পর্ব ১ঃ মারাঠাদের উত্থান, নাদের শাহের দিল্লী লুট, আর মোঘলদের পতন এর সংক্ষিপ্ত ব – সাবিনা আহমেদ

পর্ব ১ঃ মারাঠাদের উত্থান, নাদের শাহের দিল্লী লুট, আর মোঘলদের পতন এর সংক্ষিপ্ত বিবরন

খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে খাজনা দেবো কিসে

মারাঠারা ছিলো এই বর্গী। তারা একই সাথে গরিলা যোদ্ধা আর কুখ্যাত লুটেরা ছিলো। আওরঙ্গজেবের সাথে মারাঠাদের অনেক যুদ্ধ হয়। মোঘলদের ছিল বিশাল সেনা বাহিনী যারা যুদ্ধের ময়দানে সম্মুখভাবে যুদ্ধ করত, আর মারাঠারা করত গরিলা যুদ্ধ। এই গরিলা আক্রমন করে মারাঠারা শক্তিশালী মোঘল বাহিনীকে দীর্ঘ সময় ধরে ব্যস্ত রাখে। মারাঠা নেতা শিম্ভাজিকে হত্যা আর শিভাজিকে আওরঙ্গজেবের প্রাসাদে ধরে রাখা স্বত্বেও এসব যুদ্ধের কোন শেষ ছিল না। শিভাজি অবশ্য শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যান। ক্রমাগত ২১ বছর ধরে মারাঠাদের সাথে যুদ্ধ করে আওরঙ্গজেব শেষ পর্যন্ত হয়রান হয়ে পড়েন।

মারাঠারা শত্রুপক্ষের উপর ছিল খুব নৃশংস। সেইসময় একজন ইয়োরপিয়ান ট্র্যাভেলার মারাঠা আক্রমণের পর আওরাঙ্গাবাদে ভ্রমন করে লিখেছিলেন যে মারাঠারা প্রতিটি গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শেষ করে দিয়েছিল। চারিদিকে মানুষ আর গবাদি পশুর লাশ পড়েছিল। কেবল পুরুষের লাশ নয়, দেখেছেন শিশুকে আকড়ে ধরে থাকা মায়েদের লাশ। মানুষকে কেবল তলোয়ারের আঘাতেই তারা হত্যা করে নাই, আগুনে পুড়িয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল তাদের লাশ। লিখেছে, ” এমন হত্যা যোগ্য এর আগে আমি জীবনে দেখি নাই। যেই তিনটি গ্রাম আমি পার হয়েছি সেখানে প্রায় ৬০০ মানুষের বিকৃত লাশ দেখেছি।” Jean-Baptiste Gentil, Memoires sur l'Indoustan,Paris, 1822, p 76.

আরেক ফ্রেঞ্চ ট্র্যাভেলার লিখেন, ” মারাঠারা তাদের শত্রু অঞ্চলগুলিকে
অতিরিক্ত ঘৃণা আর বর্বরতার সাথে ধ্বংস করে দিত, যদিও তারা নিজেদের মিত্রদের সাথে শান্তিপূর্ণ ভাব বজায় রাখত আর ব্যবসা বাণিজ্য আর কৃষি কাজের দারা নিজেদের এলাকাগুলোর উন্নতি সাধন করত।” Voyage en Inde du Comte de Modave, 1773-1776, ed, Jean Deloche, Pondicherry, 1971, pp. 400-1.

আওরঙ্গজেবের জীবিতকালে মোঘলদের থাকে স্বাধীনতার লক্ষ্যে ১৮শ শাতবাব্দির প্রথম দিকেই পাঁচ অঞ্চলের মারাঠারা মিলে একটা কনফেডারেসি গঠন করে আর উপর্যুপরি মোঘল কন্ট্রোল্ড এলাকাগুলোতে আক্রমন চালাতে থাকে। এই পাঁচ অঞ্চলগুলো হোল মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট, উড়িষ্যা, মহারাষ্ট্র আর রাজস্থান। এদের সাথে যুদ্ধ করে করেই আওরঙ্গজেব তার জীবনের অর্ধেক সময় অতিবাহিত করেন। আর তাদের আক্রমন আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরেও অব্যহত থাকে।

মারাঠাদের বর্বর আক্রমণের দুইটা বিশাল এফেক্ট হয়ঃ এক, মোঘল অধ্যুশুত দূরবর্তী এলাকা থেকে ট্যাক্স আসা ব্যহত হয়। ট্যাক্স বা খাজনা পাঠালেও তা পথেই মারাঠারা লুট করে নিয়ে যেত। তাতে মারাঠাদের কোষাগার বাড়তে থাকে আর সেন্ট্রালি দিল্লীর মোঘলদের কোষাগার কমতে থাকে। এতে করে সেন্ট্রাল এডমিনিস্ট্রেটারদের পক্ষে বিশাল সেনাবাহিনী পালা দুরহ হয়ে পড়ে। দিনকে দিন মোঘলেরা হয়ে পড়ে দুর্বল। দুই, মারাঠারা হয়ে পড়ে শক্তিশালী। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তাদের কোষাগার বৃদ্ধি পেয়ে দ্বিগুণ হয়, যার দারা তারা আরও সেনাসামন্ত জোগাড় করে মোঘলদের উপুর্জপুরি আক্রমনে দুর্বল করে তুলে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডীয়া কোম্পানি আর ফ্রেঞ্চরা মোঘলদের এই দুর্বলতার সুযোগে নিজেদের বলয় বাড়াতে থাকে। আর এই দুর্বলতার সুযোগ নেয় পারস্যের (বর্তমান ইরান) নাদের শাহ।

এই সময় বাংলার নবাব ছিলেন মুর্শিদ কুলী খান। সম্রাট আওরঙ্গজেব মুর্শিদ কুলী খানকে বাংলার দেওয়ান হিসাবে নিযুক্ত করে জাহাঙ্গীরনগর তথা ঢাকায় পাঠান। ঢাকায় তখন মোঘল সুবেদারের সাথে ওনার শত্রুরার জন্য তিনি দেওয়ানখানা মুরশিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সম্রাট ফাররুখশিয়ার মুর্শিদ কুলিকে বাংলার নবাব নিযুক্ত করেন। এই মুর্শিদ কুলী খানই বাংলায় জায়গীরদার প্রথা বিলুপ্ত করে 'মাল জাস্মানি' চালু করেন, আর এই মাল জাস্মানির পরবর্তীতে জমিদারি প্রথায় পরিবর্তিত হয়।

মুর্শিদ কুলী খান আজীবন দিল্লীর সম্রাটের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন আর যখন চারিদিকে মারাঠা আক্রমনে অনেক অঞ্চল থেকে খাজনা আসা বন্ধ হয়ে পড়ে তখনও মুর্শিদ কুলী খান সময়মত বার্ষিক খাজনা পাঠানো অব্যহত রাখেন। বাংলা তখনও ছিল মোঘল সম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী প্রদেশ। ১৭২০ সালের দিকেও দিল্লীর কোষাগারে সবচেয়ে বেশী খাজনা যেতো বাংলা থেকে। সেই সময়ে নিরাপদে দিল্লিতে খাজনা পাঠাতে মুর্শিদ কুলী খান মারোয়াড়ী জগত শেঠদের ফাইনানশিয়াল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা শুরু করেন। আর এই জগত শেঠেরা ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ন্যাচারাল বন্ধু। কলকাতা শহরে এমন কোন ব্রিটিশ সেই সময় ছিল না যারা জগত শেঠদের থেকে টাকা পয়সার লেনদেন না করত।

এসব সময়ে ঘটে আরেক ঘটনা।

১৭৩৯ সালে পারস্যের নাদের শাহ ৮০,০০০ পারস্য সৈনিক নিয়ে দিল্লী আক্রমন করেন । নাদের শাহের ছিল অত্যাধুনিক আর্টিলারি, মাসকট বন্দুক, এসবের সাথে মোঘলেরা যুদ্ধে মোকাবেলা করতে না পেরে সহজে হার স্বীকার করে। “The army of Hindustan fought with bravery. but one cannot fight musket balls with arrows.” Sanjhay Subramanyam, Un Grand Derangement, pp. 357-8.

সেই সময় দিল্লীর মসনদে ছিল ইনকিম্মপিটেন্ট সম্রাট মুহাম্মদ শাহ রঙ্গিলা। নাদের শাহ পুরা দিল্লীর কোষাগার শুন্য করে নিয়ে যায়। ্সাথে নিয়ে যায় ময়ূর সিংঘাসন, কোহিনুর হিরা, গ্রেট তিমুর হিরা, দারিয়া -ই-নুর হিরা ইত্যাদি। এই সমস্ত হিরা জহরত, সোনা রুপা নিতে নাদের শাহ ব্যবহার করেন ৭০০ হাতি, ৪০০০ উট, আর ১২,০০০ ঘোড়া।

এই ঘটনায় মোঘলদের শেষ পরিনতির শুরু। মোঘলেরা বিশাল সেনা বাহিনী পালার সামর্থ্য পুরাপুরি রুপে হারিয়ে ফেলে। এর থেকে ফ্রেঞ্চ আর ব্রিটিশ উভয়ে বুঝতে পারে যে মোঘলদের দিন শেষ, তারা এখন পরিনত হয়েছে দন্তহীন হাতিতে। এদের সহজে কাবু করা যাবে।

নাদের শাহ যদি সম্রাট বাবরের মতন দিল্লীতে থেকে যেতেন তাহলে ইতিহাস হয়ত অন্যদিকে মোড় নিত। ফ্রেঞ্চ আর ব্রিটিশরা নাদের শাহকে ভয় পেয়ে লিখেছিল, এবার মোঘলদের সাম্রাজ্যের শেষ আর পারস্যের সাম্রাজ্যের শুরু। কিন্তু নাদের শাহ ভারত দখল নয় বরং ভারত থেকে কোষাগার এর রসদ সংগ্রহ করে তার আসল শত্রু রাশান আর অটোম্যানদের সাথে লড়াই করার লক্ষ্যে ইস্ফাহান ফেরত যান।

এর কিছুদিন পর, ১৭৪০ সালে আলিবর্দি খান বাংলার নবাবের মসনদে বসেন, আর ১৭৪২ সাল থেকে মারাঠারা বাংলা আক্রমন শুরু করে যা চলে প্রায় ১৭৫১ সাল পর্যন্ত।

চলবে………… মারাঠাদের বাংলা আক্রমন।

Sabina Ahmed | উৎস | তারিখ ও সময়: 2020-05-18 11:52:29