আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে আরে এ সময় তো আমার হজের জন্য মক্কায় বা মিনার পার্শ্ববর্তী – আসিফ সিবগাত ভূঞা

আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে আরে এ সময় তো আমার হজের জন্য মক্কায় বা মিনার পার্শ্ববর্তী আজিজিয়াতে থাকার কথা ছিলো। আহা!

করোনার কারণে এবার আর যাওয়া হোলো না। আল্লাহ্‌র সিদ্ধান্তের ওপর আফসোস করবো না। কিন্তু মক্কা মদীনার সুতীব্র টান উপেক্ষা করা সম্ভব কি? মুসলিম মনের স্বাভাবিক আকর্ষণ সেটা।

২০১৭ সালের পর এবছরই আবার যাওয়ার কথা ছিলো। আল্লাহ্‌র মেহেরবানি বলে শেষ করার মতো না। ২০১০-এ একবার গিয়েছিলাম ‘উমরা করতে, ২০১৭ তে গেলাম হাজ করতে – দুই বারই একদম ফ্রি। যাওয়া আসার জন্য বা অন্যান্য অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কোনো খরচই বহন করতে হয়নি।

ভাবছি কিছু স্মৃতিচারণ করা যাক। ২০১০ এর ‘উমরা দিয়ে শুরু করি। আমি তখন কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বছর ব্যাপি একটি আরবি কোর্স করছিলাম। হঠাৎই পরিচয় হয় একটি স্যাটারডে স্কুলের পরিচালকদের সাথে। তারা একটি স্কুলে শনিবার ছুটির দিন বাচ্চাদের খেলাধূলা করাতেন এবং ইসলামিক কিছু টিচিং দিতেন। খুবই দারুন প্রোগ্রাম ছিলো। বাচ্চারা দেড় ঘন্টা ইসলামিক ক্লাস করতো আর দেড় ঘন্টা খেলাধূলা করতো। যে সে খেলাধূলা না রীতিমতো কোচ রেখে – ফুটবল, কারাতে, ইত্যাদি। আমাদের অ্যারাবিক প্রোগ্রামের দুজন সেখানে সার্ভিস দেয়া শুরু করেছিলাম। খলিফা ও আমি। খলিফা হচ্ছে একজন ব্রিটিশ মুসলিম। ও সেমি প্রফেশনাল ফুটবল খেলতো ইংল্যান্ডে। ও বাচ্চাদের ফুটবল কোচ হোলো। আমার কাজ ছিলো বাচ্চাদের সাথে যে গার্ডিয়ানরা আসতো তাদের কুরআন তিলাওয়াত শেখানো। প্রতি মাসে ৫০০ রিয়াল করে পেতাম।

একদিন প্রোগ্রামের পরিচালক জুবায়ের ভাই (ব্রিটিশ পাকিস্তানি) – যিনি আমাদের খুবই আদর করতেন – আমাদের বললেন যে তোমরা যদি উমরা করতে চাও তাহলে আমরা তোমাদের খরচ দিয়ে দেব। এটা আমাদের তরফ থেকে গিফট। আমরা তো খুশিতে আত্মহারা। সেসময় সেমেস্টার ব্রেকও চলছিলো।

তারপর একদিন জুবায়ের ভাই নিজেই আমাদের নিয়ে গেলেন কাতারি একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির কাছে। সব টেকনিকাল সাইড তিনিই দেখলেন। শেষে আমাদের আপ্যায়ণ করে আরবি গাওয়া খেতে দেয়া হোলো (আরবিয় কফি)। এরকম জঘন্য জিনিস জীবনে খাইনি। ও না! খেয়েছি। কাতারেই চাইনিজ স্টুডেন্ট মুসা ফেং আমাকে চাইনিজ গ্রিন টি অফার করেছিলো। এই দুই ড্রিংকই আমি খুব কষ্ট করে শেষ করেছিলাম। মজা লাগছিলো না দেখে নিজের ওপরই রাগ লাগছিলো। নিজেকেই বলছিলাম – হাভাইত্যা বাঙালি খা! এগুলো ভালো জিনিস!

কাতার থেকে বাসে করে যাবো। দুই ঘন্টাতেই সৌদি বর্ডারে চলে আসলাম। এরপর সেখান থেকে বর্ডারে সব ফর্মালিটিজ শেষ করতে করতে মনে হয় আরও চার ঘন্টা চলে গেল। এরপর সেখান থেকে মক্কা আসতে আসতে পাক্কা আরও মনে হয় ১৬/১৭ ঘন্টা। আমাদের বাসে আমি আর খলিফা, একটি ইন্ডিয়ান কাপল যারা আমাদের পাশেই বসেছিলেন। বাকি প্রায় ৪০ জনের মত সব ইজিপশিয়ান। মিসরীয়রা খুব আমুদে মানুষ তাই বাসে খুবই হইহট্টগোল। তাদের ডায়ালেক্ট তখনও বুঝতাম না, এখনও ভালো বুঝি না। তবে সবাই ছিলো খুব ফ্রেন্ডলি। তবে সবচেয়ে সুবিধা হয়েছিলো ইন্ডিয়ান সেই কাপলের পাশে বসে। তারা কিছুক্ষণ পরপরই ইন্ডিয়ান কিছু মুড়ি মুড়কির মতো স্ন্যাক্স বের করে খাচ্ছিলেন আর আমাদের দিচ্ছিলেন। মজা ছিলো।

মক্কায় যখন হোটেলে এসে পৌঁছলাম তখন মাগরিবের ওয়াক্ত প্রায় শেষ। যেহেতু ইহরাম করে ঢুকেছি – বসে থাকার মানে হয় না। উমরা করতে চলে গেলাম। বুক ঢিপ ঢিপ করছিলো, প্রথম বারের মতো কা’বাকে দেখবো। শুনেছি কা’বাকে প্রথম বারের মতো দেখে নাকি চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব না। আমি কা’বা দেখলাম। খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু চোখ দিয়ে পানি বের হোলো না। দুই একবার চোখের খুঁটে হাত দিয়েও বোঝার চেষ্টা করলাম, সমস্যা কী! পরে আবার নিজেকেই বোঝালাম – হাভাইত্যা বাঙালি তাওয়াফ কর, পরে কান্দিস।

পুরো তাওয়াফটা ঘোরের মধ্যে কেটেছিলো। মাঝখানে একবার এক ছফুট লম্বা নাইজেরিয়ান মহিলার কনুইয়ের ধাক্কায় হুমড়ি খেয়ে পড়ার অবস্থা। বাংলায় বকে দিতে গিয়ে সামলে নিয়েছিলাম। একটু চোখ পাকিয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলাম যে ব্যাপারটা আমার পছন্দ হয়নি। পাত্তা দিলেন না, হুঙ্কার দিয়ে অদ্ভুত সব দু’আ পড়ছিলেন। দু’আ নরমাল ছিলো, কিন্তু নাইজেরিয়ান কোনো একটা অ্যাক্সেন্ট ছিলো, শুনলে মনে হয় মা বাপ তুলে গালি দিচ্ছেন। নাইজেরিয়ানরা খুব মজার কিসিমের। কাতার ইউনিভার্সিটিতে আমার ক্লাসে এক নাইজেরিয়ান ছিলো। সে হামজাকে ছোট হা আর ছোট হা-কে হামজার মতো উচ্চারণ করতো। বারবার ধরিয়ে দেয়ার পরও এই ভুল থেকে সরে আসার কোনো ইচ্ছাই ছিলো না তার। আমি নিজে গিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম – তুমি তো দুটো হরফের উচ্চারণই পারো, জাস্ট চেঞ্জ করে ফেললেই হয়। সে খুব খুশি হোত আমার সাজেসশনে – কৃতজ্ঞতার দৃষ্টি দিতো আমার দিকে – তারপর আবার নিজের মতো করে একই ভুল কন্টিনিউ করতো। চেতনার মতো কিছু একটা হবে, ত্যাগ করা যায় না।

সাফা মারওয়া সা’ঈ শেষ করে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তার ওপর ছিলো প্রায় টানা একদিন বাস জার্নির ক্লান্তি। আমি সাফা মারওয়ার এক পাশে গা এলিয়ে বসে পড়লাম এবং স্পষ্ট মনে আছে গুনে গুনে ১৭ গ্লাস জমজমের পানি খেলাম। এত আরাম করে পানি আমি কোনোদিন পান করিনি।

হারাম থেকে যখন বের হলাম, তখন মনে হয় ১০টার মতো বাজে। বহু কষ্টে একটি স্যালনে জায়গা করতে পারলাম। নেপালি নাপিত, সাঁট সাঁট করে মাথা ন্যাড়া করলেন। সেদিন আর কিছু খাওয়ার এনার্জি ছিলো না। আর জমজমের পানি একেবারে খাদ্যের মতো পেট ভরিয়ে দিয়েছিলো। সটান হোটেলে ব্যাক করলাম আর মরার মতো ঘুম।

সেই রুমে ছিলো বন্ধু খলিফা এবং আরও দুই মিসরীয়। দুই মিসরীয় খুবই মজার এবং সহজেই বন্ধুত্ব করে নিলো। আমার মনে আছে তারা দুজন কেবল সিম সিম, সিম সিম এই কথাটা ব্যবহার করছিলো। আমি ততক্ষণে বিছানায় উঠে গেছি, ঘুমাবো ঘুমাবো ভাব। এদের জিজ্ঞেস করলাম সিম সিম মানে কী? একজন উঠে এসে ঠাস ঠাস করে আমার পাছায় বাড়ি মারতে মারতে বললো – সিম সিম, সিম সিম।

একটুও রাগ হয়নি। মক্কায় সবাই বন্ধু। পাছায় বাড়ি পড়তেই পারে। তাছাড়া সারাদিনের ক্লান্তি শেষে পাছায় বাড়ি খেয়ে আরামই লাগছিলো। ঘুমিয়ে গেলাম।

(লিখতে ইচ্ছে হলে আরও লিখবো। স্মৃতি রোমন্থন করতে ভালো লাগছে।)

উৎস । তারিখ: 2020-07-25 19:45:59

12 thoughts on “আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল যে আরে এ সময় তো আমার হজের জন্য মক্কায় বা মিনার পার্শ্ববর্তী – আসিফ সিবগাত ভূঞা”

  1. আমারও এবার যাওয়ার কথা ছিল। আল্লাহই ভাল জানেন। ২০১৮ এর রমযানের শেষ দশকে আল্লাহ উমরাহ করার তৌফিক দিয়েছিলেন।

  2. “চেতনার মত কিছু একটা হবে,সহজে ত্যাগ করা যায় না।”
    বেস্ট ছিলো।

  3. কাতারে বসবাস করেআগের মত এখন আর ওমরাহ্ করা যায় না। অবরোধের জন্য বন্ধ আছে। আজ,তিন বছর পুর্ণ হল এখানে আছি। খুব ইচ্ছা ছিল এখান থেকে খুব সহজে ওমরাহ করার। আল্লাহই জানেন হবে কিনা। আর হ্যাঁ এরাবিয়ান গাওয়া প্রথম খেলে জঘন্য লাগে সত্যি,কিছুদিন খাওয়ার পর জিনিসটা ভালই লাগে, এবং বেশ এনার্জেটিক।

  4. আলহামদুলিল্লাহ বেশ তৃপ্তি নিয়ে পড়া শেষ করলাম!!! সামনে আরও কিছু ভালো কথা গুলো শুনবো

  5. Bhai…apni to jotil likhen…. Allah er oshesh rohomot a 2018 a hajj korbar sowvhaggo hoysilo…kaba k 1st dekha….towaf…sob e akhonno chokher samne vhashe…. Allah abar jawar towfiq din amader…. Ameen

Comments are closed.