~প্রকাশিতব্য স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বই থেকে। এই অংশটা নেয়া হয়েছে ডা জাফররুল্লা – পিনাকি ভট্টাচার্য

~প্রকাশিতব্য স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ বই থেকে। এই অংশটা নেয়া হয়েছে ডা জাফররুল্লাহ চৌধুরীর নিজের একটা লেখা থেকে যা বনিক বার্তায় প্রকাশিত হয়েছিলো ২০১৭ সালে। সেই লেখাটা বনিকবার্তা নেট থেকে সরিয়ে ফেলে।~

১৩ ডিসেম্বর বিকালে মুক্ত হয়েছে কুমিল্লা, একটা এম-৮ হেলিকপ্টারে ব্রিগেডিয়ার গুপ্তের ত্তত্বাবধানে কুমিল্লা পৌঁছান শেখ কামাল, ডা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, জেনারেল ওসমানী আর মুক্তিবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল এমএ রব। বিশ্রামের জন্য কুমিল্লা সার্কিট হাউজে পৌঁছে সবাই হতভম্ব। ওসমানী সাহেবকে হাত বাড়িয়ে ‘রিসিভ’ করছেন কয়েকজন ভারতীয় বাঙালি। একে একে তারা পরিচয় দিলেন, ‘আমি মুখার্জি, আইএএস, আমি গাঙ্গুলি আইপিএস ইত্যাদি।’ উনারা বললেন, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে তারা গতকাল এখানে পৌঁছেছেন কুমিল্লা মুক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। তারা শহরের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার সমন্বয় করবেন।

১৬ ডিসেম্বর সকালে ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত জানালেন, আজ ঢাকায় পাকিস্তান সেনারা আত্মসমর্পণ করবে। আশ্চর্য, ওসমানী সাহেব একবারে চুপ, কোনো কথা বলছেন না।

জেনারেল ওসমানীর এডিসি, শেখ মুজিবুরের বড় ছেলে শেখ কামাল জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে বলল,

-স্যার কখন রওনা হবেন তা তো বলছেন না। জাফর ভাই, আপনি যান, জিজ্ঞেস করে সময় জেনে নিন। অধীর আগ্রহে আমরা সবাই অপেক্ষা করছি।

ডা জাফরুল্লাহ জিজ্ঞেস করায় ওসমানী সাহেব ইংরেজীতে বললেন,

– ঢাকার পথে রওনা হওয়ার জন্য কলকাতা থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন সাহেবের কোনো নির্দেশ পাইনি।

-আপনাকে অর্ডার দেবে কে? আপনি তো মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক।’ জাফরুল্লাহ বললেন।

– যুদ্ধক্ষেত্রে আমি সর্বেসর্বা কিন্তু মূল আদেশ আসে মন্ত্রিসভা থেকে প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দীন আহমদের বরাতে।

বিষন্ন মনে বললেন জেনারেল ওসমানী।

তিনি আসন্ন ঢাকা পতনের সংবাদ জানেন এবং প্রবাসী সরকারের নির্দেশের অপেক্ষা করছেন। সঙ্গীদের অস্থিরতা দ্রুত বাড়ছে আর বাড়ছে। শেখ কামাল বারবার ডা জাফরুল্লাহকে চাপ দিচ্ছেন আবার ভালো করে বুঝিয়ে বলে ওসমানী সাহেবকে রাজি করাতে, ঢাকা রওনা হওয়ার জন্য।

ঘণ্টাখানেক পরে জেনারেল ওসমানী অত্যন্ত বেদনাতাড়িত কণ্ঠে বললেন,

-আমার ঢাকার পথে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ নেই। আমাকে বলা হয়েছে পরে প্রবাসী সরকারের সঙ্গে একযোগে ঢাকা যেতে, দিনক্ষণ তাজউদ্দীন সাহেব জানাবেন। গণতন্ত্রের আচরণে যুদ্ধের সেনাপতি প্রধানমন্ত্রীর অধীন, এটাই সঠিক বিধান।

তিনি ব্রিগেডিয়ার গুপ্তকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,

– সিলেটের কী অবস্থা?’

– সিলেট ইজ ক্লিয়ার। ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত জানালেন

– তাহলে চলুন আমরা সিলেট যাই, সেখানে গিয়ে আমার বাবা মায়ের কবর জিয়ারত করব, শাহজালালের পুণ্য মাজারে আমার পূর্বপুরুষরা আছেন।’

জেনারেল ওসমানী শেখ কামালকে ডেকে সবাইকে তৈরি হতে বললেন। আধা ঘণ্টার মধ্যে হেলিকপ্টার উড়লো আকাশে, নিরুপদ্রব যাত্রা সিলেটের পথে। পরিষ্কার আকাশ। হেলিকপ্টারের যাত্রী জেনারেল ওসমানী ও তার এডিসি শেখ কামাল, মুক্তিবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল এমএ রব এমএনএ, রিপোর্টার আল্লামা, ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত, ভারতীয় দুই পাইলট এবং ডা জাফউল্লাহ চৌধূরী। কেউ কথা বলছে না, সবাই নীরব।

অতর্কিতে একটি প্লেন এসে হেলিকপ্টারের চারিদিকে চক্কর দিয়ে চলে গেল। হঠাৎ গোলা বিস্ফোরণের আওয়াজ, ভেতরে জেনারেল রবের আর্তনাদ, পাইলট চিত্কার করে বললেন,

-উই হ্যাভ বিন অ্যাটাকড।

রবের ঊরুতে গোলার আঘাতের পর পরই তার কার্ডিয়াক এরেস্ট হলো। ডা জাফরুল্লাহ এক্সটার্নাল কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিতে শুরু করলেন। পাইলট চিৎকার করে বললো,

-অয়েল ট্যাংক হিট হয়েছে, তেল বেরিয়ে যাচ্ছে, আমি বড়জোর ১০ মিনিট উড়তে পারব’ বলে গুনতে শুরু করল ওয়ান, টু, থ্রি…টেন…টুয়েন্টি…থার্টি…ফোরটি…ফিফটি…নাইন সিক্সটি-ওয়ান মিনিট গান,

এভাবে পাইলট মিনিট গুনছে, উদ্বিগ্ন চিন্তিত পাইলট। ধীরস্থিরভাবে পাইলটের আসনে বসা অন্য পাইলট। ওসমানী সাহেব লাফ দিয়ে উঠে অয়েল ট্যাংকের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করলেন, ‘জাফরুল্লাহ্, গিভ মি ইয়োর জ্যাকেট।’ ডা জাফরুল্লাহর গায়ের জ্যাকেটটা ছুড়ে দিলে ওসমানী সাহেব ওটা দিয়ে ওয়েল ট্যাংকের ফুটা বন্ধের চেষ্টা করতে থাকলেন। ইংরেজীতে বললেন,

-ভয় পেয়ো না বাছারা, আমি সিলেটকে আমার হাতের তালুর মত চিনি।

যে বিমানটি থেকে নিখুঁতভাবে হেলিকপ্টারের অয়েল ট্যাংকারে গুলি ছোড়া হয়েছিলো তা পাকিস্তানের ছিলোনা এটা নিশ্চিত। পাকিস্তানের সব বিমান কয়েক দিন আগে ধ্বংস হয়েছে কিংবা গ্রাউন্ডেড করা হয়েছে। তাই আক্রমণকারী বিমানটি ভারতীয় হবার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী, গোলা ছুড়ে সেটা হয়তো গুয়াহাটির পথে চলে গেছে।

জেনারেল ওসমানী চিৎকার করে নিচে একটা জায়গার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন,

-এখানে নামো। শত্রুর গুলির স্বাদ নেয়ার জন্য আমাকে প্রথম নামতে দাও, যদি কোনো শত্রু এখনো থেকে থাকে।

এই বলে তিনি তরুণের মতো হেলিকপ্টার থেকে লাফ দিয়ে নামলেন।

হঠাৎ গ্রামবাসী এসে ওসমানী সাহেবকে ঘিরে ধরল— ‘দুষমন আইছে রে বা দুষমন আইছে, দুষমনরে ধর।’ পর পরই ভালো করে তাকিয়ে দেখে হঠাৎ চিত্কার করে উঠল,

– আমাদের, কর্নেল সাব রে বা।

গ্রামবাসী জেনারেল ওসমানীকে ঘিরে নাচতে শুরু করল।

জনতার বিজয় উল্লাসে যেন জেনারেল রবের ঘুম ভাঙল, তিনি চোখ খুলে তাকালেন, সবার মুখে হাসি।

Pinaki Bhattacharya | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-05-01 14:45:23