেন।

আমি আপনাকে অন্য একটা প্রশ্ন করি। আপনি এইটা ভাবেন, আমাকে উত্তর দেওয়ার দরকার নাই।

বাংলাদেশে তো কোনো না কোনো সময়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে অপসারিত হবে, তাইনা? তেমন পটভূমিতে বাংলাদেশে আবার আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফিরে আসার পরিবেশ তৈরি এবং ফ্যাসিবাদের এই কালচারাল হেজিমনি রিপ্রডিউস করার জন্য তখন কে বা কারা সক্রিয় হবে? একটু চিন্তা করে দেখেন, আওয়ামী লীগের সেই বৈরী সময়ে আবার কাকে-কাকে পাওয়া যাবে, যার বা যাদের হাত ধরে বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান আধিপত্যের খুটি-বর্গা ডালপালা মেলবে?

ভাবেন জিয়া ভাবেন। বাংলাদেশের পলিটিক্যাল হিস্ট্রিটা ক্রিটিক্যালি দেখেন সেই ৪৭ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত। উত্তর পাইবেন।

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সত্যিকার অর্থে কার্যকর একটা সংগ্রাম যদি গড়ে তুলতে চান, তাহলে কৌশলের পাশাপাশি আপনাকে ভবিষ্যতে রাজনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

এখন প্যারিসে অনেক রাত; বাংলাদেশে সুর্য উঠেছে। বাংলাদেশের বিচারে সফল জীবন থেকে স্বেচ্ছায় বিতাড়িত হয়ে রাষ্ট্রহীন রিফিউজি হয়ে এই নিঃসঙ্গ নিশুতিতে যখন ভাবী আমার বৃদ্ধ বাবা মা দেহ ত্যাগ করলেও তো আমি তাঁদের শেষ দেখা দেখতে যেতে পারবোনা, সেটা কী আপনার কাছে শাহবাগে অংশ নেয়ার জন্য আমার উপরে নেয়া প্রকৃতির যথার্থ শাস্তি বলে মনে হয়না? আমার এই সাত বছর পাহাড় ঠেলে আমার সব রাজনৈতিক অতীতের সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে বিরামহীনভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একটা অসম যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াকে আপনার প্রায়শ্চিত্ত বলে মনে হয়না? আপনাকে আমি “ছাগু” বলেছিলাম ২০১২ সালে সেইটার জন্য প্রকাশ্যে আপনার কাছে মাফ চাইনাই জন্য আমার প্রায়শ্চিত্ত যদি অসম্পুর্ণ থাকে। তাহলে আমি আপনার কাছে নতমস্তকে ক্ষমা চাই। বাংলাদেশে এতোদিন যারা “ছাগু” শব্দটা দিয়ে যত মানুষকে গালি দিয়েছে আমি সবার দায় নিয়ে বাংলাদেশের সব মানুষের কাছে মাফ চাই।

Pinaki Bhattacharya | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-05-08 05:48:49