বাসে কিংবা ট্রেনে চড়ে আপনি যাচ্ছেন দূরে কোথাও – ফাহাম আবদুস সালাম

বাসে কিংবা ট্রেনে চড়ে আপনি যাচ্ছেন দূরে কোথাও। পাশে বসেছে – বিফোর সানরাইজের জুলি ডেলপির মতো কেউ – আর আপনি গল্প করছেন যেকোনো কিছু নিয়ে। এই ফ্যান্টাসিটা একটা বয়স পর্যন্ত সবারই তো থাকে। তো আমার জীবনে এই ঘটনাটা সত্যিই ঘটেছিলো।

প্যারিস থেকে ব্রাসেলস।

বিদেশে গরীবের বাস ছাড়ে রাট দুইটার পরে – সবসময়। আমিও অপেক্ষা করছি। আমার পাশে এসে বসলো এক ফ্রেঞ্চ মেয়ে। এই মেয়েটার চেহারাটা যদি আমার মনে থাকতো তাহলে আগামী দুই প্যারাগ্রাফ শুধু এই সেই চেহারা নিয়েই কথা বলা যেতো – লেটস জাস্ট লীভ এট দেয়ার।

আল্লাহর দুনিয়ায় আপনি সব পাবেন। ইংল্যান্ডে বসে কাঁঠাল পাবেন, মধ্যে রাতে পানির দামে বাসের টিকিট পাবেন, এমন কি সুন্দরী হামসাফারও পেয়ে যাবেন। পাবেন না কী জানেন? আল্লাহর দুনিয়ায় একটা জিনিস আপনি কখনোই পাবেন না। সেটা হোলো বিচার।

ঐ একই বাসে আমার স্ত্রীও আছে – তিন রো পিছে।

আমরা দুজনেই গেছি য়োরোপে রিসার্চ প্রেজেন্ট করতে – মূল কাজ দুই দিনের – বাকীটা তাফরী। কিন্তু গরীবের বাসে স্বামী-স্ত্রী এক সাথে পাশাপাশি সিট পাবে – এমন কোনো নিশ্চয়তা নাই। আপনারা বুঝতেই পারছেন কী নাজুক আমার পরিস্থিতি। ঠিক এই জায়গায় আমি পৃথিবীর সব স্বামীজাতির পক্ষ থেকে আপনার সমবেদনা পেতেই পারি।

জীবন সুন্দর এবং ভয়ঙ্কর – একই সাথে।

আমি জন্মেছি মানুষকে উত্যক্ত করার বিরল প্রতিভা নিয়ে। এই কাজটা যে ইন্টেনশনালি করি , তা না – কিন্তু যেকোনো বাঙালির সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে কোনো ধরনের পার্সোনাল এট্যাক না করে তাকে উত্যক্ত করায় আমি বিশেষ পারদর্শী। আপনার বিশ্বাস নাও হতে পারে – আমি মানুষের ইন্টেলেকচুয়াল ও বিলিফ-বেইজড প্রোফাইলিং এ অসম্ভব ভালো। তিন মিনিটেই বুঝতে পারি আপনি কীভাবে চিন্তা করেন এবং কী কথা বললে আপনি আমাকে মারতে উদ্ধ্বত হবেন। তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমি এখন ভালো হয়ে গেছি।

আমার মধ্যে যদি এম্প্যাথি থাকতো – তাহলে হয়তো আমি খুব ভালো সায়কায়াট্রিস্ট হতে পারতাম। সমস্যা হোলো – যেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি যে আপনি গান্ডু – আপনাকে নিয়ে খেলার যে মজা – এইটা আমি রেজিস্ট করতে পারি না।

তো আমার পাশে বসা সুন্দরীর বাবা মুসলমান (তিউনিসিয়ান অথবা আলজিরিয়ান – মনে পড়ছে না) এবং মা ফ্রেঞ্চ। খুবই ফ্রেন্ডলি এবং ফ্রেঞ্চ অর্থে লিবরেল। সে তার বাবাকে তেমন একটা দেখে নি জীবনে এবং ইসলাম সম্বন্ধে কিছুই জানে না। এইরকম মেয়ের সাথে আপনি কথা বলবেন ফিল্ম নিয়ে – লেডী গাগা নিয়ে – অস্ট্রেলিয়ান সামার নিয়ে – অপেরা হাউজ নিয়ে – পার্থের আকাশের মতো নীল পৃথিবীর কোনো আকাশে নাই – এইসব নিয়ে। ঠিক কিনা বলেন? কিন্তু না, আমাকে বলতে হবে তার সেকুলারিজম নিয়ে। ঐ যে বললাম – আমার খাইসলত। আমি জানি ঠিক কী কথা বললে – আইডিয়ালিস্টদের উত্যক্ত করা যায়। এই মজা লিখে বোঝানোর ক্ষমতা আমার নাই।

তো তখন ফ্রান্সে এবং য়োরোপের প্রধান বিতর্ক ছিলো মেয়েদের হিজাব। সে আমাকে দীর্ঘ সময় ধরে ফ্রেঞ্চ ট্র্যাডিশান কী বোঝানোর চেষ্টা করলো, কেন ফ্রান্সে মেয়েদের হিজাব না পরাটা ওয়াজিব – এই নিয়েও দীর্ঘক্ষণ ওয়াজ দিলো। ইন্ডিভিজুয়াল চয়েস কেন ফ্রেঞ্চ সোসাইটিতে প্যারামাউন্ট – আমাকে বুঝ দিলো। কেন মুসলমান মেয়ের ওপর সমাজের চাপ থাকা যাবে না এবং চাপ দিলে সেটা নাকচ করা কেন রাষ্ট্রের দায়িত্ব এসব নিয়েও আমাকে ওয়াজ দিলো। আমি বুঝলাম। কোনো মেয়ে যদি সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় বিনা প্রেশারে হিজাব করে (ওয়েস্টে এটাই স্বাভাবিক ঘটনা – তবে ব্যতিক্রম আছে) – সেটাও কেনো মেনে নেয়া যাবে না – এইটাই তার আর আমার তর্কের টপিক।

শেষে জিজ্ঞেশ করলাম – আচ্ছা তোমাদের দেশেই ক্রিশ্চান নানরা দেখলাম ঠিক মুসলমানের মতোই হিজাব করে। তো ওদের হিজাবে কোনো ফ্রেঞ্চ ট্র্যাডিশান ভাঙে না?

দেখেন বাচ্চা লিবরেল এবং আমার নিজের অভিজ্ঞতায় – মেয়ে লিবরেলদের দেখেছি যে প্রায়ই তাদের লজিকে কোহেরেন্স থাকে না। কোন জায়গায় আইডিয়ালিজম লজিককে গিলে খায় – এইটা তারা প্রায়ই ভুলে যায়। তারা স্ট্যাটিস্টিক্স মানেন, লজিক মানেন – কিন্তু যতক্ষণ সেটা তার আইডিয়ালিজমকে সাপোর্ট করে।

আমাদের ফ্রেঞ্চ সুন্দরীর মত হোলো – কিন্তু নানরা তো কনভেন্টে থাকে – বাইরে আসে না। মানে সে তার ইন্ডিভিজুয়াল চয়েস আমাকে এক্সপোজ করতেছে না – মুসলমান হিজাবীদের মতো।

আমি জানি সে ঠিক এই ভুলটাই করবে। সাথে সাথে আমার কিস্তিমাত।

তার মানে হোলো ক্রিশ্চান নান ও মুসলমান হিজাবী – দুইজনেই একইভাবে নিজের চেহারা হিজাব দিয়ে ঢাকতেছে – এই খানে ফ্রীডম অফ চয়েস কার্যকর আছে – কোনো সমস্যা নাই। কিন্তু মুসলমান হিজাবীর অপরাধ হোলো সে তার চেহারা ঢাকাটা তোমার সামনে করতেছে। মানে আসল সমস্যা হোলো তোমার চোখে – মানে তুমি যে মুসলমান হিজাবীর পুরা চেহারা দেখতে পারতেছো না – সেইটা। সে যদি বাড়ীতে হিজাব করতো তাহলে অসুবিধা ছিলো না। অসুবিধা এই যে সে বাড়ীর বাইরেও হিজাব করতেছে।

তাইলে তুমি যে প্রথমে ইন্ডিভিজুয়াল ফ্রীডমের কথা বলছিলা – ওই কথাটা ভুয়া ছিলো। আসল সমস্যা হোলো মুসলমান হিজাবী তোমার চোখের আরাম নষ্ট করছে। এইটাকে তুমি ফিলোসোফাইজ করো ব্যাকওয়ার্ডস – হাবিজাবি আইডিয়ালিজমের কথা বলে। তাই না?

ঠিক এইরকম সময়ে আমি সাধারণত এমন একটা হাসি দেই যে ঠিক ওই মুহূর্তে আপনার ইচ্ছা হবে আমাকে খুন করতে – শামা বলেছে আমাকে। আপনার স্ত্রী আপনার সম্বন্ধে সবচেয়ে ভাল জানে – আপনার ব্রাউজারের পর। আমার ছোট্ট মেয়েও ইদানিং এইরকম মুহূর্তে আমাকে আক্রমণ করে বসে – মুখে খামচি দেয় এবং দিয়ে আমার মতোই একটা হাসি দেয়।

ফ্রেঞ্চ সুন্দরী এর পর আমার সাথে আর একটা কথাও বলে নি।

আমি জীবনে সেকুলারিজম নিয়ে, ইসলাম নিয়ে, হিন্দু ধর্ম নিয়ে বহু মানুষের সাথে বহু তর্ক করেছি – মূলত মজা নেয়ার জন্যে। সবচাইতে হাস্যকর যুক্তি প্রেজেন্ট করে কাঠমোল্লারা – সন্দেহ নাই। কিন্তু এরপরেই আছে ফ্রেঞ্চরা। ফ্রেঞ্চরা যেকোনো ধর্মের ব্যাপারেই হস্টাইল – মাত্রাভেদ হয়তো আছে – সেটা ওখানে থাকি নি বলে শিওর না। এট লীস্ট তাদের ব্র্যান্ড অফ সেকুলারিজমে কিছুটা হলেও কনসিস্টেন্সি আছে। এইটা অনারেবল। বাংলাদেশের শাহবাগীদের নিয়ে খেলতে সবচেয়ে মজা কারণ তারা মূলত পড়াশোনা ও বুদ্ধির অভাবে ইসলামোফোবিয়ার উপরে কুলায়ে উঠতে পারে না। তাই তারা মদ খাওয়া ও স্লীভলেস ব্লাউজ পরার অধিকার রক্ষার মধ্যেই তাদের সেক্যুলারিজমকে রিডিউস করছে। তাদের আবদার আসলে একটাই: আপনি তার লাইফস্টাইলকে কোনো ধরনের মোরাল ফ্রেমওয়ার্কের ভেতর দিয়া সমালোচনা করতে পারবেন না – এতে তারা শরমিন্দা হন (কেন হন জানি না)। তারা দুর্গাপূজায় কপালে টিপ দিতে চান, সুতি শাড়ী পরতে চান – এবং পরে ফেইসবুকে কিছু ছবি আপলোড করতে চান। এবং সেই ছবি দেখে আপনি তার ব্যক্তিগত ধর্ম বা চয়েস নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না – এই নিশ্চয়তাটুকুই শুধু তাদের চাওয়া।

যেহেতু বাংলাদেশে কার্যকর একমাত্র মোরাল ফ্রেমওয়ার্ক ইসলাম – সেহেতু সে ইসলামোফোব। বাংলাদেশ যদি ভারতের অংশ থাকতো সেই ক্ষেত্রে সে হিন্দুফোবও হোতো (মহাত্মা গান্ধী মদ খাওয়ার ব্যাপারে কমপ্লিট প্রোহিবিশনিস্ট আছিলেন)।

বাংলাদেশে ঢুকলে যেকোনো মতবাদই আসলে পায়খানা হয়ে যায়। আশ্চর্য আমাদের প্রতিভা। বাংলাদেশে ঢুকে সেকুলারিজমও অগত্যা পায়খানা হয়ে গেছে।

(এই লেখার মূল শিক্ষা আসলে কী?

এই লেখার মূল শিক্ষা হোলো – বাসে ও ট্রেনে আপনার ও আপনার স্ত্রীর সীট যেন পাশাপাশি হয় সেটা নিশ্চিত করা মূলত স্বামীর দায়িত্ব – বাস কর্তৃপক্ষ এই দায়ভার নেবে না)

উৎস । তারিখ: 2020-10-29 08:40:45

44 thoughts on “বাসে কিংবা ট্রেনে চড়ে আপনি যাচ্ছেন দূরে কোথাও – ফাহাম আবদুস সালাম”

  1. তার কথা অসংলগ্ন, ফ্রিডম অব চয়েস থাকলে কাউকে হিজাব পরতে বাধ্য করা নিষিদ্ধ হবে, স্বেচ্ছায় হিজাব পরা নিষিদ্ধ হয় কীভাবে?

  2. ভাইয়া, কি যে করলেন না।
    আপনার জায়গায় আমি হলে তালে তাল মিলাতাম।
    স্ন্যাপচ্যাট, ইন্সটা, ফেবু, সবখানে এড করে নিতাম। 😅
    এমন ওয়ান্স ইন আ লাইফটাইম মোমেন্ট কেউ এভাবে পণ্ড করে? 🤔

  3. শাহবাগী নাস্তিকদের একমাত্র উদ্দেশ্যই হলো ধর্ম নয় ইসলামের বিরুদ্ধে কুযুক্তি দিয়ে ইউরোপের কোন দেশে এসালাম নেয়া।

  4. I myself often try to understand the European women mindset under which they discuss the dress issue.

    It is historically been an tradition in European nations from post-Roman period to make women responsible for the original sin and hence controlling their body and choosing their dress became a complete domain of man (father, husband and brother)..rich and upper class women had worst problems as they had to use their bodies (in the name of marriage) to support their family interest..

    So these European find it hard on their sensibilities when they see dresses like burkha or hijab 🧕. I don’t agree agree with their position but I can sympathize a little..

    Problem is that there are Muslim communities in western countries who try to suppress women a lot (e.g. forced marriage, domestic violence etc.) in the name of honor..the pain of these girls often un-proportionately flushed out in media and these news does not help either..

  5. ভালো ছিলো লেখাটা। বাঙালী প্রগতীশীলদের নেটিং বহু আগেই খসেছে, এদের স্বরুপ উম্মোচন করে অনেক লেখা আমি লিখেছি।

    এখন বাকী আছে যারা এদেরকে দেখলে এখন শ্রদ্ধায় গদ গদ হয়,
    এখনো এদের ঘৃণা আর এদের স্টুপিডিটি বুঝতে পারে না। এরাই আসল বদমাইশ। এদের কারনে এখনো টিকে আছে বাঙ্গালী প্রগতিশীলরা তেলাপোকার মতো।

  6. দারুণ লেখা…মজাও আছে, সাজাও আছে 🙂। তবে একটু জিজ্ঞেস করি, এই যে বললেন “মেয়ে লিবরেলদের দেখেছি যে প্রায়ই তাদের লজিকে কোহেরেন্স থাকে না। কোন জায়গায় আইডিয়ালিজম লজিককে গিলে খায় – এইটা তারা প্রায়ই ভুলে যায়। তারা স্ট্যাটিস্টিক্স মানেন, লজিক মানেন – কিন্তু যতক্ষণ সেটা তার আইডিয়ালিজমকে সাপোর্ট করে।”– এই সত্যিটা কি পুরুষ লিবারেলদের ব্যাপারে একই রকম দেখেননি?

  7. “বাংলাদেশে ঢুকলে যেকোন মতবাদই আসলে পায়খানা হয়ে যায়।বাংলাদেশে ঢুকে সেকুলারিজমও অগত্যা পায়খানা হয়ে গেছে।”
    couldn’t laugh more😂😂😂

  8. ভাই কথা দিয়ে কাউকে হারাতে পারলে কলেজে দেখেছি আপনি একটা বিটকেল্লা হাসি দিতেন। 🤣

  9. ইয়ে, সীট কি চেইন্জ করে নেবার অপশন নাই? মানে আলাদা সীট পেলেও ওভাবেই যেতে হয়? জাস্ট আস্কিং! 😬

  10. কিন্তু আমাদের এখানে স্ত্রীদের বসতে হয় ড্রাইভারের পাশে।
    তবে মূল শিক্ষাটা বেশ ভাল লেগেছে।

  11. Faham Abdus Salam ভাই, আমি প্রফাইলিং এ খুব খারাপ। আপনার কাছ থেকে একটা ওয়ান-অন-ওয়ান ট্রেনিং নিতে চাই। এইটাকে যদি একটা ফ্রেমওয়ার্ক হিসেবে দাঁড় করায় দিতে পারেন তাহলে আমার মাচ নিডেড একটা স্কিল হতো।

  12. মানুষকে এটাক না করে লজিক্যালি উত্যক্ত করাটা আমারও কিছুটা আসে। তবে মোটামুটি কখনই পার্সোনাল এটাক বা থ্রেট না খেয়ে শেষ হয় না, এটা একটা মজার ব্যাপার। যুক্তির পাল্টা যুক্তি না দিতে পারলে ভালো মানুষির মুখোশটা যেভাবে খসে পড়ে সেটা আসলেই এমেজিং। এক খিলাফতি ইসলামিস্ট কইছিল জিহ্বা কেটে দিবে, আবার এক স্ট্যালিনিস্ট মার্ক্সবাদী কইছিল আমি নাকি সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল। বিপ্লব হইলে নাকি আমারে আগে গুলি করে মারা উচিত।

  13. আপনে কি ছোটবেলা থেকেই এমন পোঙটা? ন্যাচারালি? মেয়েরা কি আসলেই পোংটা স্বামী পছন্দ করে? জিগাইলাম আর কি….

  14. “যেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি যে আপনি গান্ডু – আপনাকে নিয়ে খেলার যে মজা – এইটা আমি রেজিস্ট করতে পারি না।”— রেজিস্ট করুন। এটা ভাল অভ্যাস নই। এটা সাধারনত জ্ঞানের অহমিকা থেকে ঘটে – যা থেকে প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ দূরে থাকে।

Comments are closed.