বিখ্যাত বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বস নাকি করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করছে!! – পিনাকি ভট্টাচার্য

বিখ্যাত বিজনেস ম্যাগাজিন ফোর্বস নাকি করোনা মোকাবেলায় শেখ হাসিনার প্রশংসা করছে!! বাংলাদেশের মিডিয়া এই নিয়া খুব মাতামাতি করতেছে। আজ আওয়ামী শিবিরে আনন্দের বন্যা। দৃশ্যত করোনা মোকাবেলায় হাসিনার প্রশাসন ব্যর্থ হওয়ার যারা আশায় বুক বাধছিলেন তাদের মুখে হতাশা। ভালোই লাগতেছে এইসব দেখে।

বাংলাদেশে শুধু সরকার নয়, তাদের বিরোধীরাও যে অপদার্থ হবে। এতে আমার কোন সন্দেহ নাই। আমিও তো একজন অপদার্থ, তাই এই বিষয় নিয়া লিখি।

যাই হোক। উহা ফোর্বস ম্যাগাজিনের কোন আর্টিকেল নয়। সেটা একজন ব্লগারের লেখা ব্লগ।

ফোর্বস ম্যাগাজিন আর ফোর্বস ডট কম দুইটা ভিন্ন প্রকাশনা যদিও দুইটা একই কর্পোরেশনের দুই বিজনেস ইউনিট। ফোর্বস ডট কম হইতেছে একটা ভেরি হাই কোয়ালিটি ব্লগ, যদিও ফোর্বস ডট কমে ফোর্বস ম্যাগাজিনের আর্টিকেলগুলোও থাকে। শেখ হাসিনারে নিয়া লেখাটাও একটা ব্লগ, ওইটা কোন ম্যাগাজিন আর্টিকেল নয়। তবে যিনি লিখছেন, তিনি একজন সেলিবৃটি ব্লগার। লেখালেখির জন্য না, উনার লেখা কেউ পড়েনা। উনার নাম Avivah Wittenberg-Cox, তিনি ফ্রান্সেই থাকতেন, নিসে। কিন্তু হায় আমার লগে পরিচয় হওয়ার আগেই তিনি লণ্ডনে থিতু হইছেন নতুন এক বিয়া কইরা। উনি সেলিবৃটি হইছেন কারণ তাঁর বাবা ও মাও সেলিব্রেটি ছিলেন, উনারা দুইজনেই ছিলেন হলোকাস্ট সারভাইভার। বাংলাদেশে যেমন “বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান” বলে একটা সমাজে আলাদা জায়গা পাওয়া যায় তেমনি পশ্চিমেও হলোকাস্ট সারভাইভারের সন্তানরা তাদের পিতা বা মাতার পরিচয় সগর্বে প্রচার করেন। এবং উনারা সমাজে একটা আলাদা প্রভাব ও প্রতিপত্তি নিয়ে চলেন। খুব সাধারণ মানের লেখালেখি করা ছাড়াও আভিভা একজন মোটিভেশন্যাল স্পিকার এবং পেশাদার কোচ। তার শেষ বইয়ের নাম হচ্ছে “লেইট লাভ”। পঞ্চাশ বছরের পরে প্রেমে পড়ার কারণ ও তরিকা ব্যখ্যা করেছেন সেই বইয়ে। আমি যদিও সেই বই পড়িনি, রিভিউ দেখে বললাম। উনার একটা কনসাল্টেন্সি ফার্ম আছে নাম 20-first উনারা জেন্ডার বেইসড কনসাল্টেন্সি করে থাকেন। যদিও সেই প্রতিষ্ঠানরে কেউ পুছেনা।

আভিভা একজন ফোর্বসের ব্লগার। ফোর্বসের আভিভার মতো ব্লগার আরো আড়াই হাজার আছেন। এই ব্লগারদের অভিজ্ঞতা এবং লেখার মান বিবেচনায় সিনিয়র কন্ট্রিবিউটর এবং কন্ট্রিবিউটর হিসেবে ফোর্বস ক্লাসিফাই করে। আভিভা একজন কন্ট্রিবিউটর। উনার লেখা পাচশোর মতো টেনেটুনে ভিউ হইতো। আপনারা ফোর্বসের ম্যাগাজিনের আর্টিকেলে “কন্ট্রিবিউটর” শব্দটার বদলে “ফোর্বস স্টাফ” কথাটা দেখবেন। কন্ট্রিবিউটরদের লেখা ব্লগ কখনো কখনো ফোর্বস প্রোমোট করে। সেই লেখাকে তখন “এডিটরস পিক” এর মর্যাদা দেয়া হয়। তাহলে লেখাটা সহজেই ভাইরাল হয়। আমাদের সামু ব্লগে যেভাবে পোষ্ট স্টিকি করা হতো তেমন আরকি।

ব্লগের ভালো কন্ট্রিবিউটরেরা মাসে ৫০০ থেকে এক হাজার ডলার ফোর্বস থেকে আয় করেন, যদি ফোর্বসের বেঁধে দেয়া ভিজিটর টার্গেট এই ব্লগারেরা পুরণ করতে পারেন।

আগেই বলেছি, আভিভা একজন তৃতীয় শ্রেণীর ফোর্বস ব্লগার। তিনি গত তেরোই এপ্রিল What Do Countries With The Best Coronavirus Responses Have In Common? Women Leaders এই শিরোনামে একটা ব্লগ লিখেন যেখানে করোনা মোকাবেলায় আটজন নারী রাষ্ট্র প্রধানের কৃতিত্ব তিনি তুলে ধরেন। অবশ্য সেখানে শেখ হাসিনা ছিলোনা। সেই ব্লগ EDITORS’ PICK হয় এবং সঙ্গত কারণেই ভাইরাল হয়। প্রায় ৭০ লাখ ভিউ হয় এই আর্টিকেলের। এই সাফল্যে আভিভা উৎসাহিত হয়ে কয়েকদিন আগে আরেকটা ব্লগ লিখেন 8 (More) Women Leaders Facing The Coronavirus Crisis শিরোনামে। সেখানে তিনি শেখ হাসিনা সহ আরো আট জন নারী নেতৃত্বের করোনা মোকাবেলায় প্রশংসা করেন।শেখ হাসিনার প্রশংসার কারণ হিসেবে তিনি শেখ তানজিব ইসলাম ও নিতীশ কুমার নামের দুই ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের ফেলোর ১৩ এপ্রিল অনলাইনে প্রকাশিত লেখার সুত্র উল্লেখ করেন। ইন ফ্যাক্ট আভিভা প্রশংসাটা করেনি করেছে শেখ তানজিব আর নিতীশ কুমার। আভিভা তার ব্লগে সেটার উল্লেখ করেছেন। শেখ তানজিব হচ্ছেন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। ইন ফ্যাক্ট সে শেখ হাসিনার ভাতিজা।

এবার আসেন দেখি প্রশংসাটা কী করেছিলো শেখ তানজিব আর নিতীশ কুমার? তারা বলেছিলো, করোনা ভাইরাস ধরা পরার পরে চায়না থেকে বাংলাদেশ তার নাগরিকদের সরিয়ে এনেছে, এয়ারপোর্টগুলোতে থার্মাল স্ক্যানার বসিয়েছে। তবে ওরা না জানলেও আমরা জানি সেই স্ক্যানার কাজ করে নাই। চাইনিজ এমব্যাসাডার প্রকাশ্যেই বলেছে যে বাংলাদেশের এই স্ক্যানিং এর পদ্ধতি ও মেশিন অকার্যকর।

ওরা আরো প্রশংসা করে বলে, হাসিনা বিদেশ থেকে আগত ৩৭ হাজার বাংলাদেশীকে কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে দুইটা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে কোয়ারেন্টাইন সেন্টার হিসেবে রুপান্তরিত করে। (এখানে সম্ভবত হজ্জ্ব ক্যাম্পের কথা বলেছে।) ওরা কী হোম কোয়ারেন্টাইনের কিচ্ছা জানে? তারা কী জানে হজ্জ্ব ক্যাম্পে কী কী ঘটনা ঘটেছিলো? তারা কী জানে, কয়জন কয়রাত সেখানে ছিলো?

প্রশংসা করা হয়েছে এই বলে যে, বাংলাদেশে স্কুল কলেজ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। যদিও আমরা জানি করোনা রোগী আক্রান্ত হবার পরেও ১০ মার্চ বাংলাদেশের সকল স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মুজিবের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস পালন করানো হয় ও ১৭ মার্চ মুজিবের জন্মদিন উপলক্ষে সারা দেশে আতশবাজি ফুটানো হয়। সারা দেশে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে সেই আতশবাজির উৎসব দেখে। তার আরো প্রায় দশদিন পরে ২৬ মার্চ সারা দেশ লক আউট ঘোষণা করা হয়।

বলা হয়েছে, হাসিনা নাকি নন এসেনশিয়াল ব্যবসাগুলি অনলাইনে ট্রান্সফার করেছেন। হা হা হা সত্যিই কী?

কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা তো বাংলাদেশের জনগন জানে। তারা প্রত্যেকদিন যুগপৎ ক্ষুধা আর মৃত্যুর সাথে লড়ছে। এই বধ্যভুমিতে দাঁড়িয়ে কোনমতে বেচে থাকাটাই তাঁদের কাছে উৎসব।

শুধু বেঁচে থাকার সেই উৎসবের খোঁজ নিতীশ কুমার, শেখ তানজিব আর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফোবর্সের থার্ডক্লাস ব্লগারেরা কখনো পায়নি, পাবেও না।

জনগনের আস্থা, বিশ্বাস আর সমর্থনের অভাব যদি বিদেশী ব্লগার দিয়ে পুরণ করে কেউ আনন্দিত হতে চায় তার আনন্দ আমি মাটি করতে চাইনা। নাকের বদলে অনেক বেকুবের নরুণ বেশী পছন্দ। বাকশালিদের এই তাক দুমা দুম তাক বলে নাচানাচির পাশাপাশি হাতে একটা বিদেশী ব্লগের নরুণ নিতে বলুন। উনারা যেই বেকুবি করতেছেন, সেইটাও তারা সর্বাঙ্গসুন্দর করুক।

Pinaki Bhattacharya | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-04-27 18:16:24